ফেসবুকে মনিটাইজেশন চালু করেছেন?ই-রিটার্ন না দিলেই ৫ হাজার টাকা জরিমানা! ফেসবুক কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের যা জানা জরুরি

ফেসবুকে কনটেন্ট তৈরি করে আয় বা মনিটাইজেশন সুবিধা চালু করার পর অনেকেই মেটার নিয়ম মেনে ই-টিন (e-TIN) নিবন্ধন করেছেন। কিন্তু টিন নেওয়ার পর আয়কর রিটার্ন জমা না দিলে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে—এমন আলোচনা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের মধ্যে। তবে ই-টিন থাকলেই সবার ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা হবে, বিষয়টি এমন নয়।
আয়কর আইন, ২০২৩ অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন দাখিল না করার ক্ষেত্রে জরিমানার বিধান রয়েছে। তবে জরিমানার পরিমাণ নির্ভর করে করদাতার পরিস্থিতি, আগে আয় নিরূপণ হয়েছে কি না এবং সংশ্লিষ্ট আইনি বিধানের ওপর। তাই আতঙ্কিত না হয়ে নিজের করদায় ও রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নেওয়া জরুরি।
রিটার্ন জমা না দিলে জরিমানা কত?
আয়কর আইন, ২০২৩-এর ২৬৬ ধারায় নির্ধারিত সময়ে আয়কর রিটার্ন দাখিল না করার জন্য জরিমানার বিধান রয়েছে। এ ক্ষেত্রে উপকর কমিশনার আইন অনুযায়ী জরিমানা আরোপ করতে পারেন। তবে সবার জন্য একই অঙ্কের জরিমানা প্রযোজ্য নয়।
প্রদত্ত আইনি বিধানের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, যাঁদের আগে কখনো আয় নিরূপণ বা অ্যাসেসমেন্ট হয়নি, তাঁদের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ জরিমানার সীমা পাঁচ হাজার টাকা হতে পারে। অন্যদিকে, আগে আয় নিরূপণ হয়ে থাকলে সর্বশেষ নিরূপিত আয়ের ওপর প্রদেয় করের ৫০ শতাংশ অথবা এক হাজার টাকা—দুটির মধ্যে যেটি বেশি, তার ভিত্তিতে জরিমানা নির্ধারণের বিধান রয়েছে।
এ ছাড়া সর্বনিম্ন এক হাজার টাকা জরিমানা এবং রিটার্ন দাখিলে বিলম্ব অব্যাহত থাকলে প্রতিদিনের জন্য অতিরিক্ত ৫০ টাকা জরিমানার বিধানও উল্লেখ রয়েছে। তবে বাস্তবে জরিমানার পরিমাণ নির্ধারণের আগে সংশ্লিষ্ট ধারার পূর্ণাঙ্গ বিধান ও করদাতার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য শর্ত যাচাই করা প্রয়োজন।
শুধু ই-টিন থাকলেই কি রিটার্ন দিতে হবে?
অনেকে ব্যাংকঋণ, ট্রেড লাইসেন্স, সম্পত্তি নিবন্ধন কিংবা অন্য কোনো প্রয়োজনীয় সেবা নিতে ই-টিন নিবন্ধন করেন। আবার ফেসবুক বা অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে মনিটাইজেশন সুবিধা চালু করতেও অনেকে টিন নিয়েছেন।
কিন্তু ই-টিন থাকা এবং আয়কর রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা—দুটি বিষয় এক নয়। কারও রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক কি না, তা নির্ভর করে তাঁর আয়, পেশা, আর্থিক অবস্থা এবং আইনে নির্ধারিত অন্যান্য শর্তের ওপর। আয় করমুক্ত সীমার নিচে থাকলেও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে রিটার্ন দাখিল করতে হতে পারে।
যাঁদের রিটার্ন দাখিল করা বাধ্যতামূলক হতে পারে
আয়কর আইন অনুযায়ী বিভিন্ন শ্রেণির করদাতার জন্য রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক। এর মধ্যে রয়েছে—
-যাঁদের বার্ষিক আয় নির্ধারিত করমুক্ত সীমা অতিক্রম করে।
-সরকারি চাকরিজীবী এবং আইন অনুযায়ী রিটার্ন দাখিলে বাধ্য নির্দিষ্ট পেশাজীবী।
-চিকিৎসক, প্রকৌশলী, আইনজীবীসহ নির্দিষ্ট পেশাজীবী সংগঠনের সদস্য, যাঁদের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আইনি শর্ত প্রযোজ্য।
