১৮ অক্টোবর, ২০২৬ | রবিবারবাংলা: ২ কার্তিক ১৪৩৩
জীবনযাপন

‘অফার শেষ আজই’—এমন বার্তা দেখলে তাড়াহুড়ো করে শপিং করেন কেন?

images (19)

দোকানে কেনাকাটা করতে গিয়ে হঠাৎ চোখে পড়ল, পছন্দের একটি পণ্যে ৫০ শতাংশ ছাড় চলছে। কেনার পরিকল্পনা না থাকলেও মনে হলো, এত কম দামে পণ্যটি পাওয়া যাচ্ছে, সুযোগ হাতছাড়া করা ঠিক হবে না। আবার অনলাইন শপিংয়ে দেখা গেল, অফারটি শেষ হতে আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা বাকি। তখন দ্রুত অর্ডার করার তাগিদ আরও বেড়ে গেল।

কিন্তু কেনাকাটা শেষে অনেক সময় মনে প্রশ্ন জাগে, জিনিসটি কি সত্যিই প্রয়োজন ছিল, নাকি শুধু ছাড়ের আকর্ষণেই কেনা? এমন অভিজ্ঞতা অনেকেরই রয়েছে। প্রয়োজন না থাকলেও মূল্যছাড়ের ঘোষণা আমাদের কেনাকাটার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। এর পেছনে কাজ করে মানুষের মনস্তত্ত্ব, অর্থ খরচের অনুভূতি এবং বিক্রেতাদের বিভিন্ন বিপণন কৌশল।

সংগৃহীত

আচরণগত অর্থনীতির বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, মূল্যছাড় ও প্রচারণা মানুষের তাৎক্ষণিক কেনাকাটার প্রবণতা বাড়াতে পারে। তবে এর প্রভাব সবার ক্ষেত্রে সমান নয়। ব্যক্তির অভ্যাস, আর্থিক অবস্থা, মানসিক পরিস্থিতি এবং পণ্যের ধরনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে।

ছাড় মানেই কি সাশ্রয়?

ধরা যাক, একটি শার্টের মূল দাম দুই হাজার টাকা। ছাড় দিয়ে সেটি বিক্রি হচ্ছে এক হাজার টাকায়। শার্টটি কেনার পরিকল্পনা আগে না থাকলেও অর্ধেক দামে পাওয়ার কথা শুনে আপনার মনে হতে পারে, এক হাজার টাকা সাশ্রয় হচ্ছে।

কিন্তু বাস্তব হিসাবটি একটু ভিন্ন। শার্টটি না কিনলে কোনো টাকাই খরচ করতে হতো না। অর্থাৎ, প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও সেটি কিনলে এক হাজার টাকা ব্যয় হচ্ছে, সাশ্রয় নয়।

Advertisements

এখানে মানুষের চিন্তার একটি বিশেষ প্রবণতা কাজ করে। অনেক সময় পণ্যটির প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করার আগে আমরা কত টাকা ছাড় পাওয়া যাচ্ছে, সেটির দিকে বেশি মনোযোগ দিই। ফলে কেনাকাটার সিদ্ধান্তটি প্রয়োজনের বদলে সম্ভাব্য সাশ্রয়ের হিসাবের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

মূল্যছাড়ের কারণে কোনো পণ্যের প্রতি আগ্রহ বাড়া অস্বাভাবিক নয়। তবে কম দাম দেখেই পণ্যটিকে লাভজনক মনে করা ঠিক নয়। পণ্যটি প্রয়োজনীয় কি না, মান কেমন এবং কেনার পর সেটি কতটা ব্যবহার করা হবে—এসব বিষয়ও বিবেচনায় রাখা জরুরি।

‘অফার শেষ আজই’—এমন বার্তায় তাড়াহুড়ো বাড়ে কেন?

