নিজের সন্তান না থাকলেও কেন ‘উম্মে আবদুল্লাহ’ ছিলেন আয়েশা (রা.)

আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) ছিলেন ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম জ্ঞানী ও মর্যাদাপূর্ণ নারী। ‘সিদ্দিকা’ ও ‘উম্মুল মুমিনিন’সহ বিভিন্ন সম্মানসূচক পরিচয়ে তাকে স্মরণ করা হয়। এর পাশাপাশি তার একটি কুনিয়াত ছিল ‘উম্মে আবদুল্লাহ’, যার অর্থ ‘আবদুল্লাহর মা’।
কিন্তু আয়েশা (রা.)-এর নিজের কোনো সন্তান ছিল না। তাহলে তাকে কেন ‘উম্মে আবদুল্লাহ’ নামে ডাকা হতো—এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় তার নিজের বর্ণিত একটি সহিহ হাদিসে।
একবার আয়েশা (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে নিজের একটি ইচ্ছার কথা জানান। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন, নবীজি (সা.)-এর অন্য স্ত্রীদের প্রত্যেকেরই একটি করে কুনিয়াত রয়েছে। তারও এমন একটি কুনিয়াত থাকার আকাঙ্ক্ষা ছিল।
তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে তার ভাগনে আবদুল্লাহর নাম অনুসারে কুনিয়াত গ্রহণের পরামর্শ দেন। এ বিষয়ে সুনানে আবু দাউদের একটি হাদিসে আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনা রয়েছে। হাদিসটির ব্যাখ্যায় বর্ণনাকারী মুসাদ্দাদ উল্লেখ করেছেন, এখানে আবদুল্লাহ বলতে আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইরকে বোঝানো হয়েছে। এরপর থেকেই আয়েশা (রা.)-এর কুনিয়াত হয়ে যায় ‘উম্মে আবদুল্লাহ’। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৯৭০)
কুনিয়াতের পেছনের ঘটনা
আরব সমাজে কুনিয়াত ছিল পরিচয়ের একটি প্রচলিত ও সম্মানজনক রীতি। সাধারণত কারও নামের সঙ্গে ‘আবু’ বা ‘উম্ম’ যুক্ত করে কোনো সন্তান বা নিকটজনের নাম উল্লেখ করা হতো। তবে কুনিয়াতের জন্য নিজের সন্তান থাকা অপরিহার্য ছিল না।
আয়েশা (রা.)-এর ঘটনাটি তারই একটি উদাহরণ। তিনি আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইরের মা ছিলেন না; তিনি ছিলেন তার খালা। কিন্তু ভাগনের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও স্নেহপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) সেই সম্পর্কের সূত্রেই তার জন্য ‘উম্মে আবদুল্লাহ’ কুনিয়াত নির্ধারণ করে দেন।
আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর ছিলেন সাহাবি জুবাইর ইবনে আওয়াম (রা.) ও আসমা বিনতে আবু বকর (রা.)-এর সন্তান। আসমা (রা.) ছিলেন আয়েশা (রা.)-এর বড় বোন। ফলে আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর ছিলেন আয়েশা (রা.)-এর ভাগনে।
এ কারণে ‘উম্মে আবদুল্লাহ’ নামের ‘উম্ম’ শব্দটি এখানে সরাসরি জন্মদাত্রী মাকে বোঝায় না। বরং এটি ছিল তার প্রিয় ভাগনের সঙ্গে থাকা ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের প্রতিফলন।
সন্তান না থাকলেও ‘উম্মে’ কুনিয়াত
সাধারণভাবে ‘উম্মে অমুক’ শুনলে বোঝা যায়, ওই ব্যক্তির সন্তান অমুক। কিন্তু আয়েশা (রা.)-এর ক্ষেত্রে বিষয়টি ছিল ভিন্ন। তিনি আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইরের খালা হওয়া সত্ত্বেও তার নামের সঙ্গে যুক্ত হয় ‘উম্মে আবদুল্লাহ’।
এ ঘটনা থেকে বোঝা যায়, ইসলামের প্রাথমিক যুগের আরব সমাজে কুনিয়াত শুধু সন্তানকে কেন্দ্র করেই নির্ধারিত হতো না। আত্মীয়তা, ভালোবাসা, সম্মান কিংবা বিশেষ কোনো সম্পর্কও কুনিয়াতের ভিত্তি হতে পারত।
আয়েশা (রা.)-এর সঙ্গে তার ভাগনে আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইরের সম্পর্কও ছিল স্নেহ ও পারিবারিক ঘনিষ্ঠতায় পূর্ণ। তাই তার কুনিয়াতে ভাগনের নাম যুক্ত হওয়াটা সেই সম্পর্কেরই একটি স্মারক হয়ে ওঠে।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর স্নেহময় আচরণ
এই ঘটনার মধ্যে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পারিবারিক জীবনের একটি কোমল দিকও ফুটে ওঠে। আয়েশা (রা.) নিজের একটি ব্যক্তিগত ইচ্ছা তার কাছে প্রকাশ করেছিলেন। নবীজি (সা.) বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে তার জন্য এমন একটি কুনিয়াত নির্ধারণ করে দেন, যা পরবর্তীকালে তার পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে যায়।
মুসনাদে আহমদের একটি বর্ণনায়ও আয়েশা (রা.)-কে ‘উম্মে আবদুল্লাহ’ নামে উল্লেখ করা হয়েছে। বর্ণনাটি তার মৃত্যুর আগপর্যন্ত এই কুনিয়াত ব্যবহারের বিষয়টি তুলে ধরে। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ২৬২৪২)
ইসলামের ইতিহাসে আয়েশা (রা.)-এর পরিচয় মূলত একজন জ্ঞানী সাহাবি, ফকিহ এবং বিপুলসংখ্যক হাদিসের বর্ণনাকারী হিসেবে। নবীজি (সা.)-এর পারিবারিক জীবন ও সুন্নাহ সম্পর্কে তার বর্ণনাগুলোও ইসলামী জ্ঞানচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ।
তবে ‘উম্মে আবদুল্লাহ’ কুনিয়াত তার জীবনের আরও ব্যক্তিগত ও স্নেহময় একটি অধ্যায়ের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। নিজের সন্তান না থাকলেও একজন প্রিয় ভাগনের সঙ্গে গভীর পারিবারিক সম্পর্কের কারণে তিনি পেয়েছিলেন এই বিশেষ পরিচয়।
অর্থাৎ, আয়েশা (রা.)-কে ‘উম্মে আবদুল্লাহ’ বলা হতো তার নিজের সন্তানের কারণে নয়; বরং তার ভাগনে আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর (রা.)-এর নাম অনুসারে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে এই কুনিয়াত দিয়েছিলেন।


