কেন একই কফিতে কারও ঘুম আসে, কারও রাতভর কাটে নির্ঘুম?

একই সময়ে এক কাপ কফি পান করেও কেউ সহজেই ঘুমিয়ে পড়েন, আবার কারও রাত কাটে নির্ঘুম। কারও ক্ষেত্রে কফি পান করলে অস্থিরতা, উদ্বেগ কিংবা হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়ার মতো সমস্যাও দেখা দেয়। মূলত জিনগত বৈশিষ্ট্য, যকৃতের কার্যক্রম এবং নিয়মিত ক্যাফেইন গ্রহণের অভ্যাসের কারণে মানুষের শরীরে কফির প্রভাব ভিন্ন হয়।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্যাফেইন শরীরের ক্লান্তি কম অনুভব করিয়ে সাময়িকভাবে সতর্কতা ও মনোযোগ বাড়ায়। তবে এটি শরীরে নতুন শক্তি তৈরি করে না। বরং মস্তিষ্কে ঘুম ঘুম ভাব তৈরির জন্য দায়ী অ্যাডেনোসিন নামের রাসায়নিকের কার্যক্রমে বাধা দেয়। ফলে ক্লান্তি থাকলেও সাময়িকভাবে তা কম অনুভূত হয়।
বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মনঃপ্রভাবক পদার্থগুলোর একটি ক্যাফেইন। কফি ছাড়াও চা, কোলা, এনার্জি ড্রিংক, চকলেট এবং শরীরচর্চার কিছু পরিপূরকে ক্যাফেইন থাকে। অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ করলে মাথাব্যথা, অস্থিরতা, হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া ও ঘুমের সমস্যা হতে পারে।
জিনগত বৈশিষ্ট্যেও বদলায় কফির প্রভাব
কফি পান করার পর ক্যাফেইন দ্রুত রক্তের মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছায়। পরে যকৃতের একটি বিশেষ এনজাইমের সাহায্যে এটি ভেঙে শরীর থেকে বের হয়ে যায়। তবে এই প্রক্রিয়ার গতি সবার ক্ষেত্রে এক নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির পুষ্টিবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক মেরিলিন কর্নেলিস বিবিসিকে জানিয়েছেন, শরীর থেকে ক্যাফেইন বের হতে ছয় থেকে ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। ফলে এক কাপ কফি পান করার কয়েক ঘণ্টা পরও শরীরে ক্যাফেইনের প্রভাব থাকতে পারে।
ক্যাফেইন ভাঙার প্রক্রিয়ায় সিওয়াইপি ওয়ান এ টু (CYP1A2) নামের একটি জিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বংশগত বৈশিষ্ট্যের কারণে কারও শরীরে ক্যাফেইন দ্রুত ভেঙে যায়, আবার কারও ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াটি ধীরগতিতে সম্পন্ন হয়। এ কারণেই একই পরিমাণ কফি পান করেও মানুষের প্রতিক্রিয়া আলাদা হতে পারে।
ধূমপান ও ওষুধের প্রভাব
ক্যাফেইন শরীরে কতক্ষণ সক্রিয় থাকবে, তা শুধু জিনগত বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করে না। ধূমপান যকৃতে ক্যাফেইন ভাঙার গতি বাড়াতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে এ গতি ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। তবে ধূমপান ছেড়ে দিলে আগের তুলনায় একই পরিমাণ কফি পান করেও বেশি অস্থিরতা অনুভূত হতে পারে।
অন্যদিকে, কিছু অ্যান্টিবায়োটিক, জন্মনিয়ন্ত্রণের বড়ি ও অন্যান্য ব্যবস্থাপত্রের ওষুধ ক্যাফেইন ভাঙার গতি কমিয়ে দিতে পারে। গর্ভাবস্থায় হরমোনের পরিবর্তনের কারণেও শরীরে ক্যাফেইন দীর্ঘ সময় থাকতে পারে।
নিয়মিত কফি পান করার ফলে শরীর ধীরে ধীরে ক্যাফেইনের সঙ্গে মানিয়ে নেয়। ফলে একই পরিমাণ কফি পান করেও আগের মতো প্রতিক্রিয়া নাও হতে পারে। তবে কয়েক সপ্তাহ কফি পান বন্ধ রাখার পর আবার শুরু করলে অস্থিরতা কিংবা অতিরিক্ত চনমনে ভাব দেখা দিতে পারে।
ঘুমের আগে কখন কফি পান বন্ধ করবেন?
ঘুমের অন্তত ছয় ঘণ্টা আগে ক্যাফেইন এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেন ঘুমবিষয়ক গবেষকেরা। তবে ক্যাফেইনের প্রতি সংবেদনশীলতা ব্যক্তিভেদে আলাদা হওয়ায় সবার ক্ষেত্রে একই নিয়ম কার্যকর নাও হতে পারে।
মনোবিজ্ঞানী ও ঘুম বিশেষজ্ঞ লিন্ডসে ব্রাউনিং বিবিসিকে বলেন, ক্যাফেইন শুধু ঘুম আসতে দেরি করায় না, ঘুমের মানও খারাপ করতে পারে। তাঁর পরামর্শ অনুযায়ী, কেউ যদি রাত ১০টায় ঘুমাতে যান, তাহলে দুপুর ২টার পর ক্যাফেইন এড়িয়ে চলতে পারেন। যাঁরা ক্যাফেইনের প্রতি বেশি সংবেদনশীল, তাঁদের আরও আগে কফি পান বন্ধ করা প্রয়োজন হতে পারে।
যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা সংস্থা এনএইচএসের পরামর্শ অনুযায়ী, গর্ভবতী নারীদের দিনে ২০০ মিলিগ্রামের কম ক্যাফেইন গ্রহণ করা উচিত। ফিল্টার কফির মাঝারি আকারের প্রায় দুই মগে এই পরিমাণ ক্যাফেইন থাকতে পারে।
ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টিবিজ্ঞানের ইমেরিটাস অধ্যাপক পিটার রজার্সের মতে, ক্যাফেইন তুলনামূলক নিরাপদ হলেও অতিরিক্ত গ্রহণে অস্থিরতা ও শারীরিক অস্বস্তি দেখা দিতে পারে। ঘনীভূত ক্যাফেইনযুক্ত পণ্য থেকে বিরল ক্ষেত্রে গুরুতর বিষক্রিয়াও হতে পারে।
কয়েক দশকের গবেষণায় পরিমিত কফি পানকারীদের মধ্যে কিছু বড় রোগের ঝুঁকি তুলনামূলক কম থাকার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তাঁদের আয়ুও কিছুটা বেশি হতে পারে। তবে কফি পানই এসব স্বাস্থ্যগত সুবিধার একমাত্র কারণ, তা নিশ্চিত করতে পারেননি গবেষকেরা।
সব মিলিয়ে, কফি শরীরে কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করে ব্যক্তির জিনগত বৈশিষ্ট্য, শারীরিক অবস্থা, ওষুধ গ্রহণ এবং ক্যাফেইন পানের অভ্যাসের ওপর। তাই অন্যের কফি পানের অভ্যাস অনুসরণ না করে নিজের ঘুম ও শরীরের প্রতিক্রিয়া বুঝে ক্যাফেইন গ্রহণ করাই ভালো।



