মাটির নিচে লুকিয়ে আছে অজানা জগৎ, ছুটির দিনে দেখতে পারেন যে ১০ সাই-ফাই সিনেমা

মাটির নিচে যদি গড়ে ওঠে আস্ত একটি শহর, পৃথিবীর গভীরে যদি টিকে থাকে প্রাচীন কোনো সভ্যতা কিংবা অন্ধকার গুহায় যদি লুকিয়ে থাকে ভয়ংকর প্রাণী—তাহলে কেমন হবে সেই জগৎ? বাস্তবতার সীমা ছাড়িয়ে এমনই নানা কল্পনার গল্প নিয়ে তৈরি হয়েছে হলিউডের বেশ কিছু সায়েন্স ফিকশন সিনেমা। রহস্য, রোমাঞ্চ, ভয় আর বেঁচে থাকার লড়াইয়ে ভরপুর এসব সিনেমা দর্শকদের নিয়ে যায় পৃথিবীর অজানা এক জগতে।
অ্যাপল টিভির সায়েন্স ফিকশন সিরিজ ‘সাইলো’ মাটির নিচে মানুষের জীবনযাপনের গল্প তুলে ধরে দর্শকদের মধ্যে নতুন করে আগ্রহ তৈরি করেছে। সিরিজটিতে বৈশ্বিক বিপর্যয়ের পর জর্জিয়ায় নির্মিত ৫০টি বিশাল ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারে মানবজাতির টিকে থাকার কাহিনি দেখানো হয়েছে। প্রতিটি বাঙ্কারে বাস করে প্রায় ১০ হাজার মানুষ। বাইরের পৃথিবী সম্পর্কে সীমিত জ্ঞান, কঠোর নিয়মকানুন এবং অজানা বিপদের মধ্যে তাদের জীবন এগিয়ে চলে।
এমন গল্পের ভক্তদের জন্য হলিউডে রয়েছে আরও অনেক সিনেমা। কিছু ছবিতে পৃথিবীর কেন্দ্রের কাল্পনিক অভিযান, কিছুতে ভূগর্ভস্থ শহরে আটকে পড়া মানুষের সংগ্রাম, আবার কিছুতে অন্ধকার গুহায় ভয়ংকর প্রাণীর মুখোমুখি হওয়ার কাহিনি উঠে এসেছে। বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও কল্পনার জগতে এসব সিনেমা দর্শকদের রোমাঞ্চিত করে। ছুটির অবসরে দেখতে পারেন মাটির নিচের জগৎ নিয়ে তৈরি এমন ১০টি সায়েন্স ফিকশন ও অ্যাডভেঞ্চার সিনেমা।
১. জার্নি টু দ্য সেন্টার অব দ্য আর্থ (১৯৫৯)
পরিচালক: হেনরি লেভিন
ফরাসি লেখক জুল ভার্নের বিখ্যাত উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত এই সিনেমায় এক ভূতাত্ত্বিক আইসল্যান্ডের একটি আগ্নেয়গিরির পথ ধরে পৃথিবীর কেন্দ্রের দিকে যাত্রা করেন। তাঁর সঙ্গে যোগ দেন সহকারী, এক বিধবা নারী ও একজন স্থানীয় পথপ্রদর্শক। ভূগর্ভে গিয়ে তাঁরা আবিষ্কার করেন হারিয়ে যাওয়া শহর, বিশাল জলরাশি এবং স্ফটিকে ভরা রহস্যময় গুহা। তবে অজানা বিপদের পাশাপাশি প্রতিদ্বন্দ্বী বিজ্ঞানীর বাধাও তাঁদের অভিযাত্রাকে কঠিন করে তোলে। রহস্য ও অ্যাডভেঞ্চারের মিশেলে তৈরি সিনেমাটি ভূগর্ভের এক কল্পিত জগৎ তুলে ধরে।
২. হিডেন (২০১৫)
পরিচালক: ম্যাট ডাফার ও রস ডাফার
