পুরুষের চেয়ে নারীকে বেশি ভয় পায় পাখি, গবেষণায় উঠে এল চমকপ্রদ তথ্য

মানুষের উপস্থিতি টের পেলেই অনেক সময় উড়ে পালায় পাখি। গাছের ডালে বসে থাকা কিংবা পার্কে খাবার খুঁজতে থাকা পাখির কাছে কেউ এগিয়ে গেলেই মুহূর্তের মধ্যে উড়ে অন্য জায়গায় চলে যেতে দেখা যায়। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, একই দূরত্ব থেকে একজন নারী ও একজন পুরুষ এগিয়ে গেলে পাখির প্রতিক্রিয়া কি একই রকম হয়? সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, বিষয়টি মোটেও এক নয়। আশ্চর্যজনকভাবে, পুরুষের তুলনায় নারীদের কাছে আসতে দেখলে পাখিরা তুলনামূলক দ্রুত উড়ে পালায়।

ইউরোপের পাঁচটি দেশে পরিচালিত একটি গবেষণায় এমনই চমকপ্রদ তথ্য পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। গবেষণায় দেখা গেছে, একজন পুরুষের তুলনায় একজন নারী পাখির কাছাকাছি এলে পাখিটি গড়ে প্রায় এক মিটার আগেই উড়ে যায়। অর্থাৎ পুরুষরা নারীদের তুলনায় পাখির আরও প্রায় এক মিটার কাছে যেতে পারেন, পাখি উড়ে যাওয়ার আগে।
গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে ব্রিটিশ ইকোলজিক্যাল সোসাইটির সাময়িকী People and Nature-এ। ‘Sex matters: European urban birds flee approaching women sooner than approaching men’ শিরোনামের এই গবেষণায় পাখির আচরণ ও মানুষের লিঙ্গের মধ্যকার সম্ভাব্য সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে।
পাঁচ দেশে ৩৭ প্রজাতির পাখির ওপর পর্যবেক্ষণ
গবেষণাটি পরিচালিত হয় চেক প্রজাতন্ত্র, ফ্রান্স, জার্মানি, পোল্যান্ড ও স্পেনে। ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত শহরের পার্ক ও সবুজ এলাকায় পাখিদের আচরণ পর্যবেক্ষণ করেন গবেষকেরা।
এতে মোট ৭৭ প্রজাতির পাখির ২ হাজার ৭০১টি পর্যবেক্ষণ সংগ্রহ করা হয়। তবে বিস্তারিত পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণের জন্য অন্তত ১০টি পর্যবেক্ষণ পাওয়া গেছে, এমন ৩৭টি প্রজাতিকে চূড়ান্তভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়। সব মিলিয়ে বিশ্লেষণ করা হয় ২ হাজার ৫৮১টি পর্যবেক্ষণ।
গবেষণায় অংশ নেন চারজন নারী ও চারজন পুরুষ গবেষক। তাঁদের উচ্চতা ও পোশাকের রং যতটা সম্ভব কাছাকাছি রাখা হয়েছিল। সবাইকে একই নিয়ম অনুসরণ করে পাখির দিকে স্বাভাবিক গতিতে সরাসরি হেঁটে যেতে বলা হয়। এর মাধ্যমে গবেষকের লিঙ্গ ছাড়া অন্য পার্থক্যগুলোর প্রভাব কমানোর চেষ্টা করা হয়। Wiley Online Library+1
পাখির ভয় পরিমাপ করা হলো যেভাবে
পাখিরা কতটা কাছে মানুষকে আসতে দেয়, তা বোঝার জন্য বিজ্ঞানীরা ব্যবহার করেন একটি বিশেষ বৈজ্ঞানিক পরিমাপ। এর নাম ‘ফ্লাইট ইনিশিয়েশন ডিস্ট্যান্স’ বা এফআইডি (Flight Initiation Distance)।
সহজভাবে বললে, কোনো মানুষ পাখির দিকে এগিয়ে যাওয়ার পর যে দূরত্বে পৌঁছালে পাখিটি ভয় পেয়ে উড়ে যায়, সেই দূরত্বকেই এফআইডি বলা হয়।
যেমন, একটি পাখি যদি কোনো পুরুষকে নিজের কাছ থেকে সাত মিটার দূরে থাকতে দেয়, কিন্তু একজন নারী কাছে এলে আট মিটার দূরেই উড়ে যায়, তাহলে নারীর ক্ষেত্রে পাখিটির এফআইডি বেশি।
গবেষণায় দেখা যায়, সব দেশ মিলিয়ে নারীদের কাছে এলে পাখিদের গড় এফআইডি ছিল প্রায় ৮ দশমিক ৫ মিটার। অন্যদিকে পুরুষদের ক্ষেত্রে তা ছিল ৭ দশমিক ৫ মিটার। অর্থাৎ নারীদের উপস্থিতিতে পাখিরা গড়ে এক মিটার বেশি দূরত্ব বজায় রেখেছে। Wiley Online Library+1
কোন পাখিরা বেশি সতর্ক, আর কারা তুলনামূলক নির্ভীক?
