৩০ অক্টোবর, ২০২৬ | শুক্রবারবাংলা: ১৪ কার্তিক ১৪৩৩
জীবনযাপন

বয়স্ক মা-বাবার পাশে আছেন তো? জীবনের শেষবেলায় মা–বাবার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আপনারই

b88a821cffc678bfd3b841cb6b7a93af

শৈশবে সন্তানকে আগলে রাখতে মা–বাবা নিজেদের সুখ, স্বাচ্ছন্দ্য ও বিশ্রাম বিসর্জন দেন। সন্তানের অসুখে রাত জাগেন, বিপদে ঢাল হয়ে দাঁড়ান, ভবিষ্যৎ গড়তে নিরলস পরিশ্রম করেন। অথচ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সেই মা–বাবারই অনেক সময় প্রয়োজনের মুহূর্তে পাশে কাউকে পাওয়া হয় না। বয়সের ভারে যখন শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন তাঁদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সন্তানের সময়, সঙ্গ, মমতা ও নিরাপত্তা।

বয়স্ক মা–বাবার যত্ন নেওয়া কেবল দায়িত্ব নয়, তাঁদের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। শারীরিক অসুস্থতার পাশাপাশি বয়সের সঙ্গে মানসিক পরিবর্তনও আসতে পারে। তাই তাঁদের আচরণে পরিবর্তন দেখলে বিরক্ত না হয়ে বোঝার চেষ্টা করা জরুরি।

শীতকালে বাড়তি যত্ন প্রয়োজন

শীতের সময় বয়স্ক মানুষের স্বাস্থ্য নিয়ে পরিবারের সদস্যদের আরও সচেতন থাকা প্রয়োজন। অধ্যাপক ডা. শুভাগত চৌধুরীর মতে, এ সময়ে বিভিন্ন ভাইরাসের সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে। ডায়াবেটিস, আর্থ্রাইটিসসহ দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত বয়স্ক ব্যক্তিদের প্রতি পরিবারের পরিচর্যাকারীদের বিশেষ মনোযোগ দেওয়া উচিত। নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো গুরুত্বপূর্ণ। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। শীতের সকালে খুব ভোরে কিংবা সূর্যাস্তের পর অতিরিক্ত ঠান্ডায় বাইরে যাওয়া এড়িয়ে চলা ভালো। রোদেলা সময়ে বাইরে বের হলে উপযুক্ত পোশাক, মোজা, কানটুপি ও স্কার্ফ ব্যবহার করে শরীর উষ্ণ রাখতে হবে। খাবারেও পরিমিত তেল-মসলা ও সুষম পুষ্টির দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।

বয়সের পরিবর্তন বুঝুন, কঠোর না হয়ে পাশে থাকুন

ছুটির দিনে পরিবারের সবাই একসঙ্গে হলে বয়স্ক মা–বাবার শারীরিক বা আচরণগত পরিবর্তন চোখে পড়তে পারে। হয়তো বাবাকে আগের চেয়ে বেশি দ্বিধাগ্রস্ত মনে হচ্ছে, অথবা মা হাঁটতে গিয়ে ভারসাম্য রাখতে পারছেন না। এমন পরিবর্তনকে অবহেলা করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি তাঁদের নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করাও সমাধান নয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্‌রোগ ও ডায়াবেটিসের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। পাশাপাশি পেশির শক্তি ও চলাফেরার সক্ষমতা কমে যাওয়ায় পড়ে গিয়ে আঘাত পাওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়। বাড়িতে নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা করা, প্রয়োজন হলে লাঠি বা ওয়াকার ব্যবহার এবং বাথরুমে পিছলে পড়ে যাওয়া ঠেকানোর ব্যবস্থা তাঁদের দৈনন্দিন জীবন সহজ করতে পারে।

Advertisements

শারীরিক পরিবর্তনের পাশাপাশি স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ ও চিন্তাভাবনার গতিতেও পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। কারও কারও ক্ষেত্রে ডিমেনশিয়ার মতো রোগও হতে পারে। এ সময় তাঁরা একই কথা বারবার বলতে পারেন, কথা গুছিয়ে বলতে অসুবিধা হতে পারে কিংবা পরিচিত কাজেও সাহায্যের প্রয়োজন হতে পারে। এ ধরনের আচরণ দেখলে তাঁদের অপমান করা বা দোষারোপ না করে ধৈর্য ধরে কথা বলা জরুরি। তবে সব পরিবর্তনকে শুধু বার্ধক্যের স্বাভাবিক অংশ ভেবে এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। নতুন বা ক্রমশ বাড়তে থাকা লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

যেসব লক্ষণ দেখলে সতর্ক হবেন

বয়স্ক মা–বাবার মধ্যে কিছু পরিবর্তন দেখা দিলে সেগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। যেমন—

১. হাঁটাচলায় ভারসাম্য হারানো কিংবা বারবার পড়ে যাওয়া।

২. গাড়ি চালানো বা দৈনন্দিন কাজ করার সময় আগের মতো নিয়ন্ত্রণ রাখতে না পারা।

৩. অল্প সময়ে কারণ ছাড়াই উল্লেখযোগ্য ওজন কমে যাওয়া।

৪. দীর্ঘদিন বিষণ্নতা, অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, ক্ষুধামান্দ্য বা মৃত্যুচিন্তায় ভোগা।

