১০ অক্টোবর, ২০২৬ | শনিবারবাংলা: ২৫ আশ্বিন ১৪৩৩
স্বাস্থ্য

মস্তিষ্কের কার্যকলাপেই কি লুকিয়ে বিষণ্নতার ভিন্নতা?

images (1)

বিষণ্নতা শুধু মন খারাপ থাকা বা হতাশার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের উপসর্গ, অনুভূতি ও মানসিক অভিজ্ঞতায় যেমন পার্থক্য থাকে, তেমনি তাদের মস্তিষ্কের কার্যকলাপেও ভিন্নতা থাকতে পারে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বিষণ্নতায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের মস্তিষ্কের কার্যকলাপ বিশ্লেষণ করে পাঁচটি স্বতন্ত্র ধরন শনাক্ত করেছেন বিজ্ঞানীরা।

সংগৃহীত

ফিনল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব হেলসিঙ্কির গবেষকদের পরিচালিত এই গবেষণায় বিষণ্নতায় আক্রান্ত ২৬৩ জন ব্যক্তির তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, অংশগ্রহণকারীদের মস্তিষ্কের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগের ধরন এক নয়। কারও ক্ষেত্রে এই সংযোগ তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী, আবার কারও ক্ষেত্রে তা দুর্বল। এসব পার্থক্যের সঙ্গে উদ্বেগ, বারবার নেতিবাচক চিন্তা, মানসিক আঘাতের প্রভাব এবং মাদকদ্রব্যের অপব্যবহারের মতো বিষয়গুলোর সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

বিষণ্নতায় আক্রান্ত প্রত্যেকের অভিজ্ঞতা যে একই রকম নয়, গবেষণার ফলাফল সেই বিষয়টিকেই আরও স্পষ্ট করেছে। কেউ অতিরিক্ত উদ্বেগ ও নেতিবাচক চিন্তায় ভুগতে পারেন, আবার কারও মধ্যে মানসিক আঘাত-সম্পর্কিত উপসর্গ বেশি দেখা যেতে পারে। গবেষকেরা দেখতে চেয়েছেন, এসব পার্থক্যের সঙ্গে মস্তিষ্কের স্নায়বিক সংযোগের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না।

গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের মস্তিষ্কের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগের শক্তি এবং স্নায়বিক কার্যকলাপের সমন্বয় বিশ্লেষণ করে পাঁচটি পৃথক ধরন চিহ্নিত করা হয়।

প্রথম ধরনের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী সংযোগ দেখা গেছে। এই গোষ্ঠীর ব্যক্তিদের মধ্যে বিষণ্নতা, উদ্বেগ এবং একই ধরনের নেতিবাচক চিন্তা বারবার করার প্রবণতার মতো উপসর্গের সম্পর্ক পাওয়া যায়।

দ্বিতীয় ধরনের বৈশিষ্ট্য ছিল মস্তিষ্কের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে তুলনামূলকভাবে দুর্বল সংযোগ। এই গোষ্ঠীর অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে সাধারণত বিষণ্নতার উপসর্গের তীব্রতা অন্য কয়েকটি গোষ্ঠীর তুলনায় কম ছিল।

Advertisements

তৃতীয় ধরনের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের বিস্তৃত অঞ্চলজুড়ে দুর্বল সংযোগ লক্ষ করা যায়। এই ধরনটির সঙ্গে পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (পিটিএসডি) বা গুরুতর মানসিক আঘাতের পর দেখা দেওয়া সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত উপসর্গের যোগসূত্র পাওয়া গেছে।

চতুর্থ ধরনের মস্তিষ্কে কিছু অঞ্চলের মধ্যে শক্তিশালী এবং অন্য কিছু অঞ্চলের মধ্যে দুর্বল সংযোগ দেখা গেছে। এই গোষ্ঠীর সঙ্গে তুলনামূলকভাবে তীব্র বিষণ্নতা, মাদকদ্রব্যের অপব্যবহারের সমস্যা এবং সামগ্রিক সুস্থতার নিম্নমানের সম্পর্ক পাওয়া যায়।

পঞ্চম ধরনের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী সংযোগ দেখা গেছে। এই গোষ্ঠীর ব্যক্তিদের মধ্যে মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার-সম্পর্কিত সমস্যা উল্লেখযোগ্য ছিল। তবে মানসিক আঘাত-সম্পর্কিত উপসর্গ অন্য কয়েকটি গোষ্ঠীর তুলনায় কম প্রকট ছিল।

গবেষকেরা আরও দেখতে পেয়েছেন, এই পাঁচটি গোষ্ঠীর মস্তিষ্কের কার্যকলাপ সুস্থ অংশগ্রহণকারীদের তুলনায় আলাদা ছিল। পার্থক্য শুধু সংযোগের শক্তিতে নয়, বরং মস্তিষ্কের কোন অঞ্চলগুলো পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত এবং কীভাবে তাদের কার্যকলাপ সমন্বিত হয়, সেখানেও ভিন্নতা ছিল।

গবেষণার ফলাফল থেকে ধারণা পাওয়া যায়, বিষণ্নতা একটি নির্দিষ্ট ধরনের মস্তিষ্কের কার্যকলাপের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একই রোগনির্ণয় থাকা ব্যক্তিদের মধ্যেও স্নায়বিক কার্যপ্রণালি ও উপসর্গের ধরন আলাদা হতে পারে। ভবিষ্যতে এসব পার্থক্য আরও ভালোভাবে বোঝা গেলে ব্যক্তিভেদে বিষণ্নতার চিকিৎসা ও পরিচর্যার পদ্ধতি নির্ধারণে সহায়তা মিলতে পারে।

তবে গবেষণায় শনাক্ত পাঁচটি ধরনকে বিষণ্নতার প্রতিষ্ঠিত পাঁচটি রোগ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। এসব ফলাফল এখনো গবেষণার পর্যায়ে রয়েছে। তাই শুধু মস্তিষ্কের কার্যকলাপের ধরন দিয়ে কারও বিষণ্নতা নির্ণয় করা বা চিকিৎসা নির্ধারণ করা যায় না।

Advertisements