৮ অক্টোবর, ২০২৬ | বৃহস্পতিবারবাংলা: ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩
এডিটরস পিক

দশ হাত নেই, অসুরও নেই—৩০০ বছর ধরে যে রূপে পূজিত হন দুর্গা

IMG_5928

সাধারণত দুর্গার প্রতিমা বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে দশভুজা দেবীর রুদ্ররূপ, হাতে অস্ত্র আর পায়ের নিচে মহিষাসুর। তবে পশ্চিমবঙ্গের হাওড়ার শিবপুরের পাল বাড়িতে ৩০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে পূজিত হয়ে আসছেন সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপের দুর্গা। এখানে দেবী দ্বিভুজা, নেই কোনো অস্ত্র বা মহিষাসুর। বরং অভয়মুদ্রায় শান্ত ও আশ্বাসদাত্রী রূপে পূজিত হন তিনি।

নবগোপাল মুখার্জি লেনের পাল বাড়ির এই দুর্গাপূজার সূচনা পরিবারের পূর্বপুরুষ শ্রী সর্বস্ব পালের হাত ধরে। পরিবারের ইতিহাস অনুযায়ী, স্বপ্নাদেশ পেয়েই তিনি এই পূজা শুরু করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে পরিবারের প্রখ্যাত সদস্য ফার্মাসিস্ট বাটাকৃষ্ণ পাল বা বি. কে. পালের সময় পূজার জৌলুস আরও বাড়ে।

এই প্রতিমার বাম হাতে রয়েছে অভয়মুদ্রা, আর ডান হাতে ফল ও প্রস্ফুটিত পদ্মফুল। দেবীর বাহন সিংহ থাকলেও নেই মহিষাসুর। পরিবারের সদস্যদের মতে, এটি যুদ্ধের পর দেবীর শান্ত রূপের প্রতীক। মহিষাসুরকে বধ করার পর দেবী যখন বিশ্ববাসীকে আশ্বস্ত করছেন যে যুদ্ধ শেষ এবং আর কোনো ভয় নেই—এই ভাবনাই প্রতিমার মাধ্যমে তুলে ধরা হয়।

পাল বাড়ির দুর্গাপূজায় এখনো বেশ কিছু প্রাচীন রীতি অনুসরণ করা হয়। রথের দিন কাঠামো পূজার মধ্য দিয়ে প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু হয়। দেবীর সাজ হয় ডাকের সাজে। দুর্গাপূজার নবমীর ১৫ দিন আগে কৃষ্ণনবমী তিথিতে বোধনের মাধ্যমে পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয় এবং এরপর প্রতিদিন চণ্ডীপাঠ করা হয়।

এই বাড়িতে দেবীকে অন্নভোগ দেওয়ার রীতি নেই। ভোগে থাকে লুচি, মিষ্টি ও ফল। সপ্তমীর ভোরে নবপত্রিকার স্নানও বাড়ির প্রাঙ্গণেই সম্পন্ন করা হয়। অষ্টমীর সকালে রয়েছে ধুনো পোড়ানোর বিশেষ আয়োজন, যেখানে পরিবারের নারী সদস্যদের পাশাপাশি প্রতিবেশিনীরাও অংশ নেন।

শাক্তমতে পূজা হওয়ায় পাল বাড়িতে বলির প্রথাও রয়েছে। সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত পাঁঠাবলি দেওয়া হয় এবং নবমীতে হয় ফলবলি। তবে সন্ধিপূজার সময় নারীদের অংশ নেওয়ার রীতি নেই; পরিবারের পুরুষ সদস্যরাই এই আচার সম্পন্ন করেন।

Advertisements

দশমীর সিঁদুর খেলাতেও রয়েছে আলাদা নিয়ম। বাড়ির মেয়েরা প্রচলিত রীতিতে দেবীকে বরণ না করে শুধু দেবীর গায়ে সিঁদুর ছুঁইয়ে দেন। এরপর তারা নিজেদের মধ্যে সিঁদুর খেলায় অংশ নেন। পূজা শেষে পরিবারের ছেলেরা মিলে শিবপুরের ঘাটে প্রতিমা বিসর্জন দেন।

দুর্গার পরিচিত মহিষাসুরমর্দিনী রূপের বাইরে পাল বাড়ির এই শান্ত, দ্বিভুজা ও অস্ত্রহীন প্রতিমা তাই আলাদা এক ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা বিশ্বাস, আচার ও রীতির কারণে ৩০০ বছরের বেশি পুরোনো এই দুর্গাপূজা আজও স্বতন্ত্র পরিচয় ধরে রেখেছে।

Advertisements