২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | রবিবারবাংলা: ১২ আশ্বিন ১৪৩৩
নারী

পুরুষের ঘড়ি ‘কাজের’, নারীর ঘড়ি কেন ‘সাজের’

jw_app_square_banners_17_b78ed58b-8f31-4c26-88e9-381735fc5a31

একটি ঘড়ি মূলত সময় দেখার যন্ত্র। কিন্তু ঘড়ির নকশা, আকার এবং বাজারজাতকরণের ইতিহাস দেখলে বোঝা যায়, নারী ও পুরুষের জন্য একই জিনিসকে অনেক সময় ভিন্ন সামাজিক অর্থ দেওয়া হয়েছে। পুরুষের ঘড়িকে দীর্ঘদিন ধরে কাজ, সময়ানুবর্তিতা, পেশা ও সক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে; অন্যদিকে নারীর ঘড়িকে সৌন্দর্য, পোশাক ও অলংকারের অংশ হিসেবে উপস্থাপনের প্রবণতা ছিল বেশি।

এই পার্থক্যের পেছনে শুধু ঘড়ির নকশা নয়, সমাজে নারী-পুরুষের ভূমিকা সম্পর্কে দীর্ঘদিনের ধারণাও কাজ করেছে। ঐতিহাসিকভাবে পুরুষকে পরিবারের উপার্জনকারী, কর্মক্ষেত্রে সক্রিয় এবং বাইরের জগতের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি হিসেবে দেখা হয়েছে। ফলে সময় জানা ও সময় মেনে চলার প্রয়োজনীয়তাকেও পুরুষের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। বিপরীতে নারীর ভূমিকা দীর্ঘদিন ঘর, পরিবার ও সন্তান পালনের সঙ্গে বেশি যুক্ত ছিল। ফলে নারীর ব্যবহার্য অনেক পণ্যেই কার্যকারিতার পাশাপাশি সৌন্দর্য ও সাজসজ্জাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ঘড়ির ইতিহাসেও এর প্রতিফলন দেখা যায়। ইউরোপে কয়েক শতক আগে থেকেই নারীদের ব্যবহারের জন্য তৈরি কিছু ঘড়ি অলংকারের সঙ্গে যুক্ত ছিল। ঘড়ি তখন শুধু সময় জানানোর যন্ত্র ছিল না; মূল্যবান ধাতু, পাথর ও নকশার মাধ্যমে সেটি ব্যক্তিগত সাজের অংশ হয়ে উঠেছিল। অন্যদিকে পুরুষদের জন্য তৈরি ঘড়ির ক্ষেত্রে ব্যবহারিক বৈশিষ্ট্য, নির্ভুলতা ও বিভিন্ন কাজের উপযোগিতার ওপর ক্রমে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।

এই জায়গা থেকেই ‘পুরুষের ঘড়ি কাজের জন্য, নারীর ঘড়ি সাজের জন্য’—এমন একটি সামাজিক ধারণা তৈরি হতে পারে। অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে নারীরা ঘড়িকে ব্যবহারিক প্রয়োজনে ব্যবহার করেননি বা পুরুষেরা ঘড়িকে অলংকার হিসেবে ব্যবহার করেন না। বরং বাজার ও সংস্কৃতিতে কোন লিঙ্গের কাছে কোন বৈশিষ্ট্যকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে, সেটিই এখানে মূল বিষয়।

বাংলাদেশের বিজ্ঞাপন ও ভোক্তা সংস্কৃতি নিয়ে ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণাতেও দেখা গেছে, বিজ্ঞাপন একদিকে প্রচলিত নারী-পুরুষের ভূমিকার ধারণাকে শক্তিশালী করতে পারে, আবার অন্যদিকে নারীদের প্রচলিত সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করার বার্তাও দিতে পারