২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | মঙ্গলবারবাংলা: ১৪ আশ্বিন ১৪৩৩
নারী

ডাক্তারি পেশা ছেড়ে বান বিক্রি, দং মিনের জীবনে এল নতুন আনন্দ

Chinese-doctor-quits-20-year-medical-career-to-open-steamed-bun-shop-for-mental-health-relief-6abb4887976b8

দুই দশকেরও বেশি সময় চিকিৎসক হিসেবে কাজ করার পর হঠাৎ পেশা বদলের সিদ্ধান্ত নেন চীনের নারী চিকিৎসক দং মিন। চিকিৎসা পেশার দীর্ঘ কর্মজীবন পেছনে ফেলে তিন বছর আগে তিনি শুরু করেন ভাপা পুরভরা রুটি বা স্টিমড বান বিক্রির ব্যবসা। নতুন এই পেশায় শুধু সফলতাই পাননি, নিজের ভাষায় আগের চেয়ে অনেক বেশি আনন্দও খুঁজে পেয়েছেন তিনি।

বর্তমানে ৪৮ বছর বয়সী দং মিনের ব্যবসা ভালোভাবেই চলছে। ২০২৩ সালে হুবেই প্রদেশের উহানে প্রথম বানের দোকান খোলেন তিনি। সময়ের সঙ্গে সেই দোকানটি স্থানীয়ভাবে পরিচিত হয়ে ওঠে এবং ব্যবসাও বাড়তে থাকে। এর ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের জুলাই মাসে দ্বিতীয় শাখা চালু করেছেন তিনি।

চাংজিয়াং ডেইলিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দং মিন বলেন, চিকিৎসক হিসেবে কাজ করার সময় প্রায়ই তার মনে হতো চাকরিটি ছেড়ে দেওয়া উচিত। এখন বানের দোকান চালাতে প্রতিদিন ১০ ঘণ্টারও বেশি সময় ব্যস্ত থাকতে হয়, শারীরিকভাবেও ক্লান্তি আসে। কিন্তু তারপরও তিনি নিজেকে অনেক বেশি সুখী মনে করেন এবং এই কাজ ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবেন না।

দং মিন ১৯৯৯ সালে উহান বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল স্কুল থেকে পড়াশোনা শেষ করেন। এরপর শেনজেনে স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। কয়েক বছর সেখানে কাজ করার পর তিনি উহানে ফিরে আসেন এবং মায়ের পরিচালিত একটি বেসরকারি ক্লিনিকের কাজে যুক্ত হন।

পরবর্তীতে তার মা অবসর নেওয়ার পর ক্লিনিকটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর দং মিন পরিবারের সঙ্গে হুবেই প্রদেশের তিয়ানমেনে নিজেদের জন্মস্থানে ফিরে যান। সেখানে একটি ছোট কমিউনিটি হাসপাতালে চিকিৎসক হিসেবে যোগ দেওয়ার পাশাপাশি হাসপাতালের আইনি প্রতিনিধি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

তবে চিকিৎসক হিসেবে কর্মজীবনের শেষ দিকে কাজের চাপ তার কাছে ক্রমেই অসহনীয় হয়ে উঠছিল। দং মিন জানান, রোগী দেখার পাশাপাশি চিকিৎসার বাইরের বিভিন্ন প্রশাসনিক দায়িত্বও তাকে সামলাতে হতো। সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরিদর্শন, হাসপাতাল পরিচালনা এবং রোগী-হাসপাতাল বিরোধের মতো বিষয়ও তার দায়িত্বের মধ্যে ছিল।

Advertisements

দং মিনের ভাষায়, চীনে চিকিৎসক ও রোগীর সম্পর্ক অনেক সময় উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে। কোনো চিকিৎসাসংক্রান্ত বিরোধ দেখা দিলে হাসপাতালের আইনি প্রতিনিধি হিসেবে এর দায়ভারও তাকে নিতে হতো। এসব কারণে চিকিৎসা পেশায় তার ওপর মানসিক চাপ ক্রমেই বাড়ছিল।

অন্যদিকে, বানের ব্যবসার প্রতি তার আগ্রহ তৈরি হয় ২০২৩ সালে। এক বন্ধুর পরিবারের একই ধরনের ব্যবসা দেখে তিনি অনুপ্রাণিত হন। শুরুতে তিনি একটি বানের দোকানে বিনিয়োগ করেন। কিন্তু কিছুদিন পর হঠাৎ সেই দোকানের রাঁধুনি চাকরি ছেড়ে দিলে পরিস্থিতি বদলে যায়। তখন নিজেই বান তৈরির কাজ শেখার সিদ্ধান্ত নেন দং।

প্রথমে নতুন কাজটি তার জন্য সহজ ছিল না। তবে অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি বান তৈরিতে দক্ষ হয়ে ওঠেন। কাজটি করতে গিয়ে তিনি এক ধরনের আনন্দও খুঁজে পান। ধীরে ধীরে নিজের ব্যবসার প্রতি আগ্রহ আরও বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকের চাকরি ছেড়ে পুরোপুরি বানের দোকান পরিচালনায় মনোযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

দং মিনের এই সিদ্ধান্তে শুরুতে তার পরিবার সন্তুষ্ট ছিল না। চীনা সমাজে চিকিৎসকের পেশাকে ঐতিহ্যগতভাবে সম্মানজনক ও মর্যাদাপূর্ণ হিসেবে দেখা হয়। তাই এত বছরের চিকিৎসা পেশা ছেড়ে খাবারের ব্যবসায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত পরিবারের কাছে সহজে গ্রহণযোগ্য হয়নি।

তবে পরিবারের আপত্তির জবাবে দং মিন নিজের জীবন নিয়ে নিজের মতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলেন। তার মতে, জীবনের অনেকটা সময় অন্যদের প্রত্যাশা অনুযায়ী কাটানোর পর এখন তিনি নিজের পছন্দকে গুরুত্ব দিতে চান। বয়স প্রায় ৫০-এর কাছাকাছি চলে আসায় অন্য মানুষ তার সিদ্ধান্তকে কীভাবে দেখছেন, সেটিকে আর তিনি গুরুত্ব দিতে চান না।

সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তার মা ও ভাইও তার সিদ্ধান্তকে সমর্থন করতে শুরু করেন। প্রয়োজনে তারা দোকানের কাজে তাকে সহযোগিতাও করেন।

নিজের অভিজ্ঞতা থেকে দং মিন মনে করেন, জীবনে কোনো সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। তার মতে, জীবনে পরিবর্তন আনার জন্য কখনোই দেরি হয়ে যায় না। যতদিন শারীরিকভাবে কাজ করার সক্ষমতা থাকবে, ততদিন তিনি নিজের বানের দোকান চালিয়ে যেতে চান।

দং মিনের এই পেশা পরিবর্তনের ঘটনা চীনে চিকিৎসকদের কর্মজীবনের চাপ নিয়ে চলমান আলোচনারও একটি উদাহরণ হয়ে উঠেছে। অতিরিক্ত রোগীর চাপ, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, প্রশাসনিক দায়িত্ব এবং রোগী-চিকিৎসক বিরোধের মতো বিষয় দেশটির চিকিৎসকদের মধ্যে শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি তৈরি করছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

চীনে দং মিনের মতো চিকিৎসা পেশা ছেড়ে অন্য ব্যবসায় যাওয়ার আরও ঘটনাও সামনে এসেছে। ২০২৪ সালে ঝেজিয়াং প্রদেশের ইউউ শহরের একটি বড় হাসপাতালে ক্লিনিক্যাল ল্যাবরেটরিতে ১৩ বছর কাজ করা এক চিকিৎসকও চাকরি ছেড়ে রাস্তার পাশে খাবারের দোকান শুরু করেন। তার দাবি, নতুন ব্যবসা থেকে আগের চাকরির তুলনায় বেশি আয় করছেন তিনি। চিকিৎসক থাকাকালে তার মাসিক আয় ছিল ১০ হাজার ইউয়ানের কম, যা প্রায় ১ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ।

চীনের চিকিৎসকদের জন্য পরিচালিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি পেজ ‘শিং লিন ইউয়ান কমিউনিটি’ চিকিৎসকদের পেশা পরিবর্তনের এসব ঘটনাকে বৃহত্তর কর্মপরিবেশের সঙ্গে যুক্ত করেছে। তাদের মতে, চিকিৎসকদের সমস্যা শুধু শারীরিক পরিশ্রমে সীমাবদ্ধ নয়; দীর্ঘদিনের মানসিক চাপও তাদের ওপর প্রভাব ফেলে।

তাদের বক্তব্য, চিকিৎসকদের নিয়মিত চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি নানা ধরনের প্রশাসনিক ও চিকিৎসাবহির্ভূত কাজ সামলাতে হয়। রোগীদের অভিযোগ ও চিকিৎসাসংক্রান্ত বিরোধের ঝুঁকিও তাদের নিতে হয়। দীর্ঘ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের তুলনায় অনেক চিকিৎসকের আয়ও প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে তারা মনে করে।

দং মিনের ক্ষেত্রে অবশ্য পেশা পরিবর্তনের পর নতুন ব্যবসাই তার কাছে জীবনের নতুন অধ্যায় হয়ে উঠেছে। চিকিৎসক হিসেবে দীর্ঘ ২০ বছরের অভিজ্ঞতার পর এখন তিনি নিজের পছন্দের কাজে সময় দিচ্ছেন। ব্যস্ততা ও পরিশ্রম থাকলেও নিজের সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট দং মিনের কাছে সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

Advertisements