৮ অক্টোবর, ২০২৬ | বৃহস্পতিবারবাংলা: ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩
নারী

আঁটি দিয়ে শুরু করা সেই নার্সারিতে এখন ৫০ হাজার চারা

IMG_5954

আমের আঁটি সংগ্রহ করে বাড়ির পাশে চারা তৈরি দিয়ে শুরু করেছিলেন ম্রানুচিং মারমা। সেই ছোট উদ্যোগই ধীরে ধীরে রূপ নিয়েছে বড় নার্সারিতে। বর্তমানে তাঁর এক একরের নার্সারিতে রয়েছে প্রায় ৫০ হাজার চারা। এসব চারা বিক্রি করে চলতি বছর ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা আয়ের আশা করছেন তিনি।

খাগড়াছড়ির পানছড়ি সদরের কানুনগোপাড়া এলাকার বাসিন্দা ৩১ বছর বয়সী ম্রানুচিং পেশায় একটি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। তাঁর স্বামী উচিমং মারমাও শিক্ষকতা করেন। তাঁদের সংসারে রয়েছে এক ছেলে ও এক মেয়ে।

২০২০ সালের মাঝামাঝি করোনার সময়ে ম্রানুচিংয়ের নার্সারি করার আগ্রহ তৈরি হয়। স্কুল বন্ধ থাকায় বেতনও পাচ্ছিলেন না তিনি। সংসার চালাতে শিশুদের টিউশনি করালেও একসময় সেটিও বন্ধ হয়ে যায়। তখন আমবাগান করার পরিকল্পনা করেন তিনি।

বাজারে চারা কিনতে গিয়ে দাম বেশি হওয়ায় তা কেনা সম্ভব হয়নি। এরপর প্রতিবেশী ও পরিচিতজনদের কাছ থেকে আমের আঁটি ও বীজ সংগ্রহ করে বাড়ির পাশে চারা উৎপাদন শুরু করেন। প্রথম বছরই প্রায় ১২ হাজার টাকার চারা বিক্রি করেন তিনি। পরে কলম পদ্ধতিতে চারা উৎপাদনও শেখেন। ধীরে ধীরে তাঁর চারার চাহিদা বাড়তে থাকে এবং গড়ে ওঠে ‘গ্রিন কেয়ার নার্সারি’।

বর্তমানে এক একর জায়গাজুড়ে থাকা নার্সারিতে আম ছাড়াও লিচু, পেয়ারা, লটকন ও বারোমাসি কাঁঠালের চারা রয়েছে। জাতভেদে আমের চারা ৪০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি করেন ম্রানুচিং। নিজেদের জমিতে নার্সারি হওয়ায় উৎপাদন খরচ তুলনামূলক কম। পাশাপাশি এলাকায় সহজলভ্য গোবর জৈব সার হিসেবে ব্যবহার করেন তিনি।

নার্সারির চারা অনলাইনেও বিক্রি করেন ম্রানুচিং। ফেসবুক পেজে চারার ছবি দেখে বিভিন্ন স্থান থেকে ক্রেতারা যোগাযোগ করেন। জেলার দূরদূরান্ত থেকেও অনেকে তাঁর নার্সারিতে এসে চারা কিনছেন। কেউ নিজের বাগানের জন্য, আবার কেউ বাণিজ্যিকভাবে আমবাগান করার উদ্দেশ্যে চারা সংগ্রহ করছেন। পাশাপাশি তাঁরা চাষ ও নার্সারি বিষয়ে ম্রানুচিংয়ের পরামর্শও নিচ্ছেন।

Advertisements

পানছড়ির উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষিকা রোমিতা দেওয়ানও তাঁর নার্সারি থেকে চারা কিনেছেন। তিনি জানান, চার বছর আগে বিভিন্ন জাতের ১০০টি চারা কিনে লাগিয়েছিলেন। চলতি বছর সেসব গাছে আম ধরেছে এবং ফলের জাতও ভালো হয়েছে। নতুন জাতের আরও কয়েকটি চারা কিনতে এবার আবার নার্সারিতে এসেছেন তিনি।

প্রতিদিন সকালে নার্সারিতে গিয়ে পরিচর্যার কাজ করেন ম্রানুচিং। এরপর স্কুলে যান। ছুটির পর আবার নার্সারিতে ফিরে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করেন। ছুটির দিনগুলোও কাটে নার্সারিতেই। বর্তমানে তিনজন শ্রমিক তাঁর সঙ্গে কাজ করছেন।

ম্রানুচিংয়ের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নেই। শিক্ষক স্বামীর কাছ থেকে দেখে প্রথমে চারা তৈরি শেখেন। পরে নিজে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে কলমসহ বিভিন্ন পদ্ধতিতে দক্ষতা অর্জন করেন। তাঁর মতে, ভালো চারা উৎপাদনের মূলমন্ত্র হলো নিজের হাতে কাজ করা এবং প্রতিটি ধাপের প্রতি নজর রাখা।

ভবিষ্যতে নার্সারিটিকে আরও বড় করার স্বপ্ন দেখেন ম্রানুচিং। তাঁর ইচ্ছা, নিজের উদ্যোগের মাধ্যমে অন্য নারীরাও যেন কৃষি ও নার্সারি ব্যবসায় এগিয়ে আসার অনুপ্রেরণা পান।

পানছড়ি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুস সালাম বলেন, ম্রানুচিং মারমার চারা উৎপাদনের বিষয়টি তিনি শুনেছেন। তাঁর উদ্যোগ অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণার। কৃষি বিভাগের কাছে সহযোগিতা বা পরামর্শ চাইলে তাঁকে সহায়তা করা হবে। শিগগিরই তাঁর নার্সারি পরিদর্শনে যাওয়ার কথাও জানান তিনি।

Advertisements