আজ জাতীয় কুমড়া দিবস, জেনে নিন এই সবজি নিয়ে ৭ মজার তথ্য

মিষ্টি কুমড়া বাংলাদেশের মানুষের কাছে অত্যন্ত পরিচিত একটি সবজি। দেশের প্রায় সব অঞ্চলেই পাওয়া যায় পুষ্টিকর এই খাবারটি। ভাজি, ভর্তা, ডাল কিংবা মাছের সঙ্গে রান্না করে কুমড়া খাওয়ার প্রচলন রয়েছে। এ ছাড়া মিষ্টি কুমড়া দিয়ে তৈরি করা যায় নানা ধরনের সুস্বাদু খাবার। তবে কুমড়ার পরিচিতি শুধু রান্নাঘরেই সীমাবদ্ধ নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এটি উৎসব, ঐতিহ্য ও সাজসজ্জারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
প্রতি বছর ২৬ অক্টোবর পালিত হয় জাতীয় কুমড়া দিবস বা ন্যাশনাল পাম্পকিন ডে। দিনটি কুমড়ার বহুমুখী ব্যবহার, পুষ্টিগুণ ও জনপ্রিয়তা সম্পর্কে মানুষকে জানার সুযোগ করে দেয়। বিশেষ করে শরৎকালীন উৎসব ও হ্যালোইন উদ্যাপনে কুমড়ার ব্যবহার ব্যাপকভাবে দেখা যায়। কুমড়া দিয়ে তৈরি খাবার থেকে শুরু করে নান্দনিক সাজসজ্জা—সবকিছুতেই রয়েছে এই সবজির বিশেষ উপস্থিতি।
জাতীয় কুমড়া দিবসের সূচনা ঠিক কবে এবং কীভাবে হয়েছিল, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য সীমিত। তবে যুক্তরাষ্ট্রে ২৬ অক্টোবর দিনটি পালনের প্রচলন রয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দিবসের তালিকায় কানাডা ও যুক্তরাজ্যেও এই দিনটি পালনের উল্লেখ পাওয়া যায়। যদিও সব দেশে দিবসটি একইভাবে উদ্যাপিত হয় না এবং এটি কোনো সরকারি জাতীয় ছুটির দিনও নয়।
কুমড়ার সঙ্গে শরৎকালীন উৎসবের সম্পর্ক বেশ পুরোনো। যুক্তরাষ্ট্রে থ্যাংকসগিভিং উৎসবে কুমড়ার পাই বেশ জনপ্রিয়। কুমড়ার শাঁস, দুধ, ডিম, চিনি ও বিভিন্ন মসলা দিয়ে তৈরি করা হয় এই মিষ্টি খাবার। অন্যদিকে, ৩১ অক্টোবর হ্যালোইন উৎসবে কুমড়ার ব্যবহার বিশেষভাবে চোখে পড়ে। এ সময় কুমড়ার গায়ে চোখ, নাক ও মুখের নকশা কেটে ভেতরে আলো জ্বালানো হয়। সাজানো এই কুমড়াকে বলা হয় ‘জ্যাক-ও-ল্যান্টার্ন’।
এই প্রথার সঙ্গে আয়ারল্যান্ডের পুরোনো লোককথার সম্পর্ক রয়েছে। একসময় সেখানে কুমড়ার পরিবর্তে শালগমের মতো সবজিতে নকশা কেটে আলো জ্বালানোর প্রচলন ছিল। পরে যুক্তরাষ্ট্রে কুমড়া সহজলভ্য হওয়ায় হ্যালোইনের সাজসজ্জায় এটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
কুমড়ার পুষ্টিগুণ ও স্বাস্থ্য উপকারিতা
কুমড়া শুধু স্বাদে ভালো নয়, পুষ্টিগুণের দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। এতে রয়েছে বিটা-ক্যারোটিন, বিভিন্ন ভিটামিন, খনিজ উপাদান, খাদ্যআঁশ ও পানি। সুষম খাদ্যতালিকার অংশ হিসেবে কুমড়া খেলে শরীর প্রয়োজনীয় কিছু পুষ্টি উপাদান পেতে পারে।
চোখের স্বাস্থ্যের জন্য কুমড়া উপকারী হতে পারে। এতে থাকা বিটা-ক্যারোটিন শরীরে ভিটামিন এ তৈরিতে সাহায্য করে। ভিটামিন এ স্বাভাবিক দৃষ্টিশক্তি বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এ ছাড়া কুমড়ায় থাকা ভিটামিন এ ও ভিটামিন সি শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার স্বাভাবিক কার্যক্রমে সহায়তা করে। তবে শুধু কুমড়া খাওয়ার মাধ্যমে সব ধরনের রোগ থেকে সুরক্ষিত থাকা সম্ভব নয়। সুস্থ থাকতে সুষম খাবার ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন জরুরি।
কুমড়ার খাদ্যআঁশ হজমপ্রক্রিয়া এবং অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে সাহায্য করে। পর্যাপ্ত পানি পান ও অন্যান্য আঁশযুক্ত খাবারের সঙ্গে কুমড়া খেলে কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধেও উপকার পাওয়া যেতে পারে।
