২২ অক্টোবর, ২০২৬ | বৃহস্পতিবারবাংলা: ৬ কার্তিক ১৪৩৩
জীবনযাপন

প্রতিদিন ডিম খেলে শরীরে কী হয়, কতটি খাওয়া নিরাপদ?

IMG_6490

সকালের নাস্তায় ডিম অনেকেরই পছন্দের খাবার। সহজে তৈরি করা যায়, প্রোটিনে সমৃদ্ধ এবং শরীরের প্রয়োজনীয় নানা পুষ্টি উপাদানও পাওয়া যায় ডিম থেকে। তবে কোলেস্টেরল ও হৃদরোগের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ থাকায় প্রতিদিন ডিম খাওয়া কতটা নিরাপদ, তা নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন রয়েছে। কেউ কুসুম বাদ দিয়ে শুধু সাদা অংশ খান, আবার কেউ বেশি প্রোটিনের আশায় একাধিক ডিম খান। পুষ্টিবিদদের মতে, বেশিরভাগ সুস্থ মানুষের জন্য প্রতিদিন ডিম খাওয়া নিরাপদ হতে পারে। তবে তা নির্ভর করে ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা, সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস এবং রান্নার পদ্ধতির ওপর।

ডিম কেন পুষ্টিকর?

ডিম উন্নতমানের প্রোটিনের পাশাপাশি শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করে। এতে রয়েছে ভিটামিন বি১২, সেলেনিয়াম ও কোলিন। ডিমের কুসুমে থাকা লুটেইন ও জিয়াজ্যান্থিন চোখের স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী।

তবে শুধু ডিম খেলেই স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস নিশ্চিত হয় না। বরং প্রতিদিনের খাবারে শাকসবজি, ফল, পূর্ণ শস্য এবং অন্যান্য পুষ্টিকর খাবারের ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের খাদ্যসংক্রান্ত নির্দেশিকাতেও কোনো একটি খাবারের পরিবর্তে সামগ্রিক হৃদ্‌স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

২০২৫ সালে প্রকাশিত ডিম খাওয়াসংক্রান্ত গবেষণার একটি পর্যালোচনায় ১৪টি মেটা-অ্যানালাইসিসের ফলাফল বিশ্লেষণ করা হয়। এতে ডিম খাওয়ার সঙ্গে বিভিন্ন স্বাস্থ্যগত ফলাফলের সম্পর্ক নিয়ে প্রমাণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অসংগতি দেখা যায়। ফলে ডিম খাওয়ার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

দিনে কয়টি ডিম খাওয়া নিরাপদ?

Advertisements

সবার জন্য প্রতিদিন ডিম খাওয়ার নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন। একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি দিনে একটি গোটা ডিম দিয়ে শুরু করতে পারেন। তবে শারীরিক পরিশ্রম, প্রোটিনের চাহিদা, বয়স এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যগত বিষয় বিবেচনায় ব্যক্তিভেদে প্রয়োজন আলাদা হতে পারে।

২০২২ সালে প্রকাশিত একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনা ও মেটা-অ্যানালাইসিসে প্রায় ১ কোটি ১৯ লাখ অংশগ্রহণকারীকে নিয়ে করা ২৪টি গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছিল। এতে প্রতিদিন ডিম খাওয়ার সঙ্গে যেকোনো কারণে মৃত্যুর ঝুঁকি সামান্য বৃদ্ধির সম্পর্ক কিছু উপগোষ্ঠীর মধ্যে দেখা যায়। তবে এ ধরনের পর্যবেক্ষণমূলক সম্পর্ক থেকে ডিম খাওয়াই ঝুঁকি বৃদ্ধির কারণ, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।

ডিম খাওয়ার পরিমাণ ও স্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাব নিয়ে গবেষণার ফলাফল এখনো পুরোপুরি একমত নয়। তাই নিজের শারীরিক অবস্থা ও সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস বিবেচনা করেই ডিম খাওয়ার পরিমাণ নির্ধারণ করা উচিত।

ডিম খেলে কি কোলেস্টেরল বাড়ে?