‘স্ট্রেঞ্জার থিংস’ সিরিজের নির্মাতা ডাফার ব্রাদার্সের এই সিনেমায় ভয়াবহ এক বিপর্যয়ের পর বেঁচে থাকার চেষ্টা করে একটি পরিবার। মাটির নিচের বাঙ্কারে আশ্রয় নিয়ে তারা বাইরের বিপজ্জনক পরিবেশ থেকে নিজেদের রক্ষা করতে চায়। কারণ, বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছে ভয়ংকর কিছু হিউম্যানয়েড প্রাণী, যারা পরিবারটিকে খুঁজছে। কিন্তু বাঙ্কারে লুকিয়ে থাকা মানুষগুলোর প্রকৃত পরিচয় এবং বাইরের প্রাণীদের রহস্য ধীরে ধীরে নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয়। টানটান উত্তেজনা ও অপ্রত্যাশিত মোড়ে ভরপুর এই সিনেমা রহস্যপ্রেমীদের ভালো লাগতে পারে।
৩. সিটি অব এমবার (২০০৮)
পরিচালক: গিল কেনান
পৃথিবী যখন ধ্বংসের মুখে, তখন মানবজাতিকে বাঁচাতে মাটির নিচে গড়ে তোলা হয় এমবার নামের একটি শহর। পরিকল্পনা ছিল, ২০০ বছর পর বাসিন্দারা আবার পৃথিবীর ওপরে ফিরে যাবে। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও শহরের বাসিন্দারা সেই সত্য জানতে পারে না। এর মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা বিকল হতে শুরু করে, দেখা দেয় খাবারের সংকট। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে দুই কিশোর-কিশোরী, লিনা ও ডুন, শহর থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজতে থাকে। অন্ধকারের মধ্যে তাদের এই অভিযানই সিনেমাটির মূল আকর্ষণ। ভূগর্ভস্থ শহর, গোপন সত্য ও মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষার কারণে ‘সাইলো’ ভক্তদের কাছেও ছবিটি আকর্ষণীয় হতে পারে।
৪. ফার্স্ট মেন ইন দ্য মুন (১৯৬৪)
পরিচালক: নাথান জুরান
এইচ জি ওয়েলসের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত সিনেমাটি চাঁদে মানুষের অবতরণের পাঁচ বছর আগেই মুক্তি পেয়েছিল। গল্পে, ১৯৬৯ সালে চাঁদে যাওয়া একটি আন্তর্জাতিক দল আবিষ্কার করে, প্রায় ৬০ বছর আগে ব্রিটিশ অভিযাত্রীরা সেখানে গোপন অভিযান চালিয়েছিলেন। অতীতের সেই অভিযানের গল্পে দেখা যায়, ১৮৯৯ সালে চাঁদের পৃষ্ঠের নিচে প্রবেশ করে তাঁরা সন্ধান পেয়েছিলেন সিলিনাইট নামের এক অদ্ভুত প্রাণীসভ্যতার। চাঁদের ভূগর্ভে সেই সভ্যতার অস্তিত্ব, মানুষের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক এবং তাদের পরিণতি নিয়ে এগিয়ে চলে সিনেমার কাহিনি। বৈজ্ঞানিক কল্পনা ও ক্লাসিক অ্যাডভেঞ্চারের মিশেলে এটি ভিন্ন স্বাদের একটি ছবি।
৫. অ্যাট দ্য আর্থস কোর (১৯৭৬)
পরিচালক: কেভিন কনর
