স্বপ্নের নারীর জন্য সব সম্পত্তি বিক্রি, দেখা করতে গিয়ে জানলেন তিনি এআই

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়, এরপর প্রেমের স্বপ্ন। একপর্যায়ে সেই নারীকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পাওয়ার আশায় নিজের সব সম্পত্তি বিক্রি করে প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দেন ব্রাজিলের ৪৯ বছর বয়সী এদিমার মার্টিনস। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছে জানতে পারেন, যে নারীর সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন, বাস্তবে তার কোনো অস্তিত্বই নেই। তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি একটি কাল্পনিক চরিত্র।
ব্রাজিলের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মারানহাওয়ের বাসিন্দা মার্টিনস পেশায় একজন রাজমিস্ত্রি। কয়েক বছর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জেসিকা অলিভেইরা নামের এক নারীর অ্যাকাউন্টের সঙ্গে পরিচিত হন তিনি। অ্যাকাউন্টটিতে বিপুলসংখ্যক অনুসারী ছিল। সেখানে প্রকাশিত ভিডিওতে এক নারীকে খামারে শান্ত ও মনোরম পরিবেশে বসবাস করতে দেখা যেত। ভিডিওতে ওই নারী পুরুষদের তার সঙ্গে থাকার আমন্ত্রণ জানাতেন এবং থাকার জায়গা ও আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিতেন।

মার্টিনসের জীবনে তখন একাকীত্ব ছিল বড় বাস্তবতা। মায়ের মৃত্যুর পর তিনি মানসিকভাবে নিঃসঙ্গ বোধ করছিলেন। এমন পরিস্থিতিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা ওই নারীকে ঘিরে নতুন করে জীবন শুরু করার স্বপ্ন দেখতে থাকেন তিনি। তার বিশ্বাস জন্মেছিল, ওই নারী হয়তো তাকে সঙ্গ দেবেন এবং জীবনে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করবেন।
অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে ওই কাল্পনিক চরিত্রটি আর্থিক সহায়তা ও নিজের খামারে থাকার জায়গা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বলে মার্টিনস জানিয়েছেন। এসব বিষয়কে সত্যি ভেবেই তিনি ওই নারীর সঙ্গে সরাসরি দেখা করার সিদ্ধান্ত নেন।
নিজের স্বপ্ন পূরণের আশায় গত ৯ অক্টোবর মার্টিনস তার সব জিনিসপত্র বিক্রি করে পাওয়া অর্থ নিয়ে যাত্রা শুরু করেন। নিউইয়র্ক পোস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি ব্রাজিলের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মিনাস জেরাইসের রাজধানী বেলো হোরিজন্তের উদ্দেশে রওনা হন। বাসে এক দিনেরও বেশি সময় ভ্রমণের পর ১১ অক্টোবর সেখানে পৌঁছান তিনি। নিজের সম্পত্তি বিক্রি করে পাওয়া অর্থ দিয়ে এত দূর যাওয়ার পেছনে তার উদ্দেশ্য ছিল ওই নারীর সঙ্গে দেখা করা এবং একসঙ্গে নতুন জীবন শুরু করা।
কিন্তু শহরে পৌঁছানোর পর তার সেই স্বপ্ন ভেঙে যায়। সঙ্গে থাকা নারীর ছবিগুলো দেখিয়ে স্থানীয় লোকজনের কাছে তার পরিচয় জানতে চান মার্টিনস। কিন্তু কেউই ওই নারীকে চিনতে পারেননি। এরপর তিনি একটি স্থানীয় রেডিও স্টেশনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সেখান থেকে তাকে জানানো হয়, জেসিকা অলিভেইরা নামে যে নারীর সঙ্গে দেখা করার জন্য তিনি এত দূর এসেছেন, বাস্তবে তার কোনো অস্তিত্ব নেই। পুরো চরিত্রটিই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি।
ঘটনাটি বুঝতে পেরে মার্টিনস গভীর হতাশায় পড়েন। যে মানুষটিকে তিনি নিজের ভবিষ্যৎ জীবনসঙ্গী হিসেবে কল্পনা করেছিলেন, তিনি বাস্তবের কেউ নন—এ সত্য মেনে নেওয়া তার জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
স্থানীয় সম্প্রচারমাধ্যম টিভি মিরান্তেকে দেওয়া বক্তব্যে মার্টিনস বলেন, এ ঘটনা তার জীবনে দুঃখ, হতাশা ও বিষণ্নতা নিয়ে এসেছে। তিনি জানান, অনেকেই হয়তো একটি সম্পর্কের খোঁজে ছিলেন, আর তিনিও সেই আশাতেই ওই নারীর কাছে গিয়েছিলেন।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওই অ্যাকাউন্টের পেছনে থাকা ব্যক্তি পরে স্বীকার করেন, নারী চরিত্রটি এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছিল। তবে মার্টিনসের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেন।
নিজের সব সম্পত্তি বিক্রি করে অপরিচিত একটি শহরে পৌঁছানোর পর মার্টিনস আর্থিক ও বাস্তবিক সংকটে পড়ে যান। ফিরে যাওয়ার মতো পর্যাপ্ত সামর্থ্য না থাকায় শেষ পর্যন্ত তিনি পৌর কর্তৃপক্ষের সাহায্য চান। পরে সমাজকর্মীরা তার পাশে দাঁড়ান। তারা তাকে খাবার, গোসলের ব্যবস্থা এবং শহর ছেড়ে যাওয়ার জন্য বাসের টিকিট দিয়ে সহায়তা করেন।
এত বড় হতাশার পরও জীবনসঙ্গী খোঁজার আশা পুরোপুরি হারাননি মার্টিনস। বর্তমানে তিনি এক আত্মীয়ের বাড়িতে অবস্থান করছেন। ভবিষ্যতে আবারও বেলো হোরিজন্তে যাওয়ার ইচ্ছা রয়েছে তার। এবার সেখানে বাস্তবের কোনো মানুষের সঙ্গে পরিচিত হয়ে স্থায়ী সম্পর্ক গড়ে তোলার আশা করছেন তিনি।
মার্টিনস বলেন, তিনি যে নারীকে খুঁজতে গিয়েছিলেন, তাকে পাননি। তবে অন্য কাউকে খুঁজে পাওয়ার আশা এখনো রয়েছে। সেই আশাতেই তিনি আবারও একই শহরে যাওয়ার কথা ভাবছেন।
ঘটনাটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ছবি ও ভিডিও এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়ের সত্যতা যাচাইয়ের গুরুত্ব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। প্রযুক্তির সাহায্যে তৈরি কাল্পনিক চরিত্র দেখতে বাস্তব মানুষের মতো হলেও সেগুলোর পেছনে থাকা পরিচয় ও প্রতিশ্রুতি সত্য নাও হতে পারে। তাই অনলাইনে পরিচিত কারও সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলা কিংবা তার প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করার আগে সতর্ক থাকা জরুরি।



