২৬ অক্টোবর, ২০২৬ | সোমবারবাংলা: ১০ কার্তিক ১৪৩৩
জীবনযাপন

চোখের যত্নে কার্যকর ‘২০-২০-২০’ নিয়ম, যেভাবে কমাবেন স্ক্রিনের ক্লান্তি

how-to-improve-your-vision-in-7-days-easy-tips-687ddd94b7a42

স্মার্টফোন, কম্পিউটার কিংবা ট্যাবলেট—বর্তমান সময়ে দিনের বড় একটি অংশ কাটে ডিজিটাল পর্দার সামনে। পড়াশোনা, অফিসের কাজ, বিনোদন কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করতে গিয়ে দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা যেন দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু বিরতিহীনভাবে স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে চোখে ক্লান্তি, শুষ্কতা, জ্বালাপোড়া, মাথাব্যথা এবং সাময়িকভাবে ঝাপসা দেখার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। এসব অস্বস্তি কমাতে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শের মধ্যে রয়েছে সহজ একটি পদ্ধতি—‘২০-২০-২০’ নিয়ম।

সম্প্রতি ১২ বছর বয়সি এক শিশুর চোখের সমস্যা নিয়ে একটি ঘটনা বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এনেছে। শিশুটির বাবা-মা লক্ষ করেছিলেন, সে বারবার চোখ মুছছে এবং মাথাব্যথার অভিযোগ করছে। প্রথমে তারা বিষয়টিকে ট্যাবলেটে দীর্ঘ সময় ক্লাস করা, গেম খেলা ও ভিডিও দেখার কারণে হওয়া সাধারণ ক্লান্তি বলে মনে করেছিলেন। কিন্তু চিকিৎসকের কাছে নেওয়ার পর জানা যায়, শিশুটির মায়োপিয়া বা নিকটদৃষ্টির সমস্যা হয়েছে। ফলে তার দূরের বস্তু স্পষ্ট দেখতে চশমার প্রয়োজন হয়।

শিশুদের মধ্যে মায়োপিয়া হওয়ার পেছনে বংশগত বৈশিষ্ট্যসহ বিভিন্ন কারণ ভূমিকা রাখতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে কাছের বস্তুতে মনোযোগ দেওয়া এবং বাইরে কম সময় কাটানোর সঙ্গে এই সমস্যার ঝুঁকির সম্পর্ক রয়েছে। মায়োপিয়ার ক্ষেত্রে চোখের দৈর্ঘ্য বেড়ে যেতে পারে, ফলে আলো রেটিনার ওপর সরাসরি ফোকাস না হয়ে তার সামনে ফোকাস হয়। এতে দূরের বস্তু ঝাপসা দেখায়।

তবে দীর্ঘ সময় স্ক্রিন ব্যবহার করলেই যে সবার চোখের স্থায়ী ক্ষতি হবে, বিষয়টি এমন নয়। একটানা কাছের কোনো বস্তুর দিকে তাকিয়ে থাকলে চোখের ওপর চাপ পড়তে পারে এবং অস্বস্তি তৈরি হতে পারে। স্ক্রিন ব্যবহারের সময় মানুষ সাধারণত কম পলক ফেলে। এর ফলে চোখের ওপরের অশ্রুস্তর দ্রুত শুকিয়ে গিয়ে শুষ্কতা, জ্বালাপোড়া ও ঝাপসা দেখার সমস্যা দেখা দিতে পারে।

চোখের ক্লান্তি কমাতে কীভাবে কাজ করে ২০-২০-২০ নিয়ম?

এই নিয়মটি অনুসরণ করা বেশ সহজ। প্রতি ২০ মিনিট স্ক্রিন ব্যবহারের পর অন্তত ২০ সেকেন্ডের জন্য প্রায় ২০ ফুট দূরে অবস্থিত কোনো বস্তু বা স্থানের দিকে তাকাতে হবে। এতে কাছের বস্তুতে একটানা মনোযোগ ধরে রাখার চাপ থেকে চোখ কিছুটা বিরতি পায়।

Advertisements

নিয়মিত এই অভ্যাস গড়ে তুললে দীর্ঘ সময় কম্পিউটার বা মোবাইল ব্যবহারের কারণে তৈরি হওয়া চোখের অস্বস্তি কমাতে সহায়তা করতে পারে। তবে এটি চোখের সব ধরনের রোগ প্রতিরোধ করে না এবং মায়োপিয়ার চিকিৎসার বিকল্পও নয়।

