হীরামন টিয়া: সবুজের বুকে রঙিন ডানার উৎসব

হেমন্তের শিশিরভেজা সকাল। দিগন্তজোড়া সবুজ ফসলের মাঠের ওপর হঠাৎই ডানা মেলে উড়ে আসে একঝাঁক রঙিন পাখি। কখনো দলবেঁধে আকাশে উড়ছে, কখনো সবুজ ঘাসের ফুল ও বীজ খুঁজে নিচ্ছে আপন মনে। পাখিদের এমন ছন্দময় বিচরণে মুগ্ধ হয়ে থমকে দাঁড়ান প্রকৃতিপ্রেমীরা। কেউ মুগ্ধ চোখে উপভোগ করেন দৃশ্যটি, আবার কেউ ক্যামেরার ফ্রেমে ধরে রাখতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন প্রকৃতির এই অপূর্ব মুহূর্ত।
নওগাঁর বদলগাছি উপজেলার দোনাইল গ্রামের ফসলের মাঠে এখন দেখা মিলছে এমনই এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্যের। মাঠজুড়ে হীরামন টিয়ার বিচরণ আর রঙিন ডানার ঝলকানিতে এলাকাটি যেন পরিণত হয়েছে পাখিপ্রেমীদের মিলনমেলায়।
ভোরের আলোয় পাখিদের আগমন
দোনাইল গ্রামের মাঠে হীরামন টিয়াদের আনাগোনা শুরু হয় সূর্যোদয়ের পরপরই। স্থানীয় পাখিপ্রেমীদের বর্ণনা অনুযায়ী, সকাল সাড়ে ছয়টা থেকে সাতটার মধ্যে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি মাঠে নেমে আসে। খাবারের সন্ধানে ব্যস্ত পাখিরা প্রায় এক ঘণ্টা ধরে মাঠে বিচরণ করে। এরপর উড়ে যায় অন্যত্র।
দিনের দ্বিতীয় দফায় তাদের দেখা মেলে বিকেল সাড়ে তিনটা থেকে চারটার দিকে। বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত চলে তাদের বিচরণ। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে পাখিদের এমন আগমনকে ঘিরে এলাকায় তৈরি হয়েছে বাড়তি আগ্রহ।
পাখিদের কাছ থেকে যতটা সম্ভব সুন্দর দৃশ্য ধারণ করতে ভোরেই মাঠে হাজির হন নানা বয়সী প্রকৃতিপ্রেমী। কারও হাতে দূরবীন, কারও হাতে বড় লেন্সের ক্যামেরা, আবার কেউ ভিডিও ধারণের সরঞ্জাম নিয়ে অপেক্ষা করেন পাখিদের আগমনের জন্য। পাখিদের স্বাভাবিক আচরণে ব্যাঘাত না ঘটিয়ে তাদের বিচরণ পর্যবেক্ষণ ও ছবি তোলাই তাঁদের মূল উদ্দেশ্য।
পাখিদের জন্য বিশেষ উদ্যোগ
দোনাইল গ্রামের এই পাখির সমাগমের পেছনে রয়েছে স্থানীয় এক পাখিপ্রেমী যুবকের উদ্যোগ। আরিফ হোসেন নিজের জমিতে ব্যক্তিগত অর্থায়নে জনসন জাতের ঘাস চাষ করেছেন, যাতে পাখিরা পর্যাপ্ত খাবার পায়।
আরিফ হোসেন জানান, হীরামন টিয়াদের আগমন দেখে তিনি পাখিদের খাবারের জোগান নিশ্চিত করার কথা ভাবেন। সে অনুযায়ী বিদেশ থেকে বীজ সংগ্রহ করে নিজের জমিতে ঘাস চাষ করেন। এই ঘাসের ফুল ও বীজ খেতেই প্রতিদিন দলবেঁধে মাঠে আসে পাখিরা।
তাঁর এই উদ্যোগ শুধু পাখিদের খাবারের উৎস তৈরি করেনি, দোনাইল গ্রামের মাঠকে প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছেও পরিচিত করে তুলেছে। পাখিদের নিরাপদ বিচরণ নিশ্চিত করতে স্থানীয় পর্যায়ে এমন উদ্যোগ প্রকৃতি সংরক্ষণে ব্যক্তিগত আগ্রহের গুরুত্বও তুলে ধরে।
ক্যামেরার লেন্সে প্রকৃতির গল্প
দোনাইলের মাঠে হীরামন টিয়াদের এমন সমাগমের খবর ছড়িয়ে পড়ায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পেশাদার ও শৌখিন আলোকচিত্রীরা ছুটে আসছেন। রঙিন পাখিদের দলবদ্ধ উড়ান, খাবার সংগ্রহ এবং সবুজের মধ্যে তাদের অবাধ বিচরণ—সবই তাঁদের কাছে আকর্ষণীয় বিষয়।
কেউ পাখির ডানা মেলার মুহূর্ত ধারণ করছেন, কেউ অপেক্ষা করছেন এক ফ্রেমে একাধিক পাখির উপস্থিতি পাওয়ার আশায়। আবার কেউ পাখিদের আচরণ পর্যবেক্ষণ করে সময় কাটাচ্ছেন। ফলে দোনাইলের ফসলের মাঠ এখন কেবল কৃষিজমি নয়, প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণীপ্রেমীদের জন্যও এক আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত হয়েছে।
প্রকৃতি সংরক্ষণে সচেতনতাই হোক অঙ্গীকার
পাখিদের এমন অবাধ বিচরণ প্রকৃতির ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্যের গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়। তাদের নিরাপদে খাবার সংগ্রহ ও বিচরণের পরিবেশ বজায় রাখতে হলে মানুষের সচেতন ভূমিকা জরুরি। পাখিদের অযথা বিরক্ত করা, খুব কাছে গিয়ে ছবি তোলা কিংবা তাদের ধরার চেষ্টা করা থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন।
স্থানীয় উদ্যোগের পাশাপাশি পাখিদের আবাসস্থল ও খাবারের উৎস সংরক্ষণ করা গেলে এ ধরনের প্রাকৃতিক দৃশ্য দীর্ঘদিন ধরে উপভোগ করা সম্ভব হবে।
নওগাঁর দোনাইল গ্রামের সবুজ মাঠে হীরামন টিয়াদের এই রঙিন উপস্থিতি তাই কেবল চোখের প্রশান্তি নয়; এটি মানুষ ও প্রকৃতির সহাবস্থানেরও এক সুন্দর উদাহরণ। সবুজের বুকে ডানা মেলে উড়ে বেড়ানো পাখিদের এই উৎসব মনে করিয়ে দেয়—প্রকৃতিকে ভালোবাসা মানে তার সৌন্দর্য উপভোগ করার পাশাপাশি তাকে নিরাপদ রাখার দায়িত্বও গ্রহণ করা।



