৩০ অক্টোবর, ২০২৬ | শুক্রবারবাংলা: ১৪ কার্তিক ১৪৩৩
বিনোদন

প্রেম ভেঙে বিশ্বাসঘাতকতা, তারপর অনুশোচনা—যে কারণে দর্শকের আলোচনায় ‘দার–এ–নিজাত’

IMG_7040

শৈশবের বন্ধুত্ব থেকে প্রেম, সেই প্রেমে বিশ্বাসভঙ্গ, আর অতীতের ক্ষত পেরিয়ে নতুন করে জীবন শুরু করার লড়াই। সম্পর্কের এমন জটিল সমীকরণ নিয়েই দর্শকের আগ্রহের কেন্দ্রে উঠে এসেছে পাকিস্তানি ধারাবাহিক ‘দার–এ–নিজাত’। পাকিস্তানের পাশাপাশি বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালেও সিরিজটি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে এর বিভিন্ন দৃশ্য, সংলাপ ও অভিনয়শিল্পীদের নিয়ে দর্শকদের নানা প্রতিক্রিয়া।

পাকিস্তানের টেলিভিশন চ্যানেল এআরওয়াই ডিজিটালে প্রচারিত এই ধারাবাহিকে প্রেমের পাশাপাশি উঠে এসেছে ধর্মীয় বিশ্বাস, ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা, পারিবারিক টানাপোড়েন ও বিশ্বাসঘাতকতার গল্প। তবে দর্শকদের সবচেয়ে বেশি আগ্রহ তৈরি হয়েছে জারিয়াব, জামিল ও আবু বকর—এই তিন চরিত্রের সম্পর্কের জটিলতা ঘিরে।

২৩ পর্বেই ১৭০ কোটি ভিউয়ের দাবি

গত ২৪ অক্টোবর এআরওয়াই ডিজিটাল জানায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম মিলিয়ে ‘দার–এ–নিজাত’ ১৭০ কোটির বেশি ভিউ পেয়েছে। চ্যানেলটির দাবি, মাত্র ২৩ পর্বেই এই সাফল্য অর্জন করে পাকিস্তানি ধারাবাহিকের ইতিহাসে নতুন রেকর্ড গড়েছে সিরিজটি। প্রধান অভিনেতা শেহরিয়ার মুনাওয়ারও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই সাফল্যের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।

জারিয়াবের জীবনে প্রেম, বিশ্বাসভঙ্গ ও নতুন শুরু

গল্পের কেন্দ্রে রয়েছেন জারিয়াব। প্রাণবন্ত এই তরুণী নিজের জীবন ও ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা স্বপ্ন দেখেন। দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব থেকে তাঁর সম্পর্ক গড়ে ওঠে জামিলের সঙ্গে। একসময় সেই বন্ধুত্ব প্রেমে রূপ নেয়। জারিয়াবের কাছে এই সম্পর্ক কেবল ভালোবাসার নয়, বরং একসঙ্গে ভবিষ্যৎ গড়ার প্রতিশ্রুতিও।

Advertisements

কিন্তু পরিস্থিতি বদলে যায় যখন জামিল নিজের জীবন ও ধর্মীয় বিশ্বাসের নতুন ব্যাখ্যা খুঁজতে গিয়ে জারিয়াবের সঙ্গে সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। একসময় যাঁর সঙ্গে সংসার গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন জারিয়াব, সেই জামিলই তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেন। বিয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে জারিয়াবকে না জানানো এবং তাঁর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলার বিষয়গুলো দর্শকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করেছে।

এরপর জারিয়াবের জীবনে আসেন আবু বকর। শেহরিয়ার মুনাওয়ার অভিনীত এই চরিত্র জামিলের তুলনায় ভিন্ন মানসিকতার মানুষ। আবু বকরের সঙ্গে জারিয়াবের সম্পর্কের মধ্য দিয়ে সামনে আসে নতুন করে বিশ্বাস গড়ে তোলা, অতীতের কষ্ট কাটিয়ে ওঠা এবং জীবনের বাস্তবতা মেনে নেওয়ার বিষয়গুলো। ফলে গল্পটি শুধু বিচ্ছেদের বেদনায় আটকে থাকেনি; বরং নতুনভাবে জীবন শুরু করার সম্ভাবনাও তুলে ধরেছে।

জামিলের সিদ্ধান্তেই যত বিতর্ক

দীর্ঘদিনের প্রেমের পর জারিয়াবকে বিয়ে করতে জামিলের অস্বীকৃতি দর্শকদের মধ্যে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে জারিয়াবকে যথেষ্ট ধার্মিক মনে না করার কারণে তাঁকে প্রত্যাখ্যান করার বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্ক তৈরি করেছে।

একজন মানুষ নিজের জীবনযাপন ও বিশ্বাস পরিবর্তন করতেই পারেন। কিন্তু নিজের পরিবর্তিত বিশ্বাসের মানদণ্ডে দীর্ঘদিনের সঙ্গীকে বিচার করা কতটা যুক্তিসংগত—জামিলের চরিত্র ঘিরে দর্শকদের আলোচনায় উঠে এসেছে এমন প্রশ্ন।

অনেক দর্শকের কাছে তাঁর আচরণ সম্পর্কের দ্বিচারিতার উদাহরণ হয়ে উঠেছে। আবার কেউ কেউ মনে করেন, নিজের বিশ্বাস, সামাজিক প্রত্যাশা ও ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষার মধ্যে দ্বন্দ্বে পড়ে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা চরিত্রটিকে বাস্তবসম্মত করেছে। এ কারণেই জামিলকে ঘিরে দর্শকদের বিরক্তির পাশাপাশি গল্পের পরিণতি জানার আগ্রহও বাড়ছে।