‘সীমিত সময়ের জন্য ছাড়’, ‘স্টক শেষ হওয়ার আগে কিনুন’ কিংবা ‘আর মাত্র কয়েকটি বাকি’—বিক্রির ক্ষেত্রে এমন বার্তা প্রায়ই দেখা যায়। এসব ঘোষণা ক্রেতার মনে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার চাপ তৈরি করতে পারে।

মনে হতে পারে, এখনই না কিনলে পরে আর এত কম দামে পাওয়া যাবে না। ফলে পণ্যটির প্রয়োজন আছে কি না, দাম সত্যিই কমেছে কি না কিংবা কেনার সামর্থ্য রয়েছে কি না—এসব যাচাই করার আগেই কেউ কেউ অর্ডার করে ফেলেন।

মনোবিজ্ঞানে কোনো সুযোগ বা স্বাধীনতা হারানোর আশঙ্কা থেকে তৈরি হওয়া প্রতিক্রিয়াকে ‘রিঅ্যাকট্যান্স’ বলা হয়। আবার কোনো জিনিস সহজে পাওয়া যাবে না বলে মনে হলে সেটির প্রতি আকর্ষণও বেড়ে যেতে পারে। বিপণন কৌশলে সীমিত সময় বা সীমিত মজুতের বার্তা এসব অনুভূতিকে কাজে লাগাতে পারে।

তবে সব সময়সীমাবদ্ধ অফারই যে কৃত্রিম, তা নয়। কোনো পণ্যের ছাড় সত্যিই নির্দিষ্ট সময়ের জন্য হতে পারে। সমস্যা তৈরি হয় যখন সেই তাড়াহুড়োর কারণে ক্রেতা নিজের প্রয়োজন ও আর্থিক সামর্থ্য যাচাই না করেই সিদ্ধান্ত নেন।

সংগৃহীত

কেনাকাটার আনন্দের সঙ্গে যুক্ত হয় ছাড় পাওয়ার উত্তেজনা

অনেকের কাছে কেনাকাটা শুধু প্রয়োজন মেটানোর বিষয় নয়; এটি আনন্দ পাওয়ার কিংবা মন ভালো করার একটি উপায়ও। পছন্দের পণ্য কেনার আগে যে উত্তেজনা তৈরি হয়, ছাড়ের ঘোষণা সেই অনুভূতিকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

একই সঙ্গে কম দামে কেনার অনুভূতি অনেকের কাছে বাড়তি অর্জনের মতো মনে হয়। ফলে পণ্যটি প্রয়োজনীয় না হলেও মনে হতে পারে, ভালো একটি সুযোগ কাজে লাগানো হয়েছে।

২০১৯ সালে জার্নাল অব দ্য অ্যাসোসিয়েশন ফর কনজিউমার রিসার্চ-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে পণ্য বিনা মূল্যে পাওয়ার সম্ভাবনাযুক্ত প্রচারণা সরাসরি মূল্যছাড়ের চেয়েও বেশি আকর্ষণীয় হতে পারে। গবেষকেরা এর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে টাকা খরচের মানসিক অস্বস্তি কম অনুভূত হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেন।

অর্থাৎ, কিছু বিশেষ ধরনের অফার কেনাকাটার আনন্দ বাড়ানোর পাশাপাশি অর্থ ব্যয়ের অস্বস্তিও কমিয়ে দিতে পারে। তবে গবেষণাটির ফল সব ধরনের ছাড়, পণ্য বা ক্রেতার ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য নয়।

অনলাইন কেনাকাটায় কেন হঠাৎ খরচ বেড়ে যায়?

