কথায় কথায় জেদ, আবদার না মানলেই কান্না—কী করবেন অভিভাবকেরা?

দোকানে গিয়ে পছন্দের খেলনা কিনে না দিলেই কান্না, একটু বারণ করলেই চিৎকার, আবার কখনো রাগ করে মেঝেতে শুয়ে পড়া—ছোট শিশুদের এমন আচরণের মুখোমুখি হতে হয় অনেক অভিভাবককে। পরিস্থিতি সামাল দিতে কেউ বোঝানোর চেষ্টা করেন, কেউ ধমক দেন, আবার কেউ কান্না থামাতে শেষ পর্যন্ত শিশুর আবদার পূরণ করে দেন। কিন্তু কিছুদিন পর একই ঘটনা আবার ঘটলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, শিশুর জেদ কমানোর উপায় কী?

শিশুর এমন আচরণকে সব সময় অবাধ্যতা বা খারাপ অভ্যাস হিসেবে দেখা ঠিক নয়। ছোটদের মস্তিষ্ক ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা তখনো বিকাশের পর্যায়ে থাকে। তারা কী চায়, কী পছন্দ করে কিংবা কোন বিষয়টি তাদের কষ্ট দিচ্ছে, তা বুঝতে পারলেও সেই অনুভূতি যথাযথভাবে প্রকাশ করার দক্ষতা অনেকেরই তৈরি হয় না। ফলে হতাশা, রাগ কিংবা মন খারাপের প্রকাশ ঘটে কান্না, চিৎকার ও জেদের মাধ্যমে।
শিশুর আবেগ নিয়ন্ত্রণের দক্ষতা ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে। পরিবারে বড়দের আচরণ পর্যবেক্ষণ করে, নিয়মিত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে এবং অভিভাবকদের কাছ থেকে শেখার মাধ্যমে তারা নিজের অনুভূতি সামলাতে অভ্যস্ত হয়। তাই শুধু ‘কান্না বন্ধ করো’ কিংবা ‘জেদ করবে না’ বললেই সমস্যার সমাধান হয় না। বরং কেন এমন হচ্ছে, তা বোঝার চেষ্টা করা জরুরি।
কোনো শিশু পছন্দের জিনিস না পেয়ে কাঁদলে তার কাছে বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হতে পারে। বড়রা যে কারণে সহজে নিজেদের সামলে নিতে পারেন, ছোটরা অনেক সময় তা পারে না। রাগের মুহূর্তে তারা চিৎকার করতে পারে, হাত-পা ছুড়তে পারে কিংবা আশপাশের জিনিসপত্র ছুড়ে ফেলতে পারে। এসব আচরণ শিশুর হতাশা প্রকাশের একটি উপায় হতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে তার সব আচরণ মেনে নিতে হবে।

