যে দুই দ্বীপে বিড়ালই সংখ্যাগরিষ্ঠ

বিশ্বের নানা প্রান্তে বিড়াল মানুষের ঘরের পরিচিত প্রাণী। তবে ভূমধ্যসাগরের দুটি ছোট দ্বীপে বিড়ালের উপস্থিতি এতটাই বেশি যে সেখানে মানুষের সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে তারা। এর একটি হলো ভূমধ্যসাগরের পূর্বাঞ্চলের দ্বীপরাষ্ট্র সাইপ্রাস। অন্যটি স্পেনের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলের কাছে অবস্থিত ছোট্ট দ্বীপ নুয়েভা তাবারকা।
সাইপ্রাসে বেওয়ারিশ বিড়ালের সংখ্যা কত—এ নিয়ে বিভিন্ন হিসাব থাকলেও সাম্প্রতিক এক গবেষণায় পরিস্থিতির ব্যাপকতার কথা উঠে এসেছে। গবেষণা অনুযায়ী, দ্বীপটিতে বেওয়ারিশ বিড়ালের সংখ্যা ২০ লাখের বেশি হতে পারে। বিপরীতে দেশটির জনসংখ্যা ১০ লাখের নিচে। অর্থাৎ মানুষের তুলনায় সেখানে বিড়ালের সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

‘ফ্রন্টিয়ার্স ইন অ্যানিমেল সায়েন্স’ সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণাটি করেছেন জেমি এল ডিলিউ ও হ্যারি একম্যান। গবেষণায় সাইপ্রাস, গ্রিস ও পর্তুগালের ৪৪ জন পেশাজীবী ও স্বেচ্ছাসেবকের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। গবেষকদের মতে, সমন্বিত পরিকল্পনার ঘাটতি, সীমিত সরকারি অর্থায়ন এবং প্রাণী কল্যাণের কাজে স্বেচ্ছাসেবকদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
সাইপ্রাসে মানুষ ও বিড়ালের সম্পর্ক অবশ্য নতুন নয়। প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে প্রায় সাড়ে ৯ হাজার বছর আগের একটি মানব সমাধির পাশে বিড়ালের হাড় পাওয়া গেছে। এ আবিষ্কার থেকে ধারণা করা হয়, দ্বীপটির মানুষের সঙ্গে বিড়ালের সম্পর্ক বহু প্রাচীন।
বিড়াল নিয়ে সাইপ্রাসে একটি প্রচলিত কিংবদন্তিও রয়েছে। কথিত আছে, চতুর্থ শতাব্দীতে সেন্ট হেলেন সাপের উপদ্রব কমাতে দুটি জাহাজভর্তি বিড়াল সাইপ্রাসে নিয়ে এসেছিলেন। ঐতিহাসিকভাবে এই গল্পের সব অংশ নিশ্চিত না হলেও দ্বীপটির সংস্কৃতিতে বিড়ালের দীর্ঘ উপস্থিতির একটি পরিচিত কাহিনি এটি।
বিড়ালের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সাইপ্রাস সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। প্রতিবছর প্রায় ১ লাখ ইউরোর সরকারি অর্থায়নে প্রায় ২ হাজার বিড়ালের বন্ধ্যাকরণ করা সম্ভব হচ্ছিল। তবে বিপুল সংখ্যার তুলনায় এই উদ্যোগ ছিল সীমিত। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ২০২৬ সালে দেশটির ভেটেরিনারি সার্ভিস আরও সমন্বিত বন্ধ্যাকরণ কর্মসূচির পরিকল্পনা করেছে। এতে স্থানীয় প্রশাসন, জেলা প্রাণিকল্যাণ কমিটি, নিবন্ধিত স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং বেসরকারি পশু চিকিৎসাকেন্দ্রকে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিড়ালের সংখ্যা কার্যকরভাবে কমাতে হলে স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগের বদলে দীর্ঘ সময় ধরে ধারাবাহিক কর্মসূচি চালাতে হবে। গবেষকদের প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে সরকারি অর্থায়ন বাড়ানো, জিআইএস প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরিকল্পিতভাবে ‘টিএনআর’ বা ধরো-বন্দি করো, বন্ধ্যাকরণ ও ছেড়ে দেওয়ার কার্যক্রম পরিচালনা এবং স্বেচ্ছাসেবীদের আরও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা দেওয়া। কোনো এলাকায় বিড়ালের বড় একটি অংশকে বন্ধ্যাকরণের আওতায় আনা না গেলে এ ধরনের কর্মসূচির কার্যকারিতা সীমিত হতে পারে বলেও গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
সাইপ্রাসের উষ্ণ আবহাওয়া এবং পর্যটননির্ভর পরিবেশও বিড়ালের বংশবিস্তারে ভূমিকা রাখে। পর্যটকদের ফেলে যাওয়া খাবারসহ সহজলভ্য খাদ্য তাদের টিকে থাকা ও দ্রুত বংশবৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করে। অন্যদিকে পর্যাপ্ত পরিচর্যার অভাবে জন্ম নেওয়া অনেক বিড়ালছানাই মারা যায়। রোগ, খাদ্যের সংকট ও বিষক্রিয়াসহ নানা কারণে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক বিড়ালের মৃত্যু হয় বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
এবার স্পেনের নুয়েভা তাবারকার কথা বলা যাক। অ্যালিক্যান্টে শহরের কাছাকাছি অবস্থিত এই দ্বীপটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১ দশমিক ৮ কিলোমিটার এবং প্রস্থ মাত্র ৪০০ মিটার। স্পেনের সবচেয়ে ছোট স্থায়ী জনবসতিপূর্ণ দ্বীপ হিসেবে পরিচিত নুয়েভা তাবারকায় সারা বছর বসবাস করেন আনুমানিক ৫০ জন মানুষ।

গ্রীষ্মে পর্যটকের ভিড় বাড়লেও বছরের অন্য সময় দ্বীপটি বেশ নিরিবিলি থাকে। ২০২৩ সালের একটি গবেষণায় দেখা যায়, সেখানে স্থায়ী বাসিন্দাদের তুলনায় বিড়ালের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ। ফলে দ্বীপের বিভিন্ন রাস্তাঘাট ও আশপাশের এলাকায় মানুষের পাশাপাশি বিড়ালের উপস্থিতিই বেশি চোখে পড়ে। পর্যটকদের খাবারের প্রতিও বিড়ালগুলোর আগ্রহের কারণে সেখানে খাওয়াদাওয়ার সময় তাদের এড়িয়ে চলাও অনেকের জন্য মজার অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে।
নুয়েভা তাবারকার ইতিহাসও বেশ বৈচিত্র্যময়। অষ্টাদশ শতাব্দীতে তিউনিসিয়ার উপকূলীয় অঞ্চল থেকে আসা জেনোয়িজ শরণার্থীদের বসতি স্থাপনের জন্য স্পেনের রাজা দ্বীপটিতে দুর্গ ও জনপদ নির্মাণের উদ্যোগ নেন। সেই সময়কার পরিকল্পিত রাস্তা ও দুর্গের কিছু নিদর্শন এখনো সেখানে রয়েছে।
পরবর্তীতে দ্বীপটির পরিবেশগত গুরুত্বও স্বীকৃতি পায়। ১৯৮৬ সালে নুয়েভা তাবারকা স্পেনের প্রথম স্বীকৃত সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকার মর্যাদা লাভ করে। ইতিহাস, প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং মানুষের তুলনায় বেশি বিড়ালের উপস্থিতি—সব মিলিয়ে ছোট এই দ্বীপটি এখন পর্যটকদের কাছেও বেশ আকর্ষণীয়।



