৩ নভেম্বর, ২০২৬ | মঙ্গলবারবাংলা: ১৮ কার্তিক ১৪৩৩
জীবনযাপন

শুধু ‘স্যরি’ বললেই কি সব সমস্যার সমাধান হয়?

images

কেউ কথা দিয়ে কথা না রাখলে, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করলে কিংবা আচরণে কষ্ট দিলে আমরা সাধারণত তার কাছ থেকে একটি ক্ষমা প্রার্থনা আশা করি। কিন্তু সেই প্রত্যাশিত ‘স্যরি’ শোনার পরও কি মনের কষ্ট দূর হয়? সব সময় নয়। কারণ, শুধু দুঃখ প্রকাশ করলেই ভুলের ক্ষত মুছে যায় না। ক্ষমা চাওয়ার পাশাপাশি নিজের ভুলের দায় স্বীকার করা এবং অন্যের অনুভূতি বোঝাও জরুরি।

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, আন্তরিক ক্ষমা প্রার্থনা মানে কেবল মুখে ‘দুঃখিত’ বলা নয়। বরং নিজের আচরণে অন্য ব্যক্তি কেন কষ্ট পেয়েছেন, তা উপলব্ধি করা এবং সেই ভুলের দায়িত্ব নেওয়া।

ধরা যাক, কোনো বন্ধু শেষ মুহূর্তে আপনার সঙ্গে দেখা করার পরিকল্পনা বাতিল করলেন। এতে আপনার মনে হতে পারে, তিনি আপনার সময় কিংবা অনুভূতিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না। এমনকি নিজের কোনো ভুলের কারণে পরিকল্পনাটি বাতিল হয়েছে কি না, সেই সন্দেহও তৈরি হতে পারে। পরে বন্ধুটি যদি শুধু ‘স্যরি’ বলে বিষয়টি এড়িয়ে যান, তাহলে আপনার কষ্ট থেকেই যেতে পারে। কারণ, আপনি হয়তো তার কাছ থেকে নিজের অনুভূতির স্বীকৃতি ও আশ্বাস প্রত্যাশা করছেন।

সামাজিক মনোবিজ্ঞানী রয় বাউমাইস্টার ১৯৯৭ সালে এই বিষয়টিকে ‘ম্যাগনিটিউড গ্যাপ’ বা ঘটনার গুরুত্ব উপলব্ধির ব্যবধান হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। অর্থাৎ, যে ব্যক্তি কষ্ট পান, তার কাছে ঘটনাটি যতটা গুরুতর, যিনি কষ্ট দিয়েছেন, তার কাছে সেটি ততটা গুরুত্বপূর্ণ নাও হতে পারে।

এই পার্থক্যের কারণেই অনেক সময় ক্ষমা চাওয়ার পরও সম্পর্কের জটিলতা কাটে না। কষ্ট পাওয়া ব্যক্তি চান তাঁর অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া হোক। অন্যদিকে, যিনি ভুল করেছেন, তিনি হয়তো নিজের দোষকে ছোট করে দেখেন কিংবা অন্যের রাগ কমানোর জন্য শুধু ক্ষমা চেয়ে বসেন। ফলে দুজনের মধ্যে দূরত্ব থেকেই যায়।

২০০৬ সালে মনোবিজ্ঞানী জুডি ইটন ও তার সহকর্মীরা একটি গবেষণার মাধ্যমে বিষয়টি পরীক্ষা করেন। তারা একটি অনলাইন খেলার আয়োজন করেন, যেখানে প্রতিপক্ষ অন্যায্য আচরণের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীদের হারিয়ে দেন। এরপর প্রতিপক্ষের পক্ষ থেকে চার ধরনের বার্তা দেওয়া হয়—শুধু ক্ষমা প্রার্থনা, অন্যায় আচরণ স্বীকার, ক্ষমা প্রার্থনার পাশাপাশি অন্যায় স্বীকার অথবা কোনো বক্তব্য না দেওয়া।

Advertisements

গবেষণায় দেখা যায়, প্রতিপক্ষ কোনো বক্তব্য না দিলে অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের অনুভূতির যথাযথ স্বীকৃতি পাননি বলে মনে করেন। শুধু ‘আমি দুঃখিত’ বললেও তাদের ক্ষমা করার আগ্রহ খুব একটা বাড়েনি। বরং অন্যায় আচরণের দায় স্বীকার করলে তারা বেশি স্বস্তি অনুভব করেন এবং ক্ষমা করার প্রবণতাও বাড়ে।

গবেষণার আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, শুধু অন্যায় স্বীকার করাও ক্ষমা প্রার্থনা ও অন্যায় স্বীকার—দুটির সম্মিলিত বক্তব্যের মতো কার্যকর হতে পারে। কারণ, ভুল স্বীকার করার মাধ্যমে দুই পক্ষের মধ্যে ঘটনার গুরুত্ব ও প্রভাব সম্পর্কে একটি অভিন্ন উপলব্ধি তৈরি হয়।

তাই ‘তুমি কষ্ট পেয়েছ বলে দুঃখিত’ কিংবা ‘যদি তোমাকে কষ্ট দিয়ে থাকি, তাহলে ক্ষমা করো’—এ ধরনের বক্তব্য অনেক সময় কার্যকর হয় না। কারণ, এসব কথায় নিজের আচরণের দায় স্পষ্টভাবে স্বীকার করা হয় না। বরং ‘আমি যা করেছি, তা ঠিক হয়নি। আমার আচরণে তুমি কষ্ট পেয়েছ, সেটা আমি বুঝতে পারছি’—এভাবে বললে অন্য ব্যক্তির অনুভূতির প্রতি সম্মান প্রকাশ পায়।

সম্পর্কের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে তাই ক্ষমা প্রার্থনার পাশাপাশি প্রয়োজন নিজের ভুলের দায়িত্ব নেওয়া, অন্যের কষ্ট উপলব্ধি করা এবং ভবিষ্যতে একই ভুল না করার চেষ্টা। গুরুতর কোনো ক্ষতির ক্ষেত্রে শুধু কথায় নয়, আচরণে পরিবর্তন এনে বিশ্বাস ফিরিয়ে আনার উদ্যোগও নিতে হয়।

ক্ষমা চাওয়ার সময় শুধু নিজের অনুশোচনা প্রকাশ করলেই চলবে না; অন্য ব্যক্তি কেন কষ্ট পেয়েছেন, সেটিও বুঝতে হবে। একইভাবে, কারও কাছে ক্ষমা প্রত্যাশা করলে ভেবে দেখা প্রয়োজন—আপনি কি শুধু একটি ‘স্যরি’ শুনতে চান, নাকি চান আপনার কষ্ট ও অনুভূতিকে সত্যিকার অর্থে স্বীকৃতি দেওয়া হোক?

Advertisements