গবেষণায় অংশ নেওয়া পাখিদের মধ্যে ছিল ইউরোপিয়ান ব্ল্যাকবার্ড, ম্যাগপাই, গ্রেট টিট, হাউস স্প্যারো ও বিভিন্ন প্রজাতির কবুতরসহ পরিচিত অনেক শহুরে পাখি।
তবে সব পাখির আচরণ এক রকম ছিল না। কোনো কোনো প্রজাতি মানুষকে তুলনামূলক দূর থেকেই বিপদ হিসেবে বিবেচনা করে। আবার কিছু পাখি মানুষের উপস্থিতিতে অভ্যস্ত হওয়ায় বেশ কাছাকাছি আসার সুযোগ দেয়।
উদাহরণ হিসেবে, ম্যাগপাই তুলনামূলক বেশি সতর্ক পাখিদের একটি। অন্যদিকে শহরে বসবাসকারী সাধারণ কবুতর মানুষের কাছাকাছি থাকতেও অনেক সময় স্বচ্ছন্দ বোধ করে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গবেষণায় পাখিদের নিজেদের লিঙ্গের সঙ্গেও আচরণের পার্থক্য পাওয়া গেছে। পুরুষ পাখিরা স্ত্রী পাখিদের তুলনায় কিছুটা বেশি ঝুঁকি নিতে পারে বলে দেখা গেছে। অর্থাৎ মানুষের লিঙ্গের পাশাপাশি পাখিদের নিজেদের লিঙ্গও তাদের পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে ভূমিকা রাখতে পারে।
নারীদের দেখলে পাখিরা বেশি ভয় পায় কেন?
এটাই গবেষণার সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং একই সঙ্গে রহস্যময় অংশ। বিজ্ঞানীরা এখনো নিশ্চিতভাবে জানতে পারেননি, কেন পাখিরা নারীদের উপস্থিতিতে তুলনামূলক বেশি সতর্ক হয়ে ওঠে।
তবে কয়েকটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা সামনে এসেছে।
১. হাঁটার ধরন ও শারীরিক ভঙ্গি
নারী ও পুরুষের হাঁটার ধরন, শরীরের নড়াচড়া কিংবা চলাফেরার সূক্ষ্ম পার্থক্য পাখিদের নজরে আসতে পারে। পাখিরা অত্যন্ত সতর্ক প্রাণী। আশপাশের সামান্য পরিবর্তনও তারা পর্যবেক্ষণ করে। তাই মানুষের চলাফেরার কোনো সূক্ষ্ম সংকেত তাদের আচরণে প্রভাব ফেলতে পারে।
২. শরীরের গন্ধ ও রাসায়নিক সংকেত
মানুষের শরীর থেকে নির্গত গন্ধ বা রাসায়নিক সংকেতও একটি সম্ভাব্য কারণ হতে পারে। গবেষকদের ধারণা, মানুষের শরীরের গন্ধের পার্থক্য পাখিদের কাছে কোনো সংকেত পৌঁছে দিতে পারে। তবে পাখিরা সত্যিই ফেরোমন বা এ ধরনের রাসায়নিক সংকেত ব্যবহার করে নারী-পুরুষের পার্থক্য শনাক্ত করছে কি না, তা এখনো প্রমাণিত নয়।
৩. শারীরিক গঠনের পার্থক্য
মানুষের শরীরের গঠন, চলার সময় শরীরের ভারসাম্য এবং অন্যান্য দৃশ্যমান বৈশিষ্ট্যও পাখিদের প্রতিক্রিয়ায় ভূমিকা রাখতে পারে। যদিও গবেষণায় নারী ও পুরুষ পর্যবেক্ষকদের উচ্চতা ও পোশাকের পার্থক্য নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা হয়েছিল, তারপরও অন্যান্য সূক্ষ্ম শারীরিক পার্থক্যের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