কুমড়ায় পানির পরিমাণ বেশি এবং ক্যালরি তুলনামূলক কম। তাই পরিমিত পরিমাণে খেলে এটি পেট ভরা রাখতে সহায়তা করতে পারে। তবে রান্নায় অতিরিক্ত তেল, ঘি বা চিনি ব্যবহার করলে খাবারের ক্যালরির পরিমাণ বেড়ে যায়।
কুমড়ায় পটাশিয়ামের মতো প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদানও রয়েছে। পটাশিয়াম পেশির স্বাভাবিক কার্যক্রম এবং শরীরের তরল ভারসাম্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কুমড়া নিয়ে ৭টি মজার তথ্য
১. রান্নায় সবজি, উদ্ভিদবিজ্ঞানে ফল: কুমড়াকে আমরা সাধারণত সবজি হিসেবে খেয়ে থাকি। তবে উদ্ভিদবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি ফল। কারণ ফুলের গর্ভাশয় থেকে কুমড়া তৈরি হয় এবং এর ভেতরে বীজ থাকে।
২. কুমড়ার বীজও পুষ্টিকর: কুমড়ার ভেতরের বীজ ফেলে না দিয়ে পরিষ্কার করে শুকিয়ে বা ভেজে খাওয়া যায়। এতে প্রোটিন, স্বাস্থ্যকর চর্বি ও বিভিন্ন খনিজ উপাদান পাওয়া যায়। তবে বীজ ভাজার সময় অতিরিক্ত লবণ ও তেল ব্যবহার না করাই ভালো।
৩. অ্যান্টার্কটিকা ছাড়া বিভিন্ন মহাদেশে কুমড়া চাষ হয়: বিশ্বের নানা অঞ্চলে কুমড়ার চাষ করা হয়। উষ্ণ ও অনুকূল আবহাওয়ায় এই গাছ ভালো জন্মে। তবে জাত ও পরিবেশের ওপর নির্ভর করে চাষের উপযোগিতা ভিন্ন হতে পারে।
৪. কুমড়ার ওজন হতে পারে কয়েকশ কেজি: সাধারণ কুমড়া সহজেই হাতে বহন করা যায়। কিন্তু বিশেষ জাতের কুমড়া প্রতিযোগিতার জন্য বিশাল আকারে চাষ করা হয়। এসব কুমড়ার ওজন কয়েকশ কেজি ছাড়িয়ে যেতে পারে। এমনকি বিশ্বে এক টনেরও বেশি ওজনের কুমড়া উৎপাদনের রেকর্ড রয়েছে।
৫. কুমড়ার ফুল দিয়েও তৈরি হয় খাবার: শুধু কুমড়ার ফল নয়, এর ফুলও বিভিন্ন দেশের রান্নায় ব্যবহার করা হয়। কুমড়ার ফুল দিয়ে ভাজা, পুর ভরা খাবার ও সালাদ তৈরি করা যায়। তবে ফুল সংগ্রহের ক্ষেত্রে গাছে ফল ধরার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
৬. হ্যালোইনের সাজসজ্জায় একসময় ব্যবহৃত হতো শালগম: বর্তমানে হ্যালোইন মানেই নকশা করা কুমড়া। তবে এই প্রথার পুরোনো রূপে আয়ারল্যান্ডে শালগমের মতো সবজি কেটে মুখের নকশা তৈরি করা হতো। পরে যুক্তরাষ্ট্রে কুমড়ার সহজলভ্যতা ও নকশা কাটার সুবিধার কারণে এটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
৭. সব কুমড়ার রং কমলা নয়: কুমড়া বলতে সাধারণত কমলা রঙের সবজির কথা মনে এলেও জাতভেদে এর রং সবুজ, হলুদ, সাদা কিংবা লালচে হতে পারে। শুধু রং নয়, বিভিন্ন জাতের কুমড়ার আকার, স্বাদ ও গঠনেও পার্থক্য রয়েছে।
কুমড়া আমাদের প্রতিদিনের খাবারের পরিচিত উপাদান হলেও এর পুষ্টিগুণ, বৈচিত্র্য ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব সম্পর্কে অনেকেরই বিস্তারিত জানা নেই। এই সবজি দিয়ে যেমন নানা ধরনের সুস্বাদু খাবার তৈরি করা যায়, তেমনি এর বীজও পুষ্টিকর খাবার হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব।
জাতীয় কুমড়া দিবস তাই কেবল একটি সবজিকে ঘিরে উদ্যাপনের উপলক্ষ নয়, বরং এর পুষ্টিগুণ ও বহুমুখী ব্যবহার সম্পর্কে জানারও সুযোগ। চাইলে এই দিনে কুমড়া দিয়ে নতুন কোনো পদ তৈরি করতে পারেন কিংবা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারেন কুমড়া নিয়ে জানা মজার তথ্যগুলো।



