চোখের অঞ্জনি কেন হয়, বারবার হওয়ার কারণ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধের উপায়

চোখের পাতায় ছোট ফোঁড়ার মতো ফুলে ওঠা, লাল হয়ে যাওয়া এবং ব্যথা অনুভব করার সমস্যাকে সাধারণত চোখের অঞ্জনি বলা হয়। এটি চোখের পাতার গ্রন্থিতে সংক্রমণ বা প্রদাহের কারণে হতে পারে। অঞ্জনি সাধারণত কয়েক দিনের মধ্যে কমতে শুরু করে এবং এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে সেরে যায়। তবে কারও কারও ক্ষেত্রে এই সমস্যা বারবার দেখা দেয়। চোখের পাতার পরিচ্ছন্নতার অভাব, ত্বকের বিভিন্ন সমস্যা কিংবা কিছু শারীরিক অবস্থার কারণে অঞ্জনি হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।

চোখের অঞ্জনি কী এবং কেন হয়
চোখের পাতায় বিভিন্ন ধরনের গ্রন্থি রয়েছে। এর মধ্যে পাপড়ির গোড়ায় থাকা ক্ষুদ্র গ্রন্থিগুলো এবং চোখের পাতার ভেতরে অবস্থিত তৈলাক্ত পদার্থ নিঃসরণকারী মেইবোমিয়ান গ্রন্থি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এসব গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত পদার্থ চোখের আর্দ্রতা বজায় রাখতে এবং চোখের পৃষ্ঠকে সুরক্ষিত রাখতে সাহায্য করে।
কোনো কারণে এসব গ্রন্থির মুখ বন্ধ হয়ে গেলে কিংবা সেখানে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ হলে প্রদাহ সৃষ্টি হতে পারে। তখন চোখের পাতার নির্দিষ্ট অংশ লাল হয়ে ফুলে যায়, ব্যথা অনুভূত হয় এবং কখনো কখনো পুঁজও জমতে পারে। এই অবস্থাকে স্টাই বা চোখের অঞ্জনি বলা হয়।
অঞ্জনি সাধারণত চোখের পাতার কিনারায় দেখা যায়। আক্রান্ত স্থানে স্পর্শ করলে ব্যথা হতে পারে এবং চোখের পাতা ভারী মনে হতে পারে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এটি গুরুতর সমস্যা নয়, তবে যথাযথ পরিচর্যা না করলে অস্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
চোখে অঞ্জনি বারবার হওয়ার কারণ
চোখের অঞ্জনি একবার সেরে যাওয়ার পরও পুনরায় হতে পারে। এর পেছনে চোখের পাতার গ্রন্থির সমস্যা, ত্বকের রোগ কিংবা দৈনন্দিন কিছু অভ্যাস ভূমিকা রাখতে পারে।
চোখের পাতার তৈলাক্ত গ্রন্থির মুখ বন্ধ হয়ে গেলে সেখানে তেলজাতীয় পদার্থ জমে শক্ত গুটির মতো তৈরি হতে পারে। একে কেলাজিয়ন বলা হয়। অঞ্জনির মতো এতে সাধারণত তীব্র ব্যথা থাকে না। অঞ্জনি সাধারণত এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে সেরে গেলেও কেলাজিয়ন কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
চোখের পাতায় খুশকি, সেবোরিক ডার্মাটাইটিস এবং রোসেশিয়ার মতো ত্বকের সমস্যা থাকলে অঞ্জনি হওয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে। এসব সমস্যায় চোখের পাতার কিনারায় প্রদাহ তৈরি হতে পারে এবং গ্রন্থির স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে।
এ ছাড়া ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে না থাকা, রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি থাকা এবং হরমোনজনিত পরিবর্তনও কিছু ক্ষেত্রে চোখের পাতার গ্রন্থির সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। চোখের পাতা নিয়মিত পরিষ্কার না করা, অপরিষ্কার হাতে চোখ স্পর্শ করা, বারবার চোখ রগড়ানো এবং পুরোনো বা অপরিচ্ছন্ন প্রসাধনী ব্যবহার করলেও সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলে চোখ শুষ্ক হয়ে যেতে পারে এবং চোখে অস্বস্তি তৈরি হতে পারে। তবে শুধু রাত জাগা বা স্ক্রিন ব্যবহারের কারণেই অঞ্জনি হয়, এমনটি নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
চোখের অঞ্জনির চিকিৎসা
অঞ্জনি হলে প্রথমেই চোখের পাতার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা জরুরি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সাধারণ পরিচর্যার মাধ্যমে সমস্যাটি ধীরে ধীরে ভালো হয়ে যায়।
