২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | রবিবারবাংলা: ১২ আশ্বিন ১৪৩৩
জীবনযাপন

হিল্লা বিয়ে কী? প্রচলিত ধারণা ও ইসলামের বিধানে কতটা পার্থক্য

IMG_5450

ইসলামে বিয়ে পবিত্র ও স্থায়ী বন্ধন হিসেবে বিবেচিত। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ভালোবাসা, দায়িত্ব, পারস্পরিক সম্মান ও শান্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হওয়াই কাম্য। একইভাবে তালাকের ক্ষেত্রেও আবেগের বশবর্তী হয়ে দাম্পত্য সম্পর্ককে খেলায় পরিণত না করার নির্দেশনা রয়েছে। তবে তিন তালাকের পর ‘হিল্লা বিয়ে’ নামে সমাজে প্রচলিত একটি প্রথা নিয়ে রয়েছে নানা ভুল ধারণা।

ফিকহের পরিভাষায় ‘তাহলীল’ হলো এমন বিয়ে, যার উদ্দেশ্য তিন তালাকপ্রাপ্তা নারীকে আগের স্বামীর জন্য পুনরায় হালাল করে দেওয়া। অর্থাৎ তিন তালাকের পর পরিকল্পিতভাবে অন্য একজন পুরুষের সঙ্গে এ উদ্দেশ্যে বিয়ে দেওয়া যে, তিনি কিছুদিন পর স্ত্রীকে তালাক দেবেন এবং এরপর ওই নারী আগের স্বামীর কাছে ফিরে যাবেন। প্রচলিত অর্থে এটিই ‘হিল্লা বিয়ে’ নামে পরিচিত।

তবে তিন তালাকের পর কোনো নারী অন্য পুরুষকে স্বাভাবিকভাবে বিয়ে করে সংসার শুরু করার পর কোনো স্বাভাবিক কারণে সেই বিয়ে ভেঙে গেলে সেটিকে পরিকল্পিত হিল্লা বলা যাবে না।

পবিত্র কোরআনের সুরা বাকারার ২৩০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, তৃতীয়বার তালাকের পর নারী প্রথম স্বামীর জন্য হালাল হবেন না, যতক্ষণ না তিনি অন্য একজন স্বামীকে বিয়ে করেন। এরপর দ্বিতীয় স্বামী তালাক দিলে এবং ইদ্দত শেষ হলে, উভয়ে আল্লাহর সীমারেখা রক্ষা করতে পারবে বলে মনে করলে পুনরায় বিয়ের সুযোগ রয়েছে।

আলেমদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এ আয়াত প্রথম স্বামীর কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য পরিকল্পিতভাবে দ্বিতীয় বিয়ে করানোর নির্দেশ দেয় না। বরং তিন তালাকের পর প্রথম বৈবাহিক সম্পর্কের অবসান এবং পরবর্তী স্বাভাবিক বিবাহের বিধান এতে স্পষ্ট করা হয়েছে।

হানাফি ফিকহের গ্রন্থ ‘আল হিদায়া’তেও উল্লেখ রয়েছে, তিন তালাকপ্রাপ্তা নারী দ্বিতীয় স্বামীর সঙ্গে প্রকৃত দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপন করার পর দ্বিতীয় স্বামী তাকে তালাক দিলে এবং তার ইদ্দত শেষ হলে প্রথম স্বামীর সঙ্গে নতুন করে বিয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ শুধু দ্বিতীয় বিয়ের আকদ সম্পন্ন হলেই প্রথম স্বামীর জন্য ওই নারী হালাল হয়ে যান না।

Advertisements

পরিকল্পিত হিল্লার বিষয়ে হাদিসেও কঠোর সতর্কবাণী এসেছে। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) হিল্লাকারী এবং যার জন্য হিল্লা করা হয়—উভয়ের ব্যাপারে কঠোর নিন্দা করেছেন। এ হাদিস সুনান আবু দাউদ ও জামে তিরমিজিতে বর্ণিত হয়েছে।

এ কারণে ‘এক দিনের হিল্লা’, ‘এক রাতের হিল্লা’ বা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সাজানো কোনো বিয়েকে ইসলামের বিধান বলা যায় না। দ্বিতীয় বিয়েটি প্রকৃত দাম্পত্য সম্পর্কের উদ্দেশ্যে হতে হবে। দ্বিতীয় স্বামীর ওপর স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতাও নেই। স্বাভাবিকভাবে দ্বিতীয় বিবাহ সংঘটিত হয়ে সংসার চললে সেই সংসারই চলবে।

পরবর্তীতে দ্বিতীয় বিবাহ কোনো স্বাভাবিক কারণে ভেঙে গেলে এবং ইদ্দত শেষ হওয়ার পর প্রথম স্বামীর সঙ্গে নতুন করে বিয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে। কিন্তু প্রথম স্বামীর কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্য যদি শুরু থেকেই দ্বিতীয় বিয়ের ভিত্তি হয়, তাহলে সেটি পরিকল্পিত তাহলীলের অন্তর্ভুক্ত।

ইসলাম বিবাহকে সাময়িক চুক্তি বা তালাকের পরিণতি এড়ানোর কৌশল হিসেবে ব্যবহারের অনুমতি দেয় না। তাই অর্থের বিনিময়ে, সামাজিক চাপে কিংবা পূর্বপরিকল্পিত চুক্তির মাধ্যমে কোনো নারীকে অন্য পুরুষের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া ইসলামের বিবাহব্যবস্থার উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

তবে বাস্তব কোনো ঘটনায় তিন তালাক হয়েছে কি না, কী শব্দে তালাক দেওয়া হয়েছে, আগে কোনো তালাক হয়েছিল কি না কিংবা একসঙ্গে তিন তালাক উচ্চারণ করা হয়েছে কি না—এসব বিষয়ের ওপর শরয়ি বিধান ভিন্ন হতে পারে। তাই এমন পরিস্থিতিতে প্রচলিত ‘হিল্লা করিয়ে নেওয়ার’ পরামর্শ অনুসরণ না করে পুরো ঘটনা নির্ভরযোগ্য মুফতির কাছে তুলে ধরে ফতোয়া নেওয়া উচিত।

তিন তালাকের বিষয়টি গুরুতর হওয়ায় তালাকের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পরিবার, সালিশ ও সংশোধনের বৈধ পথগুলো বিবেচনা করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পিত হিল্লা বিয়ের মাধ্যমে আল্লাহর নির্ধারিত বিধানকে কৃত্রিমভাবে পাশ কাটানোর চেষ্টা ইসলামের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

Advertisements