-ব্যাংকঋণ, সম্পত্তি নিবন্ধন বা নির্দিষ্ট সরকারি-বেসরকারি সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে যাঁদের রিটার্ন জমার প্রমাণ দেখাতে হয়।
-মোটরযানের নিবন্ধন বা নবায়নের মতো নির্দিষ্ট সেবা গ্রহণকারী ব্যক্তি, যাঁদের ক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ বাধ্যতামূলক।
-কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার পরিচালক বা শেয়ারহোল্ডার কর্মচারী এবং আইনে উল্লেখিত অন্যান্য শ্রেণির করদাতা।
তবে এসব ক্ষেত্রে ব্যক্তির অবস্থান ও সংশ্লিষ্ট সেবার জন্য কার্যকর বিধান যাচাই করা প্রয়োজন। তালিকার কোনো একটি শ্রেণিতে পড়লেই সব পরিস্থিতিতে একই নিয়ম প্রযোজ্য হবে, এমন নয়।
আয় না থাকলে বা করযোগ্য আয় না হলে করণীয়
ই-টিন খোলার পর কারও আয় বন্ধ হয়ে যেতে পারে, আবার কারও আয় থাকলেও তা করমুক্ত সীমার নিচে থাকতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে প্রথমে দেখতে হবে, তাঁর রিটার্ন দাখিল করা আইনত বাধ্যতামূলক কি না।
রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক হলে করযোগ্য আয় না থাকলেও প্রকৃত আয়, ব্যয়, সম্পদ ও দায়ের তথ্য সঠিকভাবে উল্লেখ করে রিটার্ন জমা দিতে হবে। আয় করযোগ্য না হলে হিসাব অনুযায়ী প্রদেয় কর শূন্য হতে পারে। তবে শূন্য কর এবং সব ক্ষেত্রে শূন্য আয়ের রিটার্ন এক বিষয় নয়।
উদাহরণস্বরূপ, কারও মাসিক আয় ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা হলে রিটার্নে প্রকৃত আয়ের তথ্যই উল্লেখ করতে হবে। কর হিসাবের পর প্রদেয় কর শূন্য হতে পারে, কিন্তু সে কারণে আয়ের ঘরে শূন্য লেখা সঠিক হবে না। আয় বা সম্পদের বিষয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল তথ্য দেওয়া আইনি জটিলতা তৈরি করতে পারে।
এ ছাড়া আয়কর রিটার্নের ক্ষেত্রে ‘জিরো রিটার্ন’ কথাটি ব্যবহার করা হলেও এর অর্থ সব ঘরে শূন্য বসিয়ে ফরম জমা দেওয়া নয়। বরং প্রকৃত আর্থিক তথ্যের ভিত্তিতে সঠিক হিসাব উপস্থাপন করাই গুরুত্বপূর্ণ।
কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের কী করা উচিত?
ফেসবুক, ইউটিউব কিংবা অন্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকে আয় করা ব্যক্তিদেরও নিজেদের আয়ের হিসাব সংরক্ষণ করা উচিত। মনিটাইজেশন থেকে পাওয়া অর্থ, সংশ্লিষ্ট খরচ এবং অন্যান্য আয়ের তথ্য নিয়মিত নথিভুক্ত রাখলে রিটার্ন প্রস্তুত করা সহজ হয়।
যাঁরা শুধু মনিটাইজেশনের শর্ত পূরণের জন্য ই-টিন নিয়েছেন, তাঁদেরও নিজের করদায় ও রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা যাচাই করা প্রয়োজন। শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া জরিমানার খবরের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত না নিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নির্দেশনা অনুসরণ করা উচিত।
রিটার্নের অবস্থা ও অনলাইন করসেবা সম্পর্কে জানতে এনবিআরের ই-রিটার্ন পোর্টাল etaxnbr.gov.bd ব্যবহার করা যেতে পারে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর সার্কেল বা আয়কর বিষয়ে অভিজ্ঞ পেশাজীবীর পরামর্শ নেওয়া ভালো।
সবশেষে, ই-টিন থাকলেই সবার পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা হবে—এমন ধারণা সঠিক নয়। তবে যাঁদের রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক, তাঁদের নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন জমা দেওয়া এবং নিজের প্রকৃত আর্থিক তথ্য প্রকাশ করা জরিমানা ও অন্যান্য আইনি জটিলতা এড়ানোর গুরুত্বপূর্ণ উপায়।



