২৮ অক্টোবর, ২০২৬ | বুধবারবাংলা: ১২ কার্তিক ১৪৩৩
বিবিধ

মেট্রোরেলে শিক্ষকের মৃত্যু : ‘একটি আক্ষেপই তাড়া করে ফিরছে, কেউ যদি আব্বুকে বসতে দিতেন’

3300fde4b2299469efa32c3eb0d2464f-6ae16587da6ff

ভিড়ের মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন বাবা। দাঁড়িয়ে থাকতে কষ্ট হচ্ছিল, তাই বসার জন্য আশপাশের যাত্রীদের কাছে অনুরোধও করেছিলেন। কিন্তু কেউ আসন ছেড়ে দেননি বলে অভিযোগ তাঁর ছেলের। কিছুক্ষণ পর মেট্রোরেলের মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। বাবার মৃত্যুর পর একটি আক্ষেপই বারবার তাড়া করে ফিরছে ছেলে নাকিবুর রহমানকে—কেউ যদি তাঁর বাবাকে একটু বসতে দিতেন!

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় সদস্য নাকিবুর রহমানের বাবা নজীবুর রহমান জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ছিলেন। গত ২৪ অক্টোবর মেট্রোরেলে করে শাহবাগ থেকে উত্তরা যাওয়ার পথে অসুস্থ হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সংবাদমাধ্যমের কাছে বাবার মৃত্যুর ঘটনা তুলে ধরতে গিয়ে নিজের এই আক্ষেপের কথা জানান নাকিবুর।

তিনি বলেন, ‘ছেলে হিসেবে আজীবন একটাই আক্ষেপ থাকবে, কেউ যদি আব্বুকে বসতে দিতেন। তাহলে হয়তো বাবা এভাবে নিচে না পড়ে, কারও কোলে মাথা রেখে মারা যেতে পারতেন।’

ভিড়ের মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়েন শিক্ষক

নাকিবুর রহমান জানান, গত ২৪ অক্টোবর সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গিয়েছিলেন তাঁর বাবা। অনুষ্ঠান শেষে বেলা তিনটার দিকে শাহবাগ মেট্রোস্টেশন থেকে উত্তরার উদ্দেশে ট্রেনে ওঠেন তিনি। তাঁর সঙ্গে ছিলেন বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক। বাবার মৃত্যুর ঘটনাটি পরে ওই সহকর্মীর কাছ থেকেই জানতে পারেন নাকিবুর।

কয়েক দিনের ছুটি শেষে সেদিন মেট্রোরেলে যাত্রীদের প্রচণ্ড ভিড় ছিল। বসার আসন না পেয়ে নজীবুর রহমান ও তাঁর সহকর্মী ভেতরের হাতল ধরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। যাত্রীদের ঠেলাঠেলিতে একপর্যায়ে দুজনের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়।

Advertisements

নাকিবুরের ভাষ্য অনুযায়ী, বেলা সাড়ে তিনটার দিকে ট্রেনটি শেওড়াপাড়া ও কাজীপাড়া স্টেশনের মধ্যবর্তী এলাকায় পৌঁছালে ভিড়ের মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়েন তাঁর বাবা। এ সময় বসার জন্য কয়েকবার আসনে থাকা যাত্রীদের কাছে অনুরোধ করেছিলেন তিনি। কিন্তু কেউ সাড়া দেননি বলে অভিযোগ করেন নাকিবুর।

এর এক থেকে দুই মিনিটের মধ্যেই মেঝেতে পড়ে যান নজীবুর রহমান।

সহযাত্রীরা এগিয়ে এলেও বাঁচানো যায়নি

নজীবুর রহমান পড়ে যাওয়ার পর আশপাশের যাত্রীরা তাঁকে তুলে ধরার চেষ্টা করেন। চিৎকার ও শোরগোল শুনে তাঁর সহকর্মীও সেখানে ফিরে আসেন। যাত্রীদের সহায়তায় তাঁকে পরীক্ষা করে সহকর্মী বুঝতে পারেন, তিনি আর বেঁচে নেই বলে নাকিবুরকে জানান। তাঁর ধারণা, মেট্রোরেলের ভেতরে পড়ে যাওয়ার সময়ই বাবার মৃত্যু হয়েছিল।

নাকিবুর জানান, তাঁর বাবার ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ ছিল। তাঁকে মেট্রোরেলের উত্তরা উত্তর স্টেশনে নামানোর পর আনসার সদস্যদের সহায়তায় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন করা হয়। পরে অ্যাম্বুলেন্সে করে তাঁকে উত্তরার ক্রিসেন্ট হাসপাতালে নেওয়া হয়।

বাবার সহকর্মীদের কাছ থেকে খবর পেয়ে হাসপাতালে ছুটে যান নাকিবুর। বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে চিকিৎসকেরা নজীবুর রহমানকে আনুষ্ঠানিকভাবে মৃত ঘোষণা করেন।

শেষ সময়ে পাশে ছিলেন না পরিবারের কেউ

বাবার মৃত্যুর সময় পরিবারের কোনো সদস্য তাঁর পাশে থাকতে পারেননি। নাকিবুর জানান, তাঁর মা ও ছোট ভাই ওমরাহ পালনের জন্য সৌদি আরবে ছিলেন। বিমানের টিকিটসংক্রান্ত জটিলতায় তাঁরা সময়মতো দেশে ফিরতে পারেননি। তাঁর বোন পরিবার নিয়ে নিউজিল্যান্ডে থাকেন। আরেক ভাইও সেখানে পড়াশোনা করেন। তাঁরাও বাবার মৃত্যুর পর দেশে আসতে পারেননি।

পরিবারের সদস্যদের অনুপস্থিতিতেই বরিশালের গৌরনদী উপজেলায় গ্রামের বাড়িতে নজীবুর রহমানকে দাফন করা হয়।

‘বয়স্ক মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল হোন’

বাবার মৃত্যুর ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে নাকিবুর রহমান বলেন, তিনি কাউকে দোষারোপ করতে চান না। যেকোনো মানুষই এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারেন বলে মনে করেন তিনি। তবে বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষের প্রতি সবার আরও সহানুভূতিশীল হওয়া প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন।

তাঁর আহ্বান, বয়স্ক মানুষের সঙ্গে বন্ধুসুলভ আচরণ করতে হবে এবং প্রয়োজনে তাঁদের সহযোগিতায় এগিয়ে আসতে হবে।

মেট্রোরেলের ভিড়ে ঘটে যাওয়া এই মৃত্যু পরিবারের জন্য গভীর শোকের কারণ হয়ে আছে। একই সঙ্গে ঘটনাটি জনপরিসরে বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষের প্রতি সহমর্মিতা এবং সামান্য সহযোগিতার গুরুত্বও সামনে এনেছে। কখনো কখনো একটি আসন ছেড়ে দেওয়া কিংবা কারও অসুস্থতা বুঝে পাশে দাঁড়ানোর মতো ছোট উদ্যোগও মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

Advertisements