গরম সেক দেওয়া: পরিষ্কার কাপড় হালকা গরম পানিতে ভিজিয়ে অতিরিক্ত পানি নিংড়ে নিতে হবে। এরপর চোখ বন্ধ করে আক্রান্ত চোখের পাতার ওপর কয়েক মিনিট কাপড়টি ধরে রাখতে হবে। দিনে কয়েকবার এভাবে সেক দেওয়া যেতে পারে। এতে জমে থাকা তৈলাক্ত পদার্থ নরম হতে এবং গ্রন্থির মুখ খুলতে সাহায্য করে। কাপড় যেন অতিরিক্ত গরম না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
চোখের পাতা পরিষ্কার রাখা: চোখের পাতার কিনারায় ময়লা বা খুশকি জমে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তা পরিষ্কার করতে হবে। চোখের ভেতরে সাবান বা শ্যাম্পু প্রবেশ করতে দেওয়া যাবে না। চোখের পাতায় ব্যবহারের জন্য উপযুক্ত পরিষ্কারক ব্যবহার করা নিরাপদ।
ওষুধের ব্যবহার: সংক্রমণের ধরন ও তীব্রতা অনুযায়ী চিকিৎসক অ্যান্টিবায়োটিক ড্রপ বা মলম ব্যবহারের পরামর্শ দিতে পারেন। কিছু ক্ষেত্রে মুখে খাওয়ার অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজন হতে পারে। তবে সব অঞ্জনিতে অ্যান্টিবায়োটিক লাগে না। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজে থেকে চোখের ড্রপ বা ওষুধ ব্যবহার করা উচিত নয়।
কেলাজিয়নের চিকিৎসা: কেলাজিয়ন অনেক সময় নিজে থেকেই সেরে যায়। তবে দীর্ঘদিন গুটি থেকে গেলে, আকার বড় হলে কিংবা দৃষ্টিতে সমস্যা তৈরি করলে চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। প্রয়োজনে চিকিৎসক ছোট অস্ত্রোপচার বা অন্য চিকিৎসার পরামর্শ দিতে পারেন।
অঞ্জনির গুটি কখনো চাপ দিয়ে ফাটানো বা পুঁজ বের করার চেষ্টা করা উচিত নয়। এতে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
চোখের অঞ্জনি প্রতিরোধে করণীয়
চোখের অঞ্জনি বারবার হওয়ার ঝুঁকি কমাতে প্রতিদিনের কিছু অভ্যাসে পরিবর্তন আনা যেতে পারে।
- চোখের পাতার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা: নিয়মিত চোখের পাতার কিনারা পরিষ্কার রাখতে হবে। খুশকি বা চোখের পাতায় প্রদাহের সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরিচর্যা করতে হবে।
- চোখে হাত দেওয়ার আগে হাত ধোয়া: অপরিষ্কার হাতে চোখ স্পর্শ করা বা চোখ রগড়ানোর অভ্যাস পরিহার করতে হবে।
- প্রসাধনী ব্যবহারে সতর্ক থাকা: পুরোনো বা অন্যের ব্যবহৃত চোখের প্রসাধনী ব্যবহার করা উচিত নয়। চোখে অঞ্জনি থাকলে চোখের মেকআপ ও কনট্যাক্ট লেন্স ব্যবহার থেকে বিরত থাকা ভালো, যতক্ষণ না সমস্যা সেরে যায়।
- খুশকি নিয়ন্ত্রণ করা: মাথার ত্বকে খুশকি বা চোখের পাতায় খুশকির মতো আবরণ থাকলে যথাযথ চিকিৎসা নিতে হবে।
- দৃষ্টির সমস্যা পরীক্ষা করা: ঝাপসা দেখা বা চোখে অতিরিক্ত চাপ অনুভব করলে চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক পাওয়ারের চশমা ব্যবহার করতে হবে।
- পর্যাপ্ত ঘুম ও বিরতি নিশ্চিত করা: দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে কাজ করলে নিয়মিত বিরতি নিতে হবে এবং পর্যাপ্ত ঘুমের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। এতে চোখের শুষ্কতা ও অস্বস্তি কমাতে সাহায্য হতে পারে।
- ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা: ডায়াবেটিস থাকলে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা জরুরি।
- চোখের পাতায় খোঁচাখুঁচি না করা: নখ দিয়ে চোখের পাতা খোঁটা, গুটি চেপে ধরা কিংবা পুঁজ বের করার চেষ্টা করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন
অঞ্জনি সাধারণত নিজে থেকেই সেরে যায়। তবে চোখের ব্যথা বা ফোলা দ্রুত বাড়তে থাকলে, চোখের চারপাশে লালচে ভাব ছড়িয়ে পড়লে, জ্বর হলে, দৃষ্টিতে পরিবর্তন দেখা দিলে কিংবা চোখ নাড়াতে ব্যথা হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। বারবার একই সমস্যা দেখা দিলেও কারণ নির্ণয়ের জন্য চক্ষু বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।
চোখের অঞ্জনি প্রতিরোধে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা, সঠিক অভ্যাস এবং প্রয়োজনে চিকিৎসা গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে অঞ্জনি ও কেলাজিয়নের পার্থক্য বুঝে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিলে দীর্ঘস্থায়ী অস্বস্তি এড়ানো সম্ভব।



