ব্যস্ততার মাঝেও বই পড়ার অভ্যাস গড়বেন যেভাবে

মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও আর নানা ধরনের ডিজিটাল বিনোদনের ভিড়ে দিন দিন কমছে বই পড়ার অভ্যাস। ব্যস্ততার অজুহাতে অনেকেই বই হাতে নেওয়ার সুযোগ পান না। অথচ প্রতিদিনের কাজের ফাঁকেও একটু পরিকল্পনা করলেই বই পড়ার জন্য সময় বের করা সম্ভব। নিয়মিত বই পড়েন এমন লেখক, শিক্ষক, সমালোচক ও শিল্পীদের অভ্যাস থেকে পাওয়া কয়েকটি কৌশল এ ক্ষেত্রে কাজে আসতে পারে।
এক গবেষণায় দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে নিয়মিত বই পড়েন মাত্র ১৬ শতাংশ মানুষ। এক দশক আগেও এই হার ছিল প্রায় দ্বিগুণ। অর্থাৎ সময়ের ব্যবধানে বই পড়ার প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। গবেষকদের মতে, স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার এর অন্যতম কারণ। অবসর সময়ের বড় একটি অংশ এখন ভিডিও দেখা কিংবা অনলাইনে স্ক্রল করেই কাটছে।
এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সাময়িকী ‘দ্য কাট’ ১৮ জন ব্যস্ত লেখক, শিক্ষক, সমালোচক ও শিল্পীর কাছে জানতে চেয়েছিল, প্রতিদিনের ব্যস্ততার মধ্যেও তাঁরা কীভাবে বই পড়ার সময় বের করেন। তাঁদের অভ্যাস থেকে পাওয়া কিছু কার্যকর কৌশল হলো—
১. বই পড়ার সময় মোবাইল ফোন দূরে রাখুন
বই পড়ার সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো মোবাইল ফোন। পড়তে বসে বারবার ফোনের নোটিফিকেশন দেখা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঢুঁ মারার অভ্যাস মনোযোগ নষ্ট করে। তাই বই পড়ার সময় ফোনটি অন্য ঘরে রাখা বা নীরব মোডে রাখার অভ্যাস করতে পারেন। দৈনন্দিন জীবনেও অপ্রয়োজনীয় ফোন ব্যবহার কমালে হাতে বাড়তি সময় পাওয়া সম্ভব। সমালোচক মলি ইয়ংয়ের মতে, ফোনের প্রভাব থেকে কিছুটা দূরে থাকতে পারলে দিনের মধ্যেই বই পড়ার জন্য বাড়তি সময় বের করা যায়।
২. প্রতিদিনের পড়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করুন
বই পড়ার অভ্যাস ধরে রাখতে প্রতিদিনের জন্য নির্দিষ্ট লক্ষ্য ঠিক করা কার্যকর হতে পারে। নাইজেরিয়ান লেখক ওচুকো আকমোভবো প্রতিদিন কত পৃষ্ঠা পড়বেন, তা আগে থেকেই ঠিক করে রাখেন। তাঁর অভ্যাস অনুযায়ী, প্রতিদিন ৫০ থেকে ১০০ পৃষ্ঠা পড়তে পারলে কয়েক দিনের মধ্যেই একটি বই শেষ করা সম্ভব। তবে শুরুতেই বড় লক্ষ্য নির্ধারণ না করে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী ৫ থেকে ১০ পৃষ্ঠা দিয়ে শুরু করা যেতে পারে। ধীরে ধীরে পড়ার পরিমাণ বাড়ালে অভ্যাসটিও সহজে গড়ে উঠবে।
৩. দিনের নির্দিষ্ট সময়কে বই পড়ার জন্য রাখুন
অনিয়মিতভাবে বই পড়ার পরিবর্তে প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময় বেছে নেওয়া ভালো। অভিনেত্রী নিকোল রিচি ভোরে ঘুম থেকে উঠে দিনের কাজ শুরুর আগেই বই পড়েন। তাঁর মতে, চারপাশ শান্ত থাকায় ভোরবেলা পড়ার জন্য উপযুক্ত সময়। আবার অনেকে রাতে ঘুমানোর আগে বই পড়তে পছন্দ করেন। দিনের শুরুতে কিংবা শেষের দিকে ১৫ থেকে ৩০ মিনিট সময় বরাদ্দ রাখলেও নিয়মিত পড়ার অভ্যাস তৈরি হতে পারে।
৪. যাতায়াতের সময় কাজে লাগান, শুনতে পারেন অডিওবুক
কাজের ব্যস্ততায় আলাদা করে বই পড়ার সময় না পেলে যাতায়াতের সময়টুকু কাজে লাগানো যায়। বাস, ট্রেন কিংবা গাড়িতে চলাচলের সময় বই পড়তে পারেন। আর চোখে পড়ে পড়ার সুযোগ না থাকলে বেছে নিতে পারেন অডিওবুক। লেখক অ্যান্ড্রু লিপস্টেইন ব্যস্ততার মধ্যেও অডিওবুক শুনে পড়ার অভ্যাস ধরে রাখেন। দৈনন্দিন কাজের ফাঁকে কিংবা যাতায়াতের সময় গল্প ও তথ্যভিত্তিক বই শোনার মাধ্যমে সময়ের সদ্ব্যবহার করা সম্ভব।
৫. বই পড়ার অভিজ্ঞতা লিখে রাখুন
বই পড়ার আনন্দ বাড়াতে তৈরি করতে পারেন নিজের পাঠ-ডায়েরি বা বুক জার্নাল। পড়ার সময় ভালো লাগা কোনো বাক্য, পছন্দের চরিত্র কিংবা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য লিখে রাখতে পারেন। বই শেষ করার পর ছোট্ট একটি পর্যালোচনা লেখাও ভালো অভ্যাস। চাইলে শুধু বইয়ের নাম, লেখকের নাম ও পড়া শেষ করার তারিখ লিখে রাখতে পারেন। এতে একদিকে যেমন পড়ার অভিজ্ঞতা মনে থাকবে, অন্যদিকে বছর শেষে নিজের পড়ার অগ্রগতিও সহজে দেখতে পারবেন।
সব মিলিয়ে বই পড়ার জন্য যে প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা আলাদা করে বের করতে হবে, এমন নয়। বরং দিনের ছোট ছোট অবসরকে কাজে লাগানোই হতে পারে কার্যকর সমাধান। অপ্রয়োজনীয় ফোন ব্যবহার কমানো, নির্দিষ্ট সময়ে পড়া এবং নিজের পছন্দের বই বেছে নেওয়ার মাধ্যমে ধীরে ধীরে গড়ে তোলা যায় নিয়মিত পড়ার অভ্যাস। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, একদিনে অনেকটা পড়ার চাপ না নিয়ে প্রতিদিন অল্প হলেও বইয়ের সঙ্গে সময় কাটানো।