চোখ ভালো রাখতে আরও যেসব অভ্যাস জরুরি

স্ক্রিন ব্যবহারের সময় সচেতনভাবে বারবার চোখের পলক ফেলতে হবে। এতে চোখের ওপর অশ্রুস্তর বজায় রাখতে সাহায্য হয় এবং শুষ্কতার সমস্যা কমতে পারে।

কম্পিউটার বা ল্যাপটপ ব্যবহারের সময় পর্দা থেকে উপযুক্ত দূরত্ব বজায় রাখা জরুরি। স্ক্রিন এমনভাবে রাখতে হবে, যাতে সেটি চোখের সমতলের সামান্য নিচে থাকে। পাশাপাশি ঘরের আলো এমন হওয়া উচিত, যাতে পর্দায় অতিরিক্ত ঝলক বা প্রতিফলন তৈরি না হয়।

চোখে অতিরিক্ত শুষ্কতা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী লুব্রিকেটিং আই ড্রপ ব্যবহার করা যেতে পারে। নিজের ইচ্ছায় যেকোনো ধরনের চোখের ড্রপ ব্যবহার না করাই ভালো।

স্ক্রিনের নীল আলো নিয়েও অনেকের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। তবে সাধারণ ডিজিটাল পর্দা থেকে নির্গত নীল আলো রেটিনার স্থায়ী ক্ষতি করে—এমন দাবির পক্ষে পর্যাপ্ত জোরালো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। যদিও রাতে অতিরিক্ত উজ্জ্বল স্ক্রিন ব্যবহার ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। তাই শুধু ব্লু-লাইট ফিল্টার বা বিশেষ চশমার ওপর নির্ভর না করে স্ক্রিন ব্যবহারে বিরতি নেওয়া, আলো নিয়ন্ত্রণ করা এবং ঘুমের আগে ডিভাইস ব্যবহারের সময় কমানো বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

শিশুদের চোখের যত্নে বাড়তি সতর্কতা

শিশুদের ক্ষেত্রে স্ক্রিন ব্যবহারের অভ্যাসের পাশাপাশি বাইরে খেলাধুলা ও সময় কাটানোর বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। দীর্ঘ সময় ঘরের মধ্যে থেকে মোবাইল বা ট্যাবলেট ব্যবহার করা এবং বাইরে কম সময় কাটানোর সঙ্গে শিশুদের মায়োপিয়ার ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

তাই শিশুদের দৈনন্দিন রুটিনে বাইরে খেলাধুলা, হাঁটাচলা এবং প্রাকৃতিক আলোতে সময় কাটানোর সুযোগ রাখতে হবে। বয়স অনুযায়ী স্ক্রিন ব্যবহারের সময় নির্ধারণ করা এবং দীর্ঘক্ষণ একটানা ডিভাইস ব্যবহার করতে না দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। শিশুরা দূরের বস্তু দেখতে সমস্যা অনুভব করলে কিংবা পড়ার সময় চোখ কুঁচকে তাকালে বিষয়টি অবহেলা না করে চোখ পরীক্ষা করানো উচিত।

কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?

স্ক্রিন ব্যবহারের পর সাময়িক ক্লান্তি অনেকেরই হতে পারে। কিন্তু নিয়মিত ঝাপসা দেখা, ঘন ঘন মাথাব্যথা, চোখে ব্যথা, অতিরিক্ত লাল হয়ে যাওয়া কিংবা দূরের বস্তু দেখতে অসুবিধা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। এসব লক্ষণকে শুধু অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহারের ফল ভেবে এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়।

হঠাৎ দৃষ্টিশক্তি কমে গেলে, তীব্র চোখের ব্যথা হলে কিংবা দৃষ্টির সঙ্গে নতুন কোনো গুরুতর সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে। নিয়মিত চোখ পরীক্ষা করানোও দৃষ্টিজনিত সমস্যা শনাক্ত করতে সহায়ক।

প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাপনে স্ক্রিন পুরোপুরি এড়িয়ে চলা কঠিন। তবে নিয়মিত বিরতি নেওয়া, চোখের পলক ফেলা, সঠিক দূরত্ব বজায় রাখা এবং শিশুদের বাইরে সময় কাটানোর সুযোগ করে দেওয়ার মতো ছোট অভ্যাস চোখের আরাম বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে। দৈনন্দিন জীবনে ‘২০-২০-২০’ নিয়মটি যুক্ত করাও হতে পারে চোখের যত্ন নেওয়ার একটি সহজ পদক্ষেপ।

Advertisements