ফ্যামিলি কার্ডের কথা বলে টিপসই নিয়ে বিধবাকে বিয়ে, ৫ সন্তানের জননীর থানায় অভিযোগ

স্বামী মারা গেছেন এক যুগ আগে। পাঁচ সন্তানকে নিয়ে কোনোমতে দিন কাটছিল ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়ার আছিয়া খাতুনের। জীবনের নানা টানাপোড়েনের মধ্যেও নতুন করে বিয়েতে রাজি হননি তিনি। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, সরকারি ফ্যামিলি কার্ড করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে তাঁর কাছ থেকে জাতীয় পরিচয়পত্রের অনুলিপি, ছবি ও টিপসই নেওয়া হয়। পরে সেই তথ্য ব্যবহার করে তাঁকে বিয়ে করেছেন—এমন দাবি তুলে একটি এফিডেভিট ও কাবিননামা প্রচার করা হয়। ঘটনাটি নিয়ে এলাকায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনায় দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ৪৫ বছর বয়সী এই নারী।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ফুলবাড়ীয়া থানার উপপরিদর্শক মিজানুর রহমান। এর আগে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ভুক্তভোগী নারী অভিযোগটি দায়ের করেন। অভিযুক্তরা হলেন আব্দুল কুদ্দুস ও আবদুস ছাত্তার।
কার্ডের কথা বলে নেওয়া হয় কাগজপত্র
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার পুটিজানা ইউনিয়নের পাটুলী গ্রামের বাসিন্দা আছিয়া খাতুনের স্বামী মারা যান প্রায় ১২ বছর আগে। তাঁর পাঁচ সন্তানের মধ্যে তিন ছেলের বিয়ে হয়েছে। নাতি-নাতনিও রয়েছে। ছোট ছেলের বয়স মাত্র ১৩ বছর।
প্রায় চার বছর আগে আছিয়ার মেজ ছেলে আসাদুলের বিয়ের সময় প্রতিবেশী আব্দুল কুদ্দুসকে উকিল শ্বশুর করা হয়। সেই সূত্রে আছিয়ার বাড়িতে তাঁর নিয়মিত যাতায়াত ছিল। অভিযোগ অনুযায়ী, কুদ্দুস একাধিকবার আবদুস ছাত্তারের মাধ্যমে আছিয়াকে বিয়ের প্রস্তাব দিলেও তিনি তাতে সম্মতি দেননি।
ভুক্তভোগীর অভিযোগ, প্রায় দেড় মাস আগে আবদুস ছাত্তার সরকারি ফ্যামিলি কার্ড করে দেওয়ার কথা বলে তাঁকে নিজের দোকানে নিয়ে যান। সেখানে তাঁর জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি ও পাসপোর্ট আকারের ছবি নেওয়া হয়। কয়েক দিন পর একটি খাতায় দুটি জায়গায় টিপসইও নেওয়া হয়। আছিয়া অভিযোগ করেছেন, কার্ড করে দেওয়ার আশ্বাসেই তিনি এসব কাগজপত্র ও টিপসই দিয়েছিলেন।
গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে বিয়ের খবর
সম্প্রতি আবদুস ছাত্তার আছিয়া ও আব্দুল কুদ্দুসের বিয়ে হয়েছে দাবি করে একটি এফিডেভিট ও কাবিননামা দেখিয়ে প্রচার শুরু করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর আছিয়া স্থানীয় মসজিদের ইমাম ও সভাপতির কাছে প্রতিকার চান।গত ৫ অক্টোবর সন্ধ্যায় পাটুলী গ্রামে তাঁর বাড়িতে স্থানীয় ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে সালিশ বসে। সেখানে আছিয়ার বক্তব্য শোনা হয়। অভিযুক্ত আবদুস ছাত্তার উপস্থিত না থাকায় পরবর্তী সময়ে ৭ অক্টোবর আবার সালিশের দিন নির্ধারণ করা হয়েছিল।
সালিশে উপস্থিত ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রদর্শিত কাবিননামায় দেনমোহর ধরা হয়েছে দুই লাখ ৫০ হাজার টাকা। সেখানে নগদ ৫০ হাজার টাকা পরিশোধের কথাও উল্লেখ রয়েছে। কাবিননামায় আব্দুল মান্নান ও সাইফুল ইসলাম নামে দুজনকে সাক্ষী দেখানো হলেও তাঁরা বিষয়টি জানেন না বলে দাবি করা হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিয়ের প্রস্তাবে সম্মতি না পেয়ে কৌশলে এসব কাগজ তৈরি করা হয়েছে। এ ঘটনায় আবদুস ছাত্তারের পাশাপাশি আব্দুল হেকিম মাস্টারের সম্পৃক্ততার অভিযোগও তুলেছেন তাঁরা। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো তদন্তে প্রমাণিত হয়নি।
অভিযোগ অস্বীকার অভিযুক্তের
অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আবদুস ছাত্তার। তাঁর দাবি, ফ্যামিলি কার্ডের কথা বলে তিনি আছিয়ার কাছ থেকে কোনো টিপসই নেননি। জমিজমা নিয়ে বিরোধের জেরে তাঁকে এ ঘটনায় জড়ানো হচ্ছে। এ বিষয়ে উপজেলা জামায়াতের আমির ফজলুল হক শামীম জানান, ঘটনাটি জানার পর স্থানীয় দায়িত্বশীলদের মাধ্যমে খোঁজ নেওয়া হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, আবদুস ছাত্তার দলটির নিয়মিত পদধারী নেতা নন; নির্বাচনের সময় তিনি একটি কেন্দ্র কমিটির সহযোগী সদস্য ছিলেন। এর আগে তিনি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলেও জানান শামীম।
তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে তাঁদের ধারণা, আবদুস ছাত্তার এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত নাও থাকতে পারেন। ঘটনাটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রকৃত অপরাধী শনাক্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে মত দেন তিনি।
তদন্তের অপেক্ষায় ভুক্তভোগী
থানায় অভিযোগ দায়েরের পর থেকে আব্দুল কুদ্দুস ও আবদুস ছাত্তার আত্মগোপনে রয়েছেন বলে জানা গেছে। এ কারণে তাঁদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
ফুলবাড়ীয়া থানার উপপরিদর্শক মিজানুর রহমান বলেন, এ ঘটনায় একটি লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। তিনি পুটিজানা ইউনিয়নের বিট কর্মকর্তা হওয়ায় তাঁকেই তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্ত শেষে বিস্তারিত জানানো হবে।
সরকারি সহায়তার আশ্বাসে কাগজপত্র ও টিপসই নেওয়ার অভিযোগটি এখন তদন্তের অপেক্ষায়। আছিয়ার অভিযোগের সত্যতা, কাবিননামার বৈধতা এবং এতে কারা জড়িত—এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে তদন্তের পর। ততক্ষণ পর্যন্ত অভিযোগগুলোকে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।



