২৪ অক্টোবর, ২০২৬ | শনিবারবাংলা: ৮ কার্তিক ১৪৩৩
স্বাস্থ্য

পাখি দেখলে সতেজ হয় মস্তিষ্ক, কমবে স্মৃতিভ্রম- বলছে গবেষণা

পাখি দেখলে সতেজ হয় মস্তিষ্ক, কমবে স্মৃতিভ্রম- বলছে গবেষণা

পাখি পর্যবেক্ষণ বা বার্ডওয়াচিং কেবল সাধারণ কোনো শখ নয়, এটি মানুষের মস্তিষ্কে বয়সের ছাপ পড়া ধীর করতে সাহায্য করে। পাশাপাশি ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রম রোগীদের চিকিৎসায়ও বার্ডওয়াচিং পদ্ধতি এখন থেরাপি হিসেবে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

বার্ডওয়াচিং শুধুমাত্র অবসর কাটানো বা প্রকৃতি থেকে আনন্দ নেওয়ার বিষয় নয়। নিয়মিত পাখি দেখা (বার্ডওয়াচিং) মানুষের মস্তিষ্কের গঠনকে নতুনভাবে রূপ দেয়। মানুষের স্মৃতিশক্তি ভুলে যাওয়ার যে প্রবণতা রয়েছে তার গতি ধীর করতে সহায়তা করে থাকে।

সাম্প্রতিক এক গবেষণায় স্নায়ুবিজ্ঞানীরা এমনটাই জানিয়েছেন। আন্তর্জাতিক গবেষকদের মতে, বাদ্যযন্ত্র শেখা কিংবা নিয়মিত খেলাধুলার মতো পাখি দেখাও মস্তিষ্কের নিউরোনাল সংযোগগুলোকে পুনর্গঠিত করে। শুধু স্মৃতিশক্তি বা মনোযোগ বৃদ্ধিতেই নয়, ডিমেনশিয়ায় (স্মৃতিভ্রম) আক্রান্ত রোগীদের আধুনিক মানসিক চিকিৎসায় থেরাপি হিসেবেও পাখি পর্যবেক্ষণের এই পদ্ধতি বিশ্বজুড়ে সাড়া ফেলছে।

প্রতি সপ্তাহে যুক্তরাজ্যের ওয়েস্ট মিডল্যান্ডসের ফোর্জ মিল লেকের পাশে একদল প্রবীণ পাখিপ্রেমী কাঠের তৈরি শেডের ভেতর ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটান। বাইনোকুলার দিয়ে তারা আকাশে ও জলাশয়ে থাকা নানা প্রজাতির পাখি পর্যবেক্ষণ করেন এবং আনন্দের সঙ্গে নিজেদের অনুভূতি ভাগাভাগি করে নেন। তাদের মধ্যে অনেকেই দিনে ঘটে যাওয়া সাধারণ ঘটনা মনে রাখতে কিংবা স্বাভাবিক কথোপকথন চালিয়ে যেতে সমস্যায় ভোগেন। তবে পাখির আনাগোনা নিয়ে কথা বলার সময় তারা বেশ প্রাণবন্ত হয়ে ওঠেন।

সমাজভিত্তিক সংস্থা ‘এইজ ইউকে’-এর বিশেষজ্ঞ জেনি বুডিঙ্গার জানান, পাখি দেখার সময় রোগীরা নিজেদের স্মৃতি বা আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি নিয়ে একদমই চিন্তিত থাকেন না। বরং মুহূর্তে তারা বেশ মানসিক প্রশান্তি পান।

যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সেবাশ্রমে প্রবীণ এবং ডিমেনশিয়া রোগীদের সময় কাটানোর জন্য পাখি পর্যবেক্ষণ একটি মূল্যবান উপায় হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছে। জানালা দিয়ে পাখি দেখাও বয়স্ক ব্যক্তিদের সংযোগ বৃদ্ধি, ইতিবাচক আবেগ তৈরি এবং স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।

Advertisements

টরন্টোর বেক্রেস্ট একাডেমি ফর রিসার্চ অ্যান্ড এডুকেশনের স্নায়ুবিজ্ঞানী এরিক উইংয়ের নেতৃত্বে পরিচালিত এক গবেষণায় অভিজ্ঞ ও শিক্ষানবিশ পাখি পর্যবেক্ষকদের মস্তিষ্কের এমআরআই স্ক্যান বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা গেছে, অভিজ্ঞদের মস্তিষ্কের মনোযোগ, দৃষ্টিসংক্রান্ত অনুভূতি ও শনাক্তকরণ সংক্রান্ত অংশগুলোর গঠন ও কার্যকারিতা অন্যদের তুলনায় আলাদা এবং বেশি সক্রিয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্কের অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত সুসংগঠন কমে গেলেও অভিজ্ঞদের ক্ষেত্রে তা অনেক বেশি সুরক্ষিত ও সুসংগঠিত থাকে।

গবেষকদের মতে, শুধু অভিজ্ঞতাই নয়, পাখির প্রতি প্রবল আগ্রহ ও উৎসাহ থাকলেও মানসিক প্রশান্তি ও সজীবতা লাভ করা সম্ভব। জার্মানির ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটি অব আইখস্ট্যাট-ইনগোলস্ট্যাটের অধ্যাপক এলিজাবেথ কালস সেবাশ্রমের বয়স্ক বাসিন্দাদের ওপর গবেষণা চালিয়ে দেখেছেন, পাখি পর্যবেক্ষণের সুবিধার পর মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই রোগীদের মানসিক সতর্কতা, স্মৃতিশক্তি এবং কথোপকথনের ক্ষমতায় লক্ষণীয় উন্নতি ঘটে। এই গবেষণার কার্যকারিতা দেখে জার্মানির স্বাস্থ্যবিমা কোম্পানিগুলো ৪০০টিরও বেশি সেবাশ্রমে পাখি দেখার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে অর্থায়ন করেছে।

একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রে ‘বার্ড টেলস’ প্রোগ্রামের মাধ্যমে ডিমেনশিয়া রোগী এবং স্ট্রোকের পর বাকশক্তি হারানো (অ্যাফেসিয়া) রোগীদের চিকিৎসায় পাখি পর্যবেক্ষণের কৌশল ব্যবহার করে ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া গেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কেবল পাখির বিষয় নয়; এটি প্রকৃতি, মনোযোগ, আবেগ ও সামাজিক যোগাযোগের এক সহজ মেলবন্ধন। জীবনসন্ধ্যায় কৌতূহল ও নতুনত্বের অনুভূতির চর্চা মস্তিষ্কে ডোপামিন ও নরএপিনেফ্রিনের নিঃসরণ বাড়ায়, যা মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করে।

সূত্র: বিবিসি

Advertisements