এডগার রাইস বারোজের গল্প অবলম্বনে তৈরি এই সিনেমায় এক ভিক্টোরিয়ান বিজ্ঞানী নির্মাণ করেন বিশাল এক ড্রিলিং যন্ত্র। সেই যানে চড়ে তিনি ও তাঁর এক আমেরিকান সঙ্গী পৃথিবীর গভীরে অভিযানে বের হন। সেখানে গিয়ে তাঁরা আবিষ্কার করেন এক কাল্পনিক ফাঁপা পৃথিবী, যেখানে এখনো টিকে আছে প্রাগৈতিহাসিক প্রাণী ও সভ্যতা। কিন্তু এই অদ্ভুত জগতে তাঁদের সামনে অপেক্ষা করছে ভয়ংকর সব বিপদ। ডানাওয়ালা দানব ও বিপন্ন মানুষের উপস্থিতি অভিযাত্রাকে আরও রোমাঞ্চকর করে তোলে। কল্পবিজ্ঞানের পুরোনো দিনের বিশেষ আবহ ও দুঃসাহসিক অভিযানের গল্প যাঁদের পছন্দ, তাঁদের জন্য সিনেমাটি হতে পারে ভালো পছন্দ।
৬. দ্য ডিসেন্ট (২০০৫)
পরিচালক: নিল মার্শাল
ভূগর্ভস্থ জগতের ভয়াবহতা নিয়ে নির্মিত অন্যতম আলোচিত হরর সিনেমা ‘দ্য ডিসেন্ট’। এতে ছয় নারী অভিযাত্রী একটি অচেনা গুহায় প্রবেশ করেন। কিন্তু ভেতরে গিয়ে তাঁরা পথ হারিয়ে ফেলেন এবং বুঝতে পারেন, সেখানে তাঁরা একা নন। অন্ধকার গুহায় বাস করে একদল ভয়ংকর, মাংসাশী প্রাণী, যারা তাঁদের শিকার করতে শুরু করে। সরু পথ, চারপাশের অন্ধকার এবং বের হওয়ার অনিশ্চয়তা পরিস্থিতিকে ক্রমেই আতঙ্কজনক করে তোলে। বদ্ধ জায়গার ভয়, টিকে থাকার লড়াই এবং হাড়হিম করা উত্তেজনা—সব মিলিয়ে সিনেমাটি ভূগর্ভের অন্ধকার জগতের এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা দেয়।
৭. জার্নি টু দ্য সেন্টার অব দ্য আর্থ (২০০৮)
পরিচালক: এরিক ব্রেভিগ
১৯৫৯ সালের ক্লাসিক সিনেমার গল্প থেকে আলাদা এই আধুনিক অ্যাডভেঞ্চার ছবিতে অভিনয় করেছেন ব্রেন্ডন ফ্রেজার। এক বিজ্ঞানী তাঁর ভাইপো ও একজন পর্বতারোহী গাইডকে নিয়ে নিখোঁজ ভাইয়ের সন্ধানে আইসল্যান্ডের একটি আগ্নেয়গিরির ভেতর যাত্রা করেন। পৃথিবীর গভীরে গিয়ে তাঁরা এমন এক জগৎ আবিষ্কার করেন, যেখানে ডাইনোসর ঘুরে বেড়ায়, বিশাল প্রাণী বাস করে এবং উজ্জ্বল লাভার প্রবাহ দেখা যায়। উন্নত ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস ও থ্রিডি প্রযুক্তির ব্যবহার সিনেমাটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। বিপজ্জনক এই জগৎ থেকে নিরাপদে ফিরে আসার চেষ্টা নিয়েই এগিয়ে চলে গল্প।
৮. দ্য কোর (২০০৩)
পরিচালক: জন অ্যামিয়েল
পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ কেন্দ্র বা কোরের ঘূর্ণন বন্ধ হয়ে গেলে কী ঘটতে পারে—এমন এক কাল্পনিক পরিস্থিতি নিয়ে তৈরি হয়েছে ‘দ্য কোর’। এতে পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রে বিপর্যয় দেখা দেয়, যা মানবসভ্যতার জন্য ভয়াবহ হুমকি হয়ে ওঠে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় একদল বিজ্ঞানী বিশেষ প্রযুক্তির একটি যান নিয়ে পৃথিবীর কেন্দ্রের দিকে যাত্রা করেন। তাঁদের পরিকল্পনা, পারমাণবিক বিস্ফোরণের মাধ্যমে কোরের ঘূর্ণন আবার চালু করা। অসহনীয় তাপ, প্রচণ্ড চাপ ও নানা বিপদের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলে তাঁদের অভিযান। বৈজ্ঞানিক বাস্তবতার সঙ্গে সিনেমার কল্পনার পার্থক্য থাকলেও বিপর্যয় ঠেকাতে মানুষের মরিয়া প্রচেষ্টার গল্পটি দর্শকদের ধরে রাখে।
৯. ১০ ক্লোভারফিল্ড লেন (২০১৬)
পরিচালক: ড্যান ট্র্যাকটেনবার্গ
একটি গাড়ি দুর্ঘটনার পর জ্ঞান ফিরে মিশেল নিজেকে আবিষ্কার করে মাটির নিচের একটি বাঙ্কারে। সেখানে হাওয়ার্ড ও এমেট নামের দুই ব্যক্তি তাকে জানায়, বাইরের পৃথিবীতে ভয়াবহ আক্রমণ হয়েছে এবং বাতাস দূষিত হয়ে পড়েছে। তাই তাকে বাঁচানোর জন্য বাঙ্কারে রাখা হয়েছে। কিন্তু হাওয়ার্ডের কথায় পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারে না মিশেল। সে বুঝতে পারে, বাঙ্কারের ভেতরেও এমন কিছু রহস্য রয়েছে, যা তার নিরাপত্তাকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে। বাইরে সত্যিই কি এলিয়েনদের আক্রমণ হয়েছে, নাকি সবকিছুর পেছনে অন্য কোনো ঘটনা রয়েছে? রহস্য, মনস্তাত্ত্বিক উত্তেজনা ও বন্দিদশার অভিজ্ঞতা সিনেমাটিকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে।
১০. দ্য মোল পিপল (১৯৫৬)
পরিচালক: ভার্জিল ডব্লিউ ভোগেল
১৯৫০-এর দশকের এই সাদাকালো সিনেমায় একদল বিজ্ঞানী ও প্রত্নতাত্ত্বিক পৃথিবীর গভীরে আবিষ্কার করেন এক রহস্যময় ভূগর্ভস্থ সভ্যতা। সেখানে সুমেরীয় বংশোদ্ভূত একদল মানুষ বাস করে এবং মোল নামে পরিচিত অদ্ভুত প্রাণীদের শ্রমিক হিসেবে ব্যবহার করে। অন্ধকার জগতের বাসিন্দাদের জীবনযাপন, তাদের সামাজিক কাঠামো এবং বাইরের মানুষের সঙ্গে সংঘাতের মধ্য দিয়ে গল্প এগিয়ে চলে। ভূগর্ভে কীভাবে একটি সভ্যতা টিকে থাকতে পারে, সেই কল্পনাকে কেন্দ্র করে তৈরি সিনেমাটিতে রয়েছে রহস্য ও অ্যাডভেঞ্চারের উপাদান। পুরোনো দিনের সায়েন্স ফিকশন ও মনস্টার সিনেমার প্রতি আগ্রহ থাকলে ছবিটি দেখতে পারেন।
মাটির নিচের অজানা শহর থেকে পৃথিবীর কেন্দ্রের কাল্পনিক অভিযান—এই ১০ সিনেমায় রয়েছে রহস্য, রোমাঞ্চ, ভয় ও বেঁচে থাকার নানা গল্প। ছুটির দিনে পছন্দের কোনো একটি সিনেমা বেছে নিয়ে ডুব দিতে পারেন পৃথিবীর পৃষ্ঠের নিচে কল্পনার সেই অদ্ভুত জগতে।