৫. আগে পছন্দ করতেন, এমন কাজেও আগ্রহ হারিয়ে ফেলা।

৬. আশপাশের মানুষকে অতিরিক্ত সন্দেহ করা বা কেউ ক্ষতি করতে চাইছে—এমন ভয় প্রকাশ করা।

৭. মেজাজে অস্বাভাবিক পরিবর্তন, খিটখিটে ভাব কিংবা ঘন ঘন রেগে যাওয়া।

৮. স্মৃতিশক্তির অবনতি, ওষুধ খেতে ভুলে যাওয়া, অর্থের হিসাব রাখতে অসুবিধা কিংবা একই কথা বারবার বলা।

এসব লক্ষণ দেখা দিলেই যে গুরুতর কোনো রোগ হয়েছে, তা নয়। তবে এগুলোর পেছনে শারীরিক অসুস্থতা, ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, মানসিক চাপ বা স্মৃতিসংক্রান্ত সমস্যা থাকতে পারে। হঠাৎ বিভ্রান্তি, কথা জড়িয়ে যাওয়া বা শরীরের এক পাশ দুর্বল হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে।

কেন বাড়ে শারীরিক ও মানসিক জটিলতা?

বার্ধক্যে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের কার্যক্ষমতা কমে আসতে পারে। এর সঙ্গে একাকিত্ব, সামাজিক যোগাযোগের অভাব এবং দৈনন্দিন কাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। জীবনসঙ্গী বা প্রিয়জনকে হারানোর শোক, আর্থিক অনিশ্চয়তা কিংবা পরিবারের কাছে নিজেকে গুরুত্বহীন মনে হওয়ার অনুভূতিও তাঁদের মানসিক কষ্ট বাড়াতে পারে। দীর্ঘদিনের কর্মজীবন থেকে অবসরে যাওয়ার পর অনেকেই হঠাৎ দৈনন্দিন রুটিন ও সামাজিক যোগাযোগ হারিয়ে ফেলেন। এতে একাকিত্ব বাড়তে পারে এবং নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে সমস্যা হতে পারে।

তাই বয়স্ক মা–বাবার সুস্থতার জন্য শুধু ওষুধ ও চিকিৎসাই যথেষ্ট নয়। তাঁদের মানসিক স্বস্তি, সামাজিক যোগাযোগ এবং নিজের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করার সুযোগও গুরুত্বপূর্ণ।

মা–বাবার যত্নে যা করতে পারেন

সময় দিন, মন খুলে কথা বলুন: অফিস থেকে ফিরে কিছুটা সময় তাঁদের সঙ্গে কাটান। এক কাপ চা নিয়ে গল্প করুন, নিজের দিনের অভিজ্ঞতা জানান এবং তাঁদের কথাও মন দিয়ে শুনুন। নিয়মিত এমন যোগাযোগ তাঁদের একাকিত্ব কমাতে সাহায্য করতে পারে। পরিবারের সঙ্গে যুক্ত রাখুন: নাতি-নাতনিদের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ দিন। পরিবারের আনন্দ, আলোচনা ও ছোটখাটো আয়োজনে তাঁদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করুন। কাজের মধ্যে রাখুন: তাঁদের শারীরিক সক্ষমতা ও আগ্রহ অনুযায়ী গাছের যত্ন নেওয়া, রান্নায় সাহায্য করা, বাজারের ছোটখাটো কাজ কিংবা নাতি-নাতনিদের পড়াশোনায় সহযোগিতার সুযোগ দিতে পারেন। তবে কাজ চাপিয়ে দেওয়া যাবে না; তাঁদের পছন্দ ও সামর্থ্যকে গুরুত্ব দিতে হবে।

ওষুধ ও চিকিৎসার খোঁজ রাখুন: নিয়মিত ওষুধ খাচ্ছেন কি না, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসরণ করছেন কি না এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করাচ্ছেন কি না—সেদিকে নজর দিন। ওষুধের মাত্রা নিজে থেকে পরিবর্তন করবেন না।

বাইরে ঘুরতে নিয়ে যান: শারীরিক অবস্থা অনুকূলে থাকলে সকালে বা বিকেলে একসঙ্গে হাঁটতে যেতে পারেন। ছুটির দিনে পার্কে ঘোরা কিংবা বাইরে কোথাও খেতে যাওয়ার মতো ছোট আয়োজনও তাঁদের আনন্দ দিতে পারে। সিদ্ধান্তে তাঁদের মতামত নিন: সংসারের বিভিন্ন বিষয়ে তাঁদের পরামর্শ চান। এতে তাঁরা পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে নিজেদের অবস্থান অনুভব করতে পারবেন।

নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করুন: ঘরের চলাচলের পথে অপ্রয়োজনীয় জিনিস সরিয়ে রাখুন, বাথরুমে পিছলে পড়া ঠেকানোর ব্যবস্থা করুন এবং রাতে প্রয়োজনীয় আলো রাখুন। চলাফেরায় সমস্যা থাকলে প্রয়োজনীয় সহায়ক উপকরণ ব্যবহারে সাহায্য করুন।

Advertisements