ডিমের কুসুমে ডায়েটারি কোলেস্টেরল থাকে। তবে খাবারের মাধ্যমে গ্রহণ করা কোলেস্টেরল এবং রক্তে থাকা কোলেস্টেরল এক বিষয় নয়। ডিম খাওয়ার ফলে রক্তের কোলেস্টেরলের মাত্রায় কী ধরনের পরিবর্তন হবে, তা ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে।

এ ক্ষেত্রে স্যাচুরেটেড ফ্যাট গ্রহণের পরিমাণ, জিনগত বৈশিষ্ট্য, আগে থেকে থাকা কোলেস্টেরলের মাত্রা এবং সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি পর্যালোচনায় কিছু বিশ্লেষণে ডিম খাওয়ার সঙ্গে রক্তে ক্ষতিকর এলডিএল কোলেস্টেরলের মাত্রা বৃদ্ধির সম্ভাব্য সম্পর্ক পাওয়া যায়। তবে সামগ্রিক প্রমাণকে দুর্বল হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছিল। অর্থাৎ, প্রতিদিন ডিম খেলেই সবার কোলেস্টেরল বেড়ে যাবে, এমনটি বলা যায় না।

যাদের রক্তে এলডিএল কোলেস্টেরল বেশি, বংশগত হাইপারকোলেস্টেরোলেমিয়া রয়েছে অথবা আগে থেকেই হৃদরোগ আছে, তাদের ডিম খাওয়ার পরিমাণ নির্ধারণে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

শুধু সাদা অংশ, নাকি কুসুমসহ পুরো ডিম?

ডিমের সাদা অংশ প্রোটিনের ভালো উৎস। এতে চর্বি ও ডায়েটারি কোলেস্টেরল থাকে না বললেই চলে। অন্যদিকে, পুরো ডিম থেকে প্রোটিনের পাশাপাশি কুসুমে থাকা কোলিন, ভিটামিন বি১২ এবং অন্যান্য ভিটামিন ও খনিজ উপাদান পাওয়া যায়।

যারা বেশি প্রোটিন পেতে চান, কিন্তু কোলেস্টেরল গ্রহণ কমাতে চান, তারা একটি গোটা ডিমের সঙ্গে অতিরিক্ত সাদা অংশ খেতে পারেন। তবে পুরো ডিম খাবেন, নাকি শুধু সাদা অংশ—তা ব্যক্তির স্বাস্থ্যগত অবস্থা ও খাদ্যাভ্যাসের ওপর নির্ভর করে।

ডিম রান্নার পদ্ধতিও গুরুত্বপূর্ণ

ডিমের পুষ্টিগুণের পাশাপাশি রান্নায় ব্যবহৃত উপকরণও খাবারটির সামগ্রিক স্বাস্থ্যগত প্রভাবকে প্রভাবিত করে। অতিরিক্ত মাখন, তেল, পনির কিংবা প্রক্রিয়াজাত মাংস দিয়ে ডিম রান্না করলে খাবারে স্যাচুরেটেড ফ্যাট ও ক্যালরির পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে।

সেদ্ধ বা পোচ করা ডিমে বাড়তি তেল বা মাখন যোগ করার প্রয়োজন হয় না। তবে পরিমিত তেল ব্যবহার করে ভাজা কিংবা স্ক্র্যাম্বলড ডিমও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হতে পারে।

ডিমের সঙ্গে শাকসবজি, পূর্ণ শস্যের রুটি বা আঁশসমৃদ্ধ অন্যান্য খাবার খেলে খাবারের পুষ্টিগুণ বাড়ে। হৃদ্‌স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে অতিরিক্ত মাখন, পনির ও প্রক্রিয়াজাত মাংস খাওয়ার পরিমাণ সীমিত রাখা ভালো।

কারা ডিম খাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকবেন?

যাদের রক্তে এলডিএল কোলেস্টেরল বেশি কিংবা হৃদরোগের ঝুঁকি রয়েছে, তাদের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যগত অবস্থা অনুযায়ী ডিম খাওয়ার পরিমাণ নির্ধারণ করা প্রয়োজন। ডায়াবেটিস বা হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদেরও শুধু ডিমের ওপর গুরুত্ব না দিয়ে পুরো খাদ্যাভ্যাসের দিকে নজর দেওয়া উচিত।

এ ছাড়া যাদের ডিমে অ্যালার্জি রয়েছে, তাদের ডিম এড়িয়ে চলতে হবে।

সব মিলিয়ে, বেশিরভাগ সুস্থ মানুষের জন্য প্রতিদিন পরিমিত পরিমাণে ডিম খাওয়া সুষম খাদ্যাভ্যাসের অংশ হতে পারে। তবে কতটি ডিম খাওয়া উচিত, তার উত্তর সবার জন্য এক নয়। ডিমের পরিমাণের পাশাপাশি রান্নার পদ্ধতি, অন্যান্য খাবারের পুষ্টিমান এবং ব্যক্তির স্বাস্থ্যগত অবস্থাকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।

Advertisements