অনলাইনে কেনাকাটার সময় ক্রেতার সামনে একের পর এক পণ্যের ছবি, মূল্যছাড়ের ব্যানার, কাউন্টডাউন এবং বিশেষ অফারের ঘোষণা আসে। কয়েকটি ক্লিকেই অর্ডার করা সম্ভব হওয়ায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়াও অনেক সময় দ্রুত হয়ে যায়।

দোকানে গিয়ে পণ্য হাতে নিয়ে দেখা কিংবা অন্য দোকানের দামের সঙ্গে তুলনা করার সুযোগ থাকলেও অনলাইনে সব সময় সেই বিরতি নেওয়া হয় না। ফলে কোনো পণ্য ভালো লাগলে বা অফার আকর্ষণীয় মনে হলে তাৎক্ষণিকভাবে কেনার প্রবণতা তৈরি হতে পারে।

২০১৯ সালে প্রকাশিত একটি মেটা-বিশ্লেষণে ২৩১টি নমুনার ৭৫ হাজারের বেশি ক্রেতার তথ্য পর্যালোচনা করা হয়েছিল। এতে হঠাৎ কেনাকাটার সঙ্গে ব্যক্তিগত প্রবণতা, আবেগ, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সময় ও অর্থের মতো সম্পদ এবং বিপণনসংক্রান্ত বিভিন্ন উপাদানের সম্পর্ক পাওয়া যায়।

এ থেকে বোঝা যায়, অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটার পেছনে শুধু বিজ্ঞাপন দায়ী নয়। ব্যক্তির মানসিক অবস্থা, কেনাকাটার অভ্যাস এবং পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ছাড়ের আকর্ষণে অপ্রয়োজনীয় খরচ এড়াবেন যেভাবে

কোনো পণ্যে ছাড় দেখলেই কেনার সিদ্ধান্ত না নিয়ে প্রথমে নিজেকে কয়েকটি প্রশ্ন করুন। পণ্যটি কেনার পরিকল্পনা কি আগে থেকেই ছিল? ছাড় না থাকলেও কি এটি কিনতেন? উত্তর ‘না’ হলে কেনার প্রয়োজনীয়তা আবার ভেবে দেখা উচিত।

দ্বিতীয়ত, পণ্যটির প্রকৃত দাম যাচাই করুন। ছাড়ের আগে দাম কত ছিল এবং অন্য বিক্রেতারা কত দামে বিক্রি করছেন, তা তুলনা করে দেখতে পারেন। এতে প্রকৃত মূল্যছাড় সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সহজ হবে।

তৃতীয়ত, অফারের সময়সীমা দেখে তাড়াহুড়ো করবেন না। পণ্যটি জরুরি প্রয়োজনের না হলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কিছুটা সময় অপেক্ষা করুন। অপেক্ষার পরও যদি মনে হয় পণ্যটি দরকার, তাহলে বাজেট বিবেচনা করে কেনার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

এ ছাড়া মাসিক কেনাকাটার জন্য একটি নির্দিষ্ট বাজেট রাখা উপকারী। পণ্যটির দাম কম হলেও সেটি কিনতে গিয়ে প্রয়োজনীয় খরচের টাকা যেন শেষ না হয়ে যায়, সেদিকে নজর দিন। শুধু ছাড় পাওয়া যাচ্ছে বলে একাধিক পণ্য কিনে মজুত করার অভ্যাসও এড়িয়ে চলা ভালো।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ছাড়ের পরিমাণ নয়, পণ্যটির প্রয়োজনীয়তাকে সিদ্ধান্তের ভিত্তি করা। প্রয়োজনীয় জিনিস কম দামে কেনা অবশ্যই সাশ্রয়ী হতে পারে। কিন্তু অপ্রয়োজনীয় পণ্য শুধু অফারের আকর্ষণে কিনলে শেষ পর্যন্ত ব্যয়ই বাড়ে।

তাই পরেরবার কোনো পণ্যে বড় ছাড় দেখে কেনার ইচ্ছা হলে একটু থামুন। নিজেকে প্রশ্ন করুন, পণ্যটি কি সত্যিই প্রয়োজন, নাকি কম দামে পাওয়ার আনন্দই আপনাকে আকৃষ্ট করছে? এই ছোট্ট বিরতিই অপ্রয়োজনীয় খরচ কমাতে এবং অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে সাহায্য করতে পারে।

Advertisements