২৬ অক্টোবর, ২০২৬ | সোমবারবাংলা: ১০ কার্তিক ১৪৩৩
পরিবেশ

বরফের বুকে রহস্যময় রক্তের ঝরনা

বরফের বুকে রহস্যময় রক্তের ঝরনা

চারদিকে বরফের সাদা চাদর। তারই বুক চিরে গড়িয়ে পড়ছে রক্তের মতো গাঢ় লাল পানি। কোনও ভয়ংকর ঘটনার চিহ্ন নয়, প্রকৃতির এক বিস্ময়কর খেলা। অ্যান্টার্কটিকার ‘ব্লাড ফলস’ বা রক্তপ্রপাতের এই দৃশ্য বিজ্ঞানীদের কাছেও দীর্ঘদিন ছিল রহস্যের।

পৃথিবীর দক্ষিণ প্রান্তে বরফে ঢাকা অ্যান্টার্কটিকা। তাপমাত্রা হিমাঙ্কের অনেক নিচে, চারদিকে বরফ আর পাথুরে উপত্যকা। এমন জায়গাতেই রয়েছে এই অদ্ভুত প্রাকৃতিক বিস্ময়—সাদা বরফের গা বেয়ে নেমে আসছে লালচে পানি। দূর থেকে দেখলে মনে হবে, বরফের মধ্যে কোথাও যেন রক্তের ধারা বয়ে চলেছে। এই দৃশ্যের জন্যই জায়গাটির নাম হয়েছে ‘ব্লাড ফলস’।

অ্যান্টার্কটিকার টেলর হিমবাহের প্রান্তে, ম্যাকমার্ডো ড্রাই ভ্যালিস অঞ্চলে দেখা যায় এই লাল প্রবাহ। ১৯১১ সালে ব্রিটিশ ভূতত্ত্ববিদ টমাস গ্রিফিথ টেলর প্রথম এই অস্বাভাবিক দৃশ্যের কথা নথিবদ্ধ করেন। তার নামেই হিমবাহটির নাম টেলর গ্লেসিয়ার। বরফের সাদা পটভূমিতে লাল পানির এমন বৈপরীত্য স্বাভাবিকভাবেই গবেষকদের কৌতূহল বাড়িয়ে দেয়।

প্রথম দিকে এই লাল রঙের কারণ নিয়ে নানা প্রশ্ন ছিল। পানিতে কোনও বিশেষ অণুজীব রয়েছে কি না, কিংবা অন্য কোনও প্রাকৃতিক উপাদান এই রঙের জন্য দায়ী কি না, তা খতিয়ে দেখতে শুরু করেন বিজ্ঞানীরা। সময়ের সঙ্গে গবেষণায় ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়, এই ঘটনার পেছনে রয়েছে বরফের গভীরে লুকিয়ে থাকা লবণাক্ত পানির ভাণ্ডার।

ব্লাড ফলসের পানিতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে লবণ ও লোহা। হিমবাহের নিচে আটকে থাকা এই লবণাক্ত পানি বরফের ফাঁক দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে। পানিতে থাকা লোহা বাতাসের সংস্পর্শে এসে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় জারিত হয়। অনেকটা লোহার গায়ে মরচে পড়ার মতোই এই প্রক্রিয়ায় পানির রং লালচে হয়ে ওঠে।

অর্থাৎ, রক্তের মতো দেখালেও এই প্রবাহে লাল রঙের কারণ রক্ত নয়। বরং বরফের গভীরে থাকা খনিজসমৃদ্ধ পানির সঙ্গে বাতাসের রাসায়নিক বিক্রিয়াই তৈরি করেছে এমন অস্বাভাবিক দৃশ্য। গবেষণায় এই পানির উৎসের সঙ্গে প্রাচীন সামুদ্রিক পানির সম্পর্কেরও ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছে।

Advertisements

ব্লাড ফলসের সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক শুধু তার লাল রং নয়। হিমবাহের নিচে থাকা অন্ধকার, প্রচণ্ড ঠান্ডা ও অক্সিজেনস্বল্প পরিবেশেও অণুজীবের অস্তিত্ব পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। সেখানে সূর্যের আলো পৌঁছায় না, সাধারণ পরিবেশের মতো জীবনধারণের সুযোগও সীমিত। তবু কিছু অণুজীব লোহা ও সালফারের মতো রাসায়নিক উপাদানের সঙ্গে যুক্ত প্রক্রিয়া থেকে শক্তি সংগ্রহ করে বেঁচে থাকতে পারে।

এই আবিষ্কার শুধু পৃথিবীর চরম পরিবেশে জীবনের অভিযোজন বোঝার ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, অন্য বরফাচ্ছাদিত জগতে প্রাণের সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রেও আগ্রহ তৈরি করেছে। মঙ্গল গ্রহের মতো জায়গায় জীবনের উপযোগী পরিবেশের সন্ধানেও এমন গবেষণা বিজ্ঞানীদের নতুন প্রশ্ন করতে সাহায্য করে।

ব্লাড ফলসের পানি কখনও প্রবাহিত হয়, আবার কখনও তার প্রবাহের ধরন বদলে যায়। হিমবাহের নিচে থাকা লবণাক্ত পানির ভাণ্ডার, বরফের গঠন এবং পানির চলাচলের এই প্রাকৃতিক ঘটনা এখনও গবেষণার বিষয়।

সাদা বরফের গায়ে রক্তের মতো লাল রেখা দেখে প্রথমে ভয় লাগতে পারে। কিন্তু সেই ভয়ংকর সৌন্দর্যের আড়ালে রয়েছে ভূতত্ত্ব, রসায়ন ও অণুজীববিজ্ঞানের এক আশ্চর্য সংমিশ্রণ। প্রকৃতির এমন অনেক রহস্য রয়েছে, যা চোখে দেখা যায় সহজেই। কিন্তু তার আসল কারণ বুঝতে বিজ্ঞানকে পাড়ি দিতে হয় বরফের বহু গভীরে। ব্লাড ফলস এমনই এক প্রাকৃতিক রহস্য।

Advertisements