একটি ইঙ্গিতপূর্ণ দৃশ্য ঘিরে আলোচনা

প্রেমের গল্পের বাইরেও একটি অন্তরঙ্গ সম্পর্কের ইঙ্গিতপূর্ণ দৃশ্য নিয়ে আলোচনায় এসেছে ‘দার–এ–নিজাত’। একটি পর্বে জারিয়াব জামিলের বাড়িতে যাওয়ার পর গল্প এগিয়ে যায় পরদিন সকালের ঘটনায়। জারিয়াবের আচরণ ও দাদির সঙ্গে তাঁর কথোপকথনের সূত্র ধরে দর্শকদের মধ্যে তাঁদের শারীরিক ঘনিষ্ঠতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।

এক দর্শক লেখক উমেরা আহমেদের কাছে জানতে চান, ওই দৃশ্যের মাধ্যমে কি দুজনের অন্তরঙ্গ সম্পর্কের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে? সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, উমেরা সংক্ষেপে ‘হ্যাঁ’ বলে বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

এ নিয়ে দর্শকদের প্রতিক্রিয়া অবশ্য একরকম নয়। কেউ মনে করেন, সরাসরি কিছু না দেখিয়েও গল্পের মাধ্যমে সম্পর্কের জটিলতা বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে। অন্যদিকে, কেউ কেউ পারিবারিক দর্শকদের উপযোগিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এই বিতর্ক থেকে বোঝা যায়, দর্শকেরা শুধু গল্পের মোড় নয়, সম্পর্ক ও সামাজিক মূল্যবোধের উপস্থাপন নিয়েও আগ্রহী।

উমেরা আহমেদের গল্পে সাকিব খানের নির্মাণ

‘দার–এ–নিজাত’ লিখেছেন পাকিস্তানের জনপ্রিয় চিত্রনাট্যকার ও ঔপন্যাসিক উমেরা আহমেদ। সম্পর্ক, ধর্মীয় বিশ্বাস, নৈতিকতা এবং ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের পরিণতি তাঁর লেখার পরিচিত বিষয়। ‘জিন্দেগি গুলজার হ্যায়’ ও ‘মেরি জাত জাররা–এ–বিনিশান’-এর মতো কাজের মাধ্যমে তিনি পরিচিতি পেয়েছেন।

ধারাবাহিকটি পরিচালনা করেছেন সাকিব খান। প্রযোজনায় রয়েছে থ্রিজ এন্টারটেইনমেন্ট। প্রধান চরিত্রগুলোতে অভিনয় করেছেন শেহরিয়ার মুনাওয়ার, দুরে–ফিশান সেলিম ও নামির নওয়াজ খান। এ ছাড়া রয়েছেন সাহার হাশমি, রোমাইসা খান, সানিয়া সাঈদ, সাবা হামিদ, ফারান তাহির, আদনান জাফর ও নাদিয়া আফগানসহ আরও অনেকে।

জারিয়াবের চরিত্রে দুরে–ফিশান সেলিমের অভিনয় নিয়েও দর্শকদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। কেউ তাঁর চরিত্রের আবেগ ও দ্বিধার প্রকাশের প্রশংসা করেছেন, আবার কেউ সংলাপ বলার ধরন নিয়ে সমালোচনা করেছেন। অন্যদিকে, আবু বকর চরিত্রে শেহরিয়ার মুনাওয়ারের উপস্থিতি দর্শকদের আগ্রহ বাড়িয়েছে। নামির নওয়াজ খানের জামিল চরিত্রও আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। চরিত্রটির সিদ্ধান্তে দর্শকদের বিরক্তি তৈরি হলেও সেটিই গল্পের প্রতি তাঁদের আগ্রহের অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশেও কেন আগ্রহ তৈরি হয়েছে?

বাংলাদেশে পাকিস্তানি ধারাবাহিকের দর্শকপ্রিয়তার পেছনে পারিবারিক গল্প, সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা রয়েছে। ‘দার–এ–নিজাত’-এর গল্পেও এমন কিছু বিষয় উঠে এসেছে, যা দেশের দর্শকদের কাছে পরিচিত ও প্রাসঙ্গিক।

ভালোবাসার সম্পর্কে প্রত্যাশা, পরিবার ও সমাজের চাপ, ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের সংঘাত এবং বিচ্ছেদের পর নতুন জীবন শুরু করার চেষ্টা—এসব অভিজ্ঞতা দেশ ও ভাষার সীমানা ছাড়িয়ে দর্শকদের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করতে পারে।

শেষ পর্যন্ত কার বদলাবে অবস্থান?

গল্প যত এগোচ্ছে, ততই জটিল হয়ে উঠছে চরিত্রগুলোর সম্পর্কের হিসাব। অতীতের ভালোবাসার ক্ষত পেরিয়ে জারিয়াব কি আবু বকরের সঙ্গে নতুন জীবনে স্থিরতা খুঁজে পাবেন? নিজের সিদ্ধান্তের পরিণতি কি বুঝতে পারবেন জামিল? আর বিশ্বাস, অনুশোচনা ও ক্ষমার প্রশ্নে শেষ পর্যন্ত কার জীবনে আসবে পরিবর্তন?

এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে নতুন পর্বের অপেক্ষায় রয়েছেন দর্শকেরা। প্রেমের গল্পের পাশাপাশি চরিত্রগুলোর নৈতিক দ্বন্দ্ব ও সম্পর্কের বাস্তবতা নিয়েই ‘দার–এ–নিজাত’ ঘিরে আলোচনা আরও বিস্তৃত হচ্ছে।

Advertisements