ধরন বদলেছে ডেঙ্গুর

ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ এতটাই বেড়েছে যে অনেক জায়গায় বেডের পাশাপাশি মেঝেতেও বিছানা পেতে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। চলতি বছরের আগস্টের তুলনায় সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। একই সময়ে মৃত্যুর সংখ্যাও বেড়েছে প্রায় তিন গুণ।
এদিকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু রোগের আচরণ বা ধরনে পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে অনেক রোগীর ক্ষেত্রে ডেঙ্গুর প্রচলিত বা টিপিক্যাল লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ফলে অনেকেই এটিকে সাধারণ সর্দি-জ্বর ভেবে অবহেলা করছেন। পরে হঠাৎ করে রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়ে শকে চলে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে। এতে মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, আগস্ট মাসে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছিল ৪৩ জনের। সেপ্টেম্বরে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪৮ জনে। একইভাবে আগস্টে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ২০ হাজার ৫৩৬ জন। সেপ্টেম্বরে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৪৩ হাজার ৭৭৪ জন। আর অক্টোবরের প্রথম চার দিনে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ৬ হাজার ৮৩৮ জন এবং এ সময়ে মৃত্যু হয়েছে ১৭ জনের।
বিশিষ্ট মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ ইত্তেফাককে বলেন, যারা আগে একবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন, তারা দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হলে পরিস্থিতি অনেক বেশি মারাত্মক হতে পারে। তার ভাষ্য, ডেঙ্গু তার আচরণ বদলে ফেলেছে এবং রোগটির সাধারণ লক্ষণ অনেক সময় দেখা যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে মাত্র ১০১ বা ১০২ ডিগ্রি জ্বর থাকলেও ডেঙ্গু শনাক্ত হচ্ছে। অনেকের ক্ষেত্রে উচ্চ জ্বর বা শরীরে র্যাশও থাকছে না। ফলে মানুষ বিষয়টিকে সাধারণ জ্বর ভেবে অবহেলা করছেন। পরে দেখা যাচ্ছে, রোগী হঠাৎ করে শকে চলে যাচ্ছেন। এতে যেমন রোগীকে ভুগতে হচ্ছে, তেমনি চিকিৎসকদেরও সংকটের মধ্যে পড়তে হচ্ছে।
এ কারণে সামান্য জ্বর, সর্দি বা কাশি হলেও ডেঙ্গু পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দিয়েছেন এই বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, দ্রুত রোগ শনাক্ত করা গেলে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নেওয়া হলে রোগীর অবস্থা গুরুতর পর্যায়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে ক্যানসার, হৃদ্রোগ, কিডনি বা চোখের সমস্যাসহ অন্যান্য রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদেরও বিশেষভাবে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ বলেন, এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় রাখলে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর হার কমিয়ে আনা সম্ভব। তিনি বলেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মানুষ যেন ডেঙ্গুতে আক্রান্তই না হন। কারণ বর্তমানে হাসপাতালগুলো রোগীতে সয়লাব হয়ে গেছে এবং অনেক জায়গায় কোনো বেডই খালি নেই।
এদিকে ডেঙ্গুর চিকিৎসায় বিশ্বে কার্যকর কোনো ওষুধ থাকলে তা দেশে সহজলভ্য করার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।
তিনি বলেছেন, সরকারিভাবে ডেঙ্গুর টিকা আনার মতো পর্যাপ্ত তহবিল না থাকলে বেসরকারি খাতের জন্য বাজার উন্মুক্ত করে দেওয়া উচিত। মানুষের জীবন রক্ষায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসা উপকরণ ও ওষুধ সহজলভ্য করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
গতকাল রোববার রাজধানীর মগবাজারের মধুবাগে দেশব্যাপী ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতা সপ্তাহের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ডেঙ্গুকে তারা মহামারির মতো গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন। এ কারণে ৪ থেকে ১০ অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতা সপ্তাহ পালন করা হচ্ছে।
এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু জ্বরে গত ২৪ ঘণ্টায়, অর্থাৎ শনিবার সকাল ৮টা থেকে রবিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত, সারা দেশে আরও ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ডেঙ্গু আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন ২ হাজার ৮৯ জন।
এ নিয়ে চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মোট মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৬২ জনে। অন্যদিকে, এ বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৬ হাজার ৪৫৮ জনে। রবিবার বিকেলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোলরুম থেকে প্রকাশিত ডেঙ্গুবিষয়ক বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
হামেও বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃত্যু
এদিকে হাম ও হামসদৃশ উপসর্গেও উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে হাম উপসর্গে আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৩০০ জন। রবিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামসংক্রান্ত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় সন্দেহজনক হামে আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ২১৮ জন। এ সময়ে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়েছেন আরও ৮২ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ থেকে এ পর্যন্ত নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়ে ১০২ জনের মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে সন্দেহজনক হামে মৃত্যু হয়েছে ১০৩ জনের।
এ পর্যন্ত দেশে নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়েছেন ২১ হাজার ৭৪৮ জন। আর হামসদৃশ উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত হয়েছেন ১ লাখ ৯৬ হাজার ৪১৮ জন।
হামে আক্রান্ত হয়ে এ পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৭৪ হাজার ১৪৯ জন। তাদের মধ্যে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১ লাখ ৬৬ হাজার ৯০৮ জন।