এ ক্ষেত্রে অভিভাবকদের প্রথম কাজ হলো নিজেরা শান্ত থাকা। শিশু চিৎকার করলে পাল্টা চিৎকার করা, ভয় দেখানো কিংবা রাগের মাথায় শাস্তি দেওয়ার চেষ্টা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করতে পারে। বরং স্বাভাবিক কণ্ঠে কথা বলুন এবং শিশুকে নিরাপদ পরিবেশে রাখুন। নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে শিশুও ধীরে ধীরে বুঝতে শিখবে যে বিরক্তি বা হতাশা প্রকাশের আরও ভালো উপায় রয়েছে।
শিশুর অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়াও খুব প্রয়োজন। ধরুন, সে একটি খেলনা কিনে দেওয়ার জন্য জেদ করছে। তখন সরাসরি ধমক না দিয়ে বলা যেতে পারে, ‘খেলনাটা তোমার খুব পছন্দ হয়েছে, তাই না? কিন্তু আজ আমরা এটা কিনব না।’ এতে শিশুর অনুভূতি স্বীকার করা হয়, আবার সিদ্ধান্তের সীমাও পরিষ্কার থাকে।
মনে রাখতে হবে, সন্তানের মন খারাপকে গুরুত্ব দেওয়া আর তার প্রতিটি আবদার পূরণ করা এক বিষয় নয়। শিশু কান্না করলেই যদি অভিভাবকেরা শেষ পর্যন্ত তার দাবি মেনে নেন, তাহলে সে শিখতে পারে যে কান্না বা জেদ করলেই কাঙ্ক্ষিত জিনিস পাওয়া যায়। তাই কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর অযথা বারবার পরিবর্তন না করে শান্তভাবে নিজের অবস্থান ধরে রাখা ভালো।
শিশু যখন খুব বেশি উত্তেজিত থাকে, তখন দীর্ঘ সময় ধরে বোঝানোর চেষ্টা না করাই ভালো। সে সময় যুক্তি দিয়ে কথা বলা বা অনেক প্রশ্ন করা কাজে নাও আসতে পারে। বরং অল্প কথায় তাকে আশ্বস্ত করুন, নিরাপদে রাখুন এবং শান্ত হওয়ার জন্য কিছুটা সময় দিন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে কী ঘটেছিল এবং পরেরবার কীভাবে ভালোভাবে প্রতিক্রিয়া জানানো যায়, তা নিয়ে কথা বলুন।
শুধু রাগের মুহূর্তে নয়, স্বাভাবিক সময়েও শিশুকে আবেগ চেনার শিক্ষা দেওয়া যায়। যেমন, সে মন খারাপ করলে বলতে পারেন, ‘তোমার কি কষ্ট লাগছে?’ অথবা রেগে গেলে জিজ্ঞাসা করতে পারেন, ‘তুমি কি খুব বিরক্ত হয়েছ?’ এভাবে নিজের অনুভূতির নাম জানতে পারলে শিশুর পক্ষে তা প্রকাশ করা সহজ হয়। পাশাপাশি ধীরে শ্বাস নেওয়া, কিছুক্ষণ বিরতি নেওয়া কিংবা প্রয়োজনে বড়দের সাহায্য চাওয়ার মতো সহজ অভ্যাস শেখানো যেতে পারে।
শিশুর জেদ ও অস্থিরতার পেছনে দৈনন্দিন জীবনের কিছু বিষয়ও কাজ করতে পারে। পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া, ক্ষুধা, শারীরিক অস্বস্তি, অতিরিক্ত শব্দ, ক্লান্তি কিংবা পরিচিত রুটিনে পরিবর্তন হলে অনেক শিশু সহজেই বিরক্ত হয়ে পড়ে। তাই প্রতিবার জেদ দেখালে শুধু আচরণটি থামানোর চেষ্টা না করে তার শারীরিক ও মানসিক অবস্থাও খেয়াল করুন।
একই সঙ্গে পরিবারের নিয়মকানুন যতটা সম্ভব ধারাবাহিক রাখা প্রয়োজন। কখন ঘুমাবে, কখন খেলবে কিংবা কোন জিনিস কেনা সম্ভব—এসব বিষয়ে বয়স অনুযায়ী সহজ নিয়ম তৈরি করা যেতে পারে। কোথাও যাওয়ার আগে শিশুকে জানিয়ে দিন কী করা যাবে এবং কী করা যাবে না। এতে অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতিতে হতাশা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা কমতে পারে।

শিশু ভালোভাবে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করলে বা রাগের সময় নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করলে তার প্রশংসা করুন। যেমন, কান্না না করে নিজের চাওয়া বোঝাতে পারলে তাকে বলুন, ‘তুমি খুব সুন্দর করে তোমার কথাটা বলেছ।’ এতে সে বুঝতে পারে, শান্তভাবে কথা বলাও তার প্রয়োজন প্রকাশের কার্যকর উপায়।
অভিভাবকদের নিজেদের মানসিক অবস্থার দিকেও নজর দেওয়া জরুরি। শিশুর কান্না ও জেদ দীর্ঘ সময় ধরে সামলাতে গিয়ে ক্লান্তি বা বিরক্তি তৈরি হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে সম্ভব হলে পরিবারের অন্য কারও সাহায্য নিন, কিছুটা বিশ্রাম নিন এবং নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করুন। কারণ, শিশুর সামনে বড়দের আচরণ তার শেখার অন্যতম মাধ্যম।
তবে সব শিশুর আচরণ এক রকম নয়। বয়স অনুযায়ী কিছুটা জেদ বা কান্না স্বাভাবিক হলেও তা যদি খুব ঘন ঘন ঘটে, দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে, বাড়ি ও স্কুলের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করে কিংবা নিজের বা অন্যের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করে, তাহলে শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। শুধু জেদ বা রাগের ভিত্তিতে কোনো বিকাশগত সমস্যা আছে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞ শিশুর বয়স, আচরণের ধরন এবং অন্যান্য লক্ষণ বিবেচনা করে পরামর্শ দেবেন।
শিশুর জেদ কমানোর জন্য ধৈর্য, নিয়মিত অনুশীলন এবং অভিভাবকদের ধারাবাহিক আচরণ গুরুত্বপূর্ণ। একদিন বোঝালেই শিশু সব শিখে যাবে, এমন প্রত্যাশা করা উচিত নয়। কখনো সে নিজের আবেগ সামলাতে পারবে, আবার কখনো ব্যর্থ হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে তাকে অপমান না করে ভুল থেকে শেখার সুযোগ দিতে হবে।
সন্তানকে বড় করার লক্ষ্য শুধু তার কান্না বা রাগ বন্ধ করা নয়; বরং তাকে নিজের অনুভূতি বুঝতে, হতাশা মেনে নিতে এবং অন্যের সঙ্গে সুন্দরভাবে যোগাযোগ করতে শেখানো। অভিভাবকের ভালোবাসা, স্পষ্ট সীমারেখা ও ধৈর্যশীল আচরণ শিশুর এই মানসিক দক্ষতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।



