সেপ্টেম্বরে নারী-শিশু নির্যাতনসহ বিভিন্ন সহিংসতা বেড়েছে

সেপ্টেম্বর মাসে দেশে নারী ও শিশুদের ওপর সহিংসতার ঘটনা আগস্টের তুলনায় বেড়েছে। একই সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতা, কারা হেফাজতে মৃত্যু, অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার এবং সাইবার অপরাধের ঘটনাও বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে মব সহিংসতা ও সাংবাদিকদের ওপর শারীরিক হামলার সংখ্যা কমেছে।
মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) প্রকাশিত সেপ্টেম্বরের মাসিক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগস্টে নারী ও শিশু নির্যাতনের ৩২৭টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল। সেপ্টেম্বরে এ সংখ্যা বেড়ে ৩৫৪টিতে পৌঁছেছে। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে ঘটনা বেড়েছে ২৭টি, যা প্রায় ৮ দশমিক ৩ শতাংশ।
সেপ্টেম্বরে ধর্ষণের ঘটনা ৭০টি থেকে সামান্য কমে ৬৯টিতে দাঁড়িয়েছে। তবে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা ৫টি থেকে দ্বিগুণ হয়ে ১০টিতে পৌঁছেছে। ধর্ষণচেষ্টা ২১টি থেকে বেড়ে ৩৬টি এবং শারীরিক নির্যাতনের ঘটনা ৪০টি থেকে বেড়ে ৫২টিতে দাঁড়িয়েছে। অপহরণ ও নিখোঁজের ঘটনাও ১৪টি থেকে বেড়ে ২৭টি হয়েছে।
এমএসএফের হিসাবে, সেপ্টেম্বরে দলবদ্ধ ধর্ষণের ১২টি ঘটনা, বলাৎকারের ৭টি এবং যৌন নিপীড়ন বা হয়রানির ১৬টি ঘটনা ঘটেছে। অন্যদিকে আত্মহত্যার ঘটনা আগস্টের ৩৯টি থেকে কমে সেপ্টেম্বরে ৩৫টিতে নেমেছে। নারী ও শিশু হত্যার ঘটনাও ৯১টি থেকে কমে ৮০টিতে দাঁড়িয়েছে।
এ ছাড়া সেপ্টেম্বরে পরিত্যক্ত অবস্থায় নয়টি নবজাতক উদ্ধারের তথ্য পাওয়া গেছে। আগস্টে এমন ঘটনা ছিল তিনটি। কুমিল্লায় এক প্রতিবন্ধী কিশোরী ধর্ষণের শিকার হয়ে অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর সালিশে ৪০ হাজার টাকার বিনিময়ে গর্ভপাত করানোর সিদ্ধান্তের ঘটনাটিও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অনলাইন জুয়া সংশ্লিষ্ট ঘটনায় সেপ্টেম্বরে নিহত বা আহতের তথ্য না থাকলেও গ্রেপ্তার বেড়েছে। আগস্টে এ ধরনের ঘটনায় চারজন আটক হলেও সেপ্টেম্বরে আটক হয়েছেন ১৪ জন।
মাদক-সংক্রান্ত ঘটনায় সেপ্টেম্বরে নিহতের সংখ্যা আগস্টের আটজন থেকে কমে তিনজনে দাঁড়িয়েছে। তবে আহতের সংখ্যা সাত থেকে বেড়ে ১২ হয়েছে। এ ছাড়া মাদক মামলায় আটকের সংখ্যাও ২১৩ থেকে বেড়ে ৪৭১ জন হয়েছে। দুই মাসেই মাদক ব্যবসার সঙ্গে পুলিশের সম্পৃক্ততার অভিযোগে দুটি করে ঘটনা নথিভুক্ত করেছে এমএসএফ।
রাজনৈতিক সহিংসতার চিত্রেও বড় পরিবর্তন দেখা গেছে। সেপ্টেম্বরে এ ধরনের ঘটনায় ৩৮৪ জন আহত হয়েছেন, যেখানে আগস্টে আহতের সংখ্যা ছিল ৯৫। রাজনৈতিক সহিংসতায় একজন নিহত হয়েছেন। পাশাপাশি অজ্ঞাত হামলায় নিহত হয়েছেন আরও সাতজন।
কারা হেফাজতে মৃত্যুর সংখ্যাও সেপ্টেম্বরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আগস্টে যেখানে নয়জনের মৃত্যু হয়েছিল, সেপ্টেম্বরে সেই সংখ্যা বেড়ে ২৪ হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ১০ জন সাজাপ্রাপ্ত এবং ১৪ জন হাজতি ছিলেন। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে একজন নারীর মৃত্যুর ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে।
সেপ্টেম্বরে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ৭১টি অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। আগস্টে এ সংখ্যা ছিল ৫৬। উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর মধ্যে ৫৫টি পুরুষের, ১৫টি নারীর এবং একটি মরদেহের লিঙ্গ শনাক্ত করা যায়নি। এর মধ্যে দুই কিশোর ও এক কিশোরীর মরদেহও রয়েছে। কিছু মরদেহ গলা কাটা, বস্তাবন্দী, হাত-পা বাঁধা কিংবা রক্তাক্ত অবস্থায় পাওয়া গেছে।
সাংবাদিকদের ওপর শারীরিক হামলা বা নির্যাতনের ঘটনা আগস্টের ৩৬টি থেকে কমে সেপ্টেম্বরে ২৮টিতে নেমেছে। তবে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আইনি হয়রানির ঘটনা চারটি থেকে বেড়ে নয়টিতে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে ডিজিটাল বা সাইবার মামলার সংখ্যা তিনটি থেকে বেড়ে আটটি হয়েছে। এসব মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন আটজন এবং আসামির সংখ্যা ১৪।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপাসনালয় ও প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনাও বেড়েছে। আগস্টে এ ধরনের একটি ঘটনা নথিভুক্ত হলেও সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে ১০টিতে দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়া খাগড়াছড়িতে একটি জাতিগত নির্যাতনের ঘটনাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এমএসএফ বলছে, সেপ্টেম্বরের সামগ্রিক পরিস্থিতিতে নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে কয়েক ধরনের গুরুতর সহিংসতা বেড়েছে। এর পাশাপাশি রাজনৈতিক সহিংসতা, কারা হেফাজতে মৃত্যু, অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ উদ্ধার, সাইবার অপরাধ এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা পরিস্থিতিও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
এসব পরিস্থিতি মোকাবিলায় সহিংসতা প্রতিরোধ, অপরাধের দ্রুত বিচার, ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার জবাবদিহি আরও কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে মানবাধিকার সংগঠনটি।



