পুরান ঢাকার ইটপাথরের শহরে পাখিদের জন্য এক টুকরো ‘আকাশনীড়’

পুরান ঢাকার ব্যস্ত জনসন রোড। চারপাশে উঁচু দালান, যানবাহনের শব্দ আর মানুষের ব্যস্ততা—ইটপাথরের এই শহুরে দৃশ্যের মাঝেই যেন প্রকৃতির জন্য তৈরি হয়েছে এক ছোট্ট আশ্রয়। ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের তিনতলা ভবনের ছাদে গড়ে তোলা হয়েছে পাখিদের জন্য বিশেষ এক ঠিকানা—‘আকাশনীড়’।
প্রায় ১১ হাজার বর্গফুটের বিশাল ছাদটি এতদিন অনেকটাই ফাঁকা পড়ে ছিল। সেই ছাদেই এখন শোভা পাচ্ছে নানা ধরনের ফুল ও ফলের গাছ। সঙ্গে রয়েছে পাখিদের পান করার জন্য পানির ব্যবস্থা, গা ভেজানোর ছোট জলাধার এবং খাবারের আয়োজন। লক্ষ্য একটাই—শহরের হারিয়ে যেতে বসা পাখিদের আবার ফিরিয়ে আনা।
‘পাখির রাজ্যে স্বাগতম’—এই ভাবনাকে সামনে রেখেই ঢাকা জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে তৈরি হয়েছে ছাদবাগানটি। গত ১৬ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিভাগের কমিশনার মো. মনিরুজ্জামান মিঞা ‘আকাশনীড়’ উদ্বোধন করেন। জেলা প্রশাসন, বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১০ লাখ টাকা।
শহরের ব্যস্ততার মধ্যে পাখিদের এমন একটি নিরাপদ জায়গা তৈরি করার ভাবনাটি আসে ঢাকা জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ফরিদা খানমের কাছ থেকে। গত ২২ এপ্রিল দায়িত্ব নেওয়ার পর একদিন ভবনের ছাদে গিয়ে তিনি দেখেন, বিশাল জায়গাটি প্রায় পুরোটাই খালি। সেখানে সোলার প্যানেল বসানোর কাজের পাশাপাশি তাঁর চোখে পড়ে আকাশে উড়ে বেড়ানো পাখিদের। সেই দৃশ্য থেকেই জন্ম নেয় ‘আকাশনীড়’-এর ভাবনা।
ফরিদা খানমের ভাষায়, ছোটবেলায় গ্রামের পরিবেশে পাখির কিচিরমিচির শুনে বড় হয়েছেন তিনি। কিন্তু শহরের ইটপাথরের ভিড়ে সেই পরিচিত শব্দ ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে। তাই শহরের বুকেই আবার পাখির ডাক ফিরিয়ে আনার একটি ছোট্ট চেষ্টা হিসেবে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ছাদবাগানটি তৈরিতে সহায়তা করেছে নগর সবুজায়নে কাজ করা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গ্রিন সেভার্স। পাখিদের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিয়েই সাজানো হয়েছে পুরো জায়গাটি। বর্তমানে এখানে ৫৮ প্রজাতির মোট ৪১৮টি গাছ রয়েছে। এরই মধ্যে গাছগুলো ডালপালা মেলে সবুজ হতে শুরু করেছে। কোথাও ফুটেছে সাদা জবা, কোথাও গোলাপি বাগানবিলাস। কয়েকটি গাছে দেখা যাচ্ছে ফলের উপস্থিতিও। কামরাঙাসহ বিভিন্ন ফলের গাছ ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে। গাছগুলো আরও ঘন হলে এই ছাদ যে পাখিদের জন্য আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে, সেই প্রত্যাশাই এখন সংশ্লিষ্টদের।
তবে ‘আকাশনীড়’ তৈরির পরপরই যে পাখিদের ভিড় জমে গেছে, তা নয়। গত ৩০ সেপ্টেম্বর বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সেখানে গিয়ে পাখির দেখা মেলেনি। মানুষের আনাগোনা কিংবা নতুন পরিবেশের সঙ্গে এখনও অভ্যস্ত না হওয়াকে এর অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সেদিন অবশ্য একটি বানরকে বেশ নির্ভয়ে ছাদের ওপর দিয়ে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়।
কর্মকর্তারা জানান, অন্য সময়ে এই এলাকায় পাখির পাশাপাশি বেজি, খরগোশ, কাঠবিড়ালি ও বানরেরও দেখা মেলে। নতুন গাছগুলো এখনও পুরোপুরি বড় হয়নি, ফলও তেমন ধরেনি। ফলে খাবার ও পানির এই নতুন ঠিকানার খবর আশপাশের প্রাণীরা এখনও পুরোপুরি পায়নি—এমনটাই ধারণা তাঁদের। তবে অপেক্ষার ফল মিলতেও শুরু করেছে। পরদিন জেলা প্রশাসনের পাঠানো ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, আশপাশ থেকে কয়েকটি পাখি এসে ছাদবাগানে খাবার খাচ্ছে। অর্থাৎ ‘আকাশনীড়’-এর খবর ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে পাখিদের মধ্যেও।
জেলা প্রশাসনের আশা, সময়ের সঙ্গে গাছপালা আরও ঘন হবে, বাড়বে ফুল ও ফল। তখন পাখিদের আনাগোনাও বাড়বে। একসময় পুরান ঢাকার ব্যস্ত নগরজীবনের মাঝখানে এই ছাদ হয়ে উঠতে পারে পাখিদের নিরাপদ আশ্রয়। ইট-কংক্রিটের শহরে প্রকৃতির জায়গা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। সেই বাস্তবতায় ‘আকাশনীড়’ হয়তো খুব বড় কোনো উদ্যোগ নয়। কিন্তু একটি ব্যস্ত নগরের ছাদে পাখিদের জন্য পানি, খাবার, গাছ আর নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা—প্রকৃতির কাছে ফিরে যাওয়ার জন্য এটি হতে পারে একটি ছোট্ট জানালা। আর সেই জানালা দিয়ে একদিন হয়তো আবার ভেসে আসবে হারিয়ে যেতে বসা পাখির কিচিরমিচির।



