২৮ অক্টোবর, ২০২৬ | বুধবারবাংলা: ১২ কার্তিক ১৪৩৩
বিবিধ

২০২৬ সালের বর্ষসেরা শব্দ ‘ম্যাক্সিং’, এর অর্থ কী?

7.jpg

নিজেকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলা, ঘুমের মান বাড়ানো কিংবা খাদ্যাভ্যাসকে আরও স্বাস্থ্যকর করা—জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সেরাটা পাওয়ার চেষ্টাকে এখন বলা হচ্ছে ‘ম্যাক্সিং’ (Maxxing)। ইন্টারনেট সংস্কৃতিতে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠা এই শব্দকেই ২০২৬ সালের বর্ষসেরা শব্দ হিসেবে নির্বাচন করেছে অভিধানবিষয়ক ওয়েবসাইট ডিকশনারি ডটকম।

শব্দটির ব্যবহার এখন আর ব্যক্তিগত জীবনযাপন বা সৌন্দর্যচর্চায় সীমাবদ্ধ নেই। খাবার, ব্যায়াম, প্রেম, কর্মক্ষেত্রে দক্ষতা বৃদ্ধি, এমনকি সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হচ্ছে ‘ম্যাক্সিং’। এর মাধ্যমে মূলত কোনো কিছুর সর্বোচ্চ সুবিধা নেওয়া কিংবা নির্দিষ্ট একটি ক্ষেত্রে যতটা সম্ভব উন্নতি করার প্রবণতা বোঝানো হয়।

‘ম্যাক্সিং’ শব্দের অর্থ কী?

‘ম্যাক্সিং’ শব্দটি এসেছে ইংরেজি ‘ম্যাক্সিমাইজিং’ (Maximizing) থেকে। কোনো কিছুকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া বা তার সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করাই এর মূল ধারণা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শব্দটি ব্যবহার করে মানুষ নিজেদের দৈনন্দিন অভ্যাস, লক্ষ্য ও উন্নতির প্রচেষ্টাকে প্রকাশ করছে।

যেমন, ভালো ঘুমের জন্য ঘুমের রুটিন ও পরিবেশ উন্নত করার চেষ্টাকে বলা হয় ‘স্লিপম্যাক্সিং’। খাদ্যতালিকায় প্রোটিনের পরিমাণ বাড়ানোকে বলা হচ্ছে ‘প্রোটিনম্যাক্সিং’। আবার পোশাক, ত্বকের যত্ন, চুলের পরিচর্যা ও ব্যায়ামের মাধ্যমে বাহ্যিক সৌন্দর্য বাড়ানোর প্রচেষ্টার নাম ‘লুকসম্যাক্সিং’। ঘরকে আরও আরামদায়ক করে তোলা কিংবা অবসরকে উপভোগ্য করার প্রবণতাকে বলা হচ্ছে ‘কোজিম্যাক্সিং’।

এক বছরে ব্যবহার বেড়েছে প্রায় ১৯ গুণ

Advertisements

ডিকশনারি ডটকমের গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্টে ডিজিটাল মাধ্যমে ‘ম্যাক্সিং’ শব্দটির ব্যবহার আগের বছরের মাসিক গড়ের তুলনায় প্রায় ১৯ গুণ বেড়েছিল। এই বৃদ্ধি থেকেই বোঝা যায়, শব্দটি কীভাবে ইন্টারনেটের ভাষা ও তরুণদের দৈনন্দিন কথাবার্তায় জায়গা করে নিয়েছে।

ডিকশনারি মিডিয়া গ্রুপের লেক্সিকোগ্রাফি বিভাগের পরিচালক স্টিভ জনসনের মতে, শব্দটি আধুনিক জীবনের একটি স্ববিরোধী চিত্র তুলে ধরে। একদিকে মানুষ প্রতিনিয়ত নিজেকে উন্নত করতে এবং প্রতিটি কাজ থেকে আরও বেশি অর্জন করতে চায়। অন্যদিকে, সবকিছু নিখুঁত করার এই অবিরাম চেষ্টা যে ক্লান্তিকর ও কখনো কখনো অযৌক্তিক হয়ে উঠতে পারে, সেই উপলব্ধিও তৈরি হচ্ছে।

কর্মক্ষেত্র থেকে প্রেম—সবখানেই ‘ম্যাক্সিং’

প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শব্দটির নতুন নতুন প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে। কর্মক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সরঞ্জাম থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা নেওয়ার প্রবণতাকে বলা হচ্ছে ‘টোকেনম্যাক্সিং’। খাবারের মাধ্যমে শরীরে আঁশের পরিমাণ বাড়ানোর প্রচেষ্টার নাম ‘ফাইবারম্যাক্সিং’।

প্রেম ও সম্পর্কের ক্ষেত্রেও তৈরি হয়েছে নতুন শব্দ। ‘জেস্টারম্যাক্সিং’ বলতে কৌতুক বা হাস্যরসের মাধ্যমে অন্যের মনোযোগ ও আকর্ষণ অর্জনের চেষ্টাকে বোঝানো হয়। অর্থাৎ, নিজের কোনো একটি বৈশিষ্ট্যকে কাজে লাগিয়ে সামাজিক বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়ার ধারণাও এর সঙ্গে যুক্ত।

