আবর্জনার দেয়ালে ৮০০ ফুটের বাগান, চার তরুণের উদ্যোগ নজর কাড়ল প্রধানমন্ত্রীর

একসময় সড়কের দুই পাশে জমে থাকত ময়লা-আবর্জনা। দুর্গন্ধে চলাচল করাও ছিল কষ্টকর। সেই পরিবেশই এখন বদলে গেছে ফুলের সুবাস আর সবুজের সমারোহে। পরিত্যক্ত ঝুড়ি, বালতি ও মগে গাছ লাগিয়ে প্রায় ৮০০ ফুট সড়কের দুই পাশের দেয়ালকে বাগানে রূপ দিয়েছেন চার তরুণ। তাঁদের ব্যতিক্রমী উদ্যোগে বদলে গেছে ময়মনসিংহ নগরের বাঁশবাড়ি কলোনির পরিবেশ ও সৌন্দর্য। এবার এই উদ্যোগ নজর কেড়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানেরও।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সম্প্রতি বাঁশবাড়ি কলোনির দেয়াল বাগান পরিদর্শন করেছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু।
উদ্যোগের পেছনে রয়েছেন মুরাদ হাসান কানন, মেহেদী হাসান মুহিত, সাইফুল ইসলাম ও উত্তম সরকার। তাঁদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একসময়কার অপরিচ্ছন্ন দেয়ালগুলো এখন বিভিন্ন প্রজাতির ফুল ও পাতাবাহারের গাছে সজ্জিত। কোথাও অর্কিড, কোথাও সুগন্ধি ফুল, আবার কোথাও সবুজ পাতার সমারোহ। সন্ধ্যার পর হাসনাহেনার সুবাসে মুখর হয়ে ওঠে আশপাশের পরিবেশ।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালে ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন বাঁশবাড়ি কলোনির সড়ক ও নালা সংস্কার করে। এরপর এলাকার পরিবেশ আরও সুন্দর করে তোলার পরিকল্পনা করেন চার তরুণ। তাঁরা বাসিন্দাদের সঙ্গে আলোচনা করে দেয়ালে বাগান গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন। স্থানীয় বাসিন্দারাও তাঁদের উদ্যোগে সাড়া দেন।
এরপর পরিত্যক্ত ঝুড়ি, বালতি ও মগ সংগ্রহ করে সেগুলোতে মাটি ভরে বিভিন্ন প্রজাতির ফুল ও পাতাবাহারের গাছ লাগানো হয়। পরিকল্পিতভাবে দেয়ালে ঝুলিয়ে দেওয়া হয় গাছের পাত্র। মাত্র তিন মাসের মধ্যে প্রায় ৮০০ ফুট সড়কের দুই পাশের দেয়াল সবুজ বাগানে রূপ নেয়।
দেয়ালে ঝুলে থাকা গাছের পাত্রগুলোর ফাঁকে ফাঁকে ছোট কাগজে লেখা রয়েছে, ‘এ গাছগুলো বিক্রির জন্য নহে’। গাছের পরিচর্যায় অংশ নিচ্ছেন এলাকার বাসিন্দারাও। কেউ পানি দিচ্ছেন, কেউ নতুন গাছ লাগাচ্ছেন, আবার কেউ পুরোনো গাছের যত্ন নিচ্ছেন। এতে পরিচ্ছন্নতা ও পরিবেশ সংরক্ষণ নিয়ে স্থানীয় মানুষের মধ্যে সচেতনতাও বাড়ছে।
উদ্যোক্তা মুরাদ হাসান কানন বলেন, তাঁদের ছোট একটি উদ্যোগ এলাকার পরিবেশ বদলে দিয়েছে। এই উদ্যোগ প্রধানমন্ত্রীর নজরে আসবে, তা তাঁরা কখনো ভাবেননি। পরিবেশমন্ত্রীর পরিদর্শন তাঁদের জন্য বড় অনুপ্রেরণা। তাঁদের আশা, এই উদ্যোগ দেখে অন্য এলাকার মানুষও নিজেদের চারপাশ পরিচ্ছন্ন ও সবুজ করে তুলতে উৎসাহিত হবেন।
কলোনির বাসিন্দাদের কাছেও পরিবর্তনটি গর্বের বিষয় হয়ে উঠেছে। আগে সড়কের দুই পাশে ময়লা ফেলার কারণে পরিবেশ নোংরা থাকত। এখন দেয়ালজুড়ে গাছ লাগানোয় বদলে গেছে পুরো এলাকার চেহারা। উদ্যোগটি দেখতে বাইরের এলাকা থেকেও মানুষ আসছেন। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ ঘুরে দেখছেন, আবার কেউ নিজেদের এলাকায় এমন বাগান গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা বেদেনা আক্তার বলেন, আগে রাস্তা ভালো ছিল না এবং দুই পাশে ময়লা ফেলা হতো। এখন রাস্তা সুন্দর হয়েছে, দেয়ালগুলোও গাছ দিয়ে সাজানো হয়েছে। এতে পুরো কলোনির চেহারা পাল্টে গেছে।
বাঁশবাড়ি কলোনির দেয়াল বাগানের খবর প্রধানমন্ত্রীর নজরে এলে তিনি সংশ্লিষ্টদের বিষয়টি খোঁজখবর নিতে নির্দেশ দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত শুক্রবার সন্ধ্যায় এলাকাটি পরিদর্শন করেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু।
ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. রুকুনুজ্জামান বলেন, বাঁশবাড়ি কলোনির বাসিন্দারা নিজেদের উদ্যোগে দেয়ালগুলোকে বাগানে রূপ দিয়েছেন। এটি অত্যন্ত শিক্ষণীয় ও অনুকরণীয় উদ্যোগ। ইচ্ছা থাকলে নিজের চারপাশের পরিবেশ সুন্দর ও সবুজ রাখা সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, পরিবেশ রক্ষায় সব সময় বিপুল অর্থ কিংবা বড় আয়োজনের প্রয়োজন হয় না। পরিত্যক্ত উপকরণের পুনর্ব্যবহার, স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ এবং কয়েকজন তরুণের সদিচ্ছা মিলেই এখানে ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত তৈরি হয়েছে।
প্রশাসকের আশা, বাঁশবাড়ি কলোনির এই উদ্যোগ ময়মনসিংহ নগরের অন্যান্য এলাকার বাসিন্দাদেরও অনুপ্রাণিত করবে। সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বিভিন্ন এলাকায় দেয়াল বাগান গড়ে তোলা গেলে নগরীর সবুজায়ন বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে।