গবেষণার সহলেখক ড্যানিয়েল ব্লামস্টেইন মানুষের হাঁটার ধরন নিয়ে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এমনকি বিখ্যাত ব্রিটিশ কমেডি অনুষ্ঠান ‘মন্টি পাইথনস মিনিস্ট্রি অব সিলি ওয়াকস’-এর মতো অদ্ভুত হাঁটার ধরন ব্যবহার করে পরীক্ষা করার মজার ধারণাও সামনে এনেছেন। এতে বোঝা যেতে পারে, মানুষের চলাফেরার ধরন পাখিদের প্রতিক্রিয়ায় কতটা প্রভাব ফেলে।
শুধু পাখি নয়, অন্য প্রাণীরাও মানুষের লিঙ্গভেদে প্রতিক্রিয়া দেখায়
মানুষের লিঙ্গ অনুযায়ী প্রাণীদের আচরণে পরিবর্তন আসার ঘটনা একেবারে নতুন নয়। এর আগে ২০১৪ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, পুরুষ গবেষকের উপস্থিতিতে পরীক্ষাগারের ইঁদুর ও ইঁদুরজাতীয় প্রাণীদের মধ্যে তুলনামূলক বেশি মানসিক চাপের প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
এমনকি কিছু গবেষণায় কুকুর ও বানরের ক্ষেত্রেও মানুষের প্রতি ভিন্ন প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। তবে বিভিন্ন প্রাণীর ক্ষেত্রে এর পেছনের কারণ এক নয়। মানুষের গন্ধ, কণ্ঠস্বর, আচরণ কিংবা পূর্ব অভিজ্ঞতা প্রাণীদের প্রতিক্রিয়ায় ভূমিকা রাখতে পারে। UCLA+1
পাখিদের আচরণ নিয়ে গবেষণায় নতুন প্রশ্ন
এই গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, বন্য প্রাণীর আচরণ পর্যবেক্ষণের সময় গবেষকের নিজের বৈশিষ্ট্যও যে ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে, তা নতুন করে সামনে এসেছে।
এত দিন পাখিরা মানুষের কাছ থেকে কত দূরে থাকলে উড়ে যায়, তা নিয়ে অনেক গবেষণা হলেও পর্যবেক্ষণকারী নারী নাকি পুরুষ—এই বিষয়টি খুব একটা গুরুত্ব পায়নি। নতুন গবেষণাটি সেই জায়গায় নতুন আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে।
তবে গবেষকেরা এখনো নিশ্চিত নন, পাখিরা ঠিক কোন সংকেতের মাধ্যমে মানুষের নারী-পুরুষের পার্থক্য বুঝতে পারে। এ বিষয়ে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন। বিশেষ করে হাঁটার ধরন, শরীরের গন্ধ, কণ্ঠস্বর ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য আলাদাভাবে পরীক্ষা করলে রহস্যটির আরও পরিষ্কার ব্যাখ্যা পাওয়া যেতে পারে।
মানুষের চোখে পাখির উড়ে যাওয়া হয়তো খুব সাধারণ একটি ঘটনা। কিন্তু সেই সাধারণ আচরণের মধ্যেও লুকিয়ে থাকতে পারে প্রাণিজগতের অজানা অনেক রহস্য। আর এই গবেষণা মনে করিয়ে দেয়, শহরের ব্যস্ত পরিবেশে আমাদের আশপাশে থাকা পাখিরাও কত সূক্ষ্মভাবে তাদের পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করে এবং সম্ভাব্য বিপদ থেকে নিজেদের রক্ষা করার চেষ্টা করে।