সৌন্দর্যচর্চার আড়ালে ঝুঁকিপূর্ণ প্রবণতা

‘ম্যাক্সিং’ শব্দটির জনপ্রিয়তার পাশাপাশি এর কিছু নেতিবাচক দিকও রয়েছে। বিশেষ করে ‘লুকসম্যাক্সিং’ অনলাইন ইনসেল ও পুরুষতান্ত্রিক মনোভাবসম্পন্ন কিছু কমিউনিটিতে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এসব অনলাইন গোষ্ঠীতে শারীরিক আকর্ষণ বাড়ানোর বিভিন্ন পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা হয়।

এর মধ্যে ত্বকের যত্ন, ব্যায়াম, পরিচ্ছন্নতা ও পোশাকের মতো স্বাভাবিক অভ্যাস যেমন রয়েছে, তেমনি কিছু বিপজ্জনক পদ্ধতিও প্রচারিত হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে, ক্ল্যাভিকুলার নামে পরিচিত ইনফ্লুয়েন্সার ব্র্যাডেন পিটার্সের ‘বোন স্ম্যাশিং’ অনুশীলনের কথা উল্লেখ করা হয়। এতে মুখের হাড়ের গঠন বদলানোর উদ্দেশ্যে মুখে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করার মতো বিপজ্জনক কাজ দেখানো হয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এ ধরনের প্রচেষ্টা গুরুতর আঘাতের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

এ কারণে নিজেকে উন্নত করার প্রচেষ্টা আর অবাস্তব সৌন্দর্যের মানদণ্ড পূরণের জন্য বিপজ্জনক আচরণে জড়িয়ে পড়ার মধ্যে পার্থক্য করা জরুরি।

ভিডিও গেম থেকে দৈনন্দিন জীবনে

‘ম্যাক্সিং’ ধারণার শিকড় রয়েছে ভিডিও গেমের জগতে। সেখানে ‘মিন-ম্যাক্সিং’ বলতে কোনো চরিত্রের দুর্বলতা কমিয়ে তার শক্তিশালী দিকগুলোকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নেওয়ার কৌশল বোঝানো হতো। সময়ের সঙ্গে গেমিংয়ের এই ধারণা ইন্টারনেট সংস্কৃতির মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে জীবনের নানা ক্ষেত্রে।

এমনকি সামরিক ক্ষেত্রেও শব্দটির ব্যবহার দেখা গেছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সামরিক বাহিনীর প্রাণঘাতী সক্ষমতা বাড়ানোর ধারণা বোঝাতে ‘লিথ্যালিটিম্যাক্সিং’ শব্দটি ব্যবহার করেছে।

সব সময় নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রয়োজন নেই

ম্যাক্সিংয়ের জনপ্রিয়তার মধ্যে আরেকটি বিপরীত প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে। ‘নাথিংম্যাক্সিং’ বলতে কিছু না করার মধ্যেও তৃপ্তি খুঁজে নেওয়াকে বোঝানো হয়। অন্যদিকে, ‘ননাম্যাক্সিং’ ধারণাটি ইতালীয় দাদিদের ধীরস্থির জীবনযাপন, ঘরে রান্না করা, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো এবং সামাজিক সম্পর্কের যত্ন নেওয়ার অভ্যাস থেকে অনুপ্রেরণা নেয়।

এই প্রবণতাগুলো দেখায়, জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে উৎপাদনশীল করে তোলার পাশাপাশি বিশ্রাম, অবসর ও সম্পর্কের জন্য সময় রাখার প্রতিও মানুষের আগ্রহ রয়েছে।

অন্য শব্দকে পেছনে ফেলে সেরা ‘ম্যাক্সিং’

২০২৬ সালের বর্ষসেরা শব্দ নির্বাচনে ‘অ্যাফোর্ডেবিলিটি’, ‘ডেটা সেন্টার’, ‘ওডিসি’ ও ‘আঙ্ক’-এর মতো শব্দকে পেছনে ফেলেছে ‘ম্যাক্সিং’। এর আগে ২০২৫ সালের বর্ষসেরা শব্দ হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিল ‘৬৭’ (67), যা তরুণদের অনলাইন সংস্কৃতিতে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।

‘ম্যাক্সিং’-এর জনপ্রিয়তা শুধু নতুন একটি শব্দের প্রচলন নয়; এটি এমন এক সময়ের প্রতিফলন, যখন মানুষ ব্যক্তিগত উন্নতি, সৌন্দর্য, দক্ষতা ও সাফল্যের জন্য ক্রমাগত নতুন উপায় খুঁজছে। তবে এই প্রবণতার পাশাপাশি বিশ্রাম নেওয়া, নিজের সীমাবদ্ধতা মেনে চলা এবং সুস্থ জীবনযাপনের গুরুত্বও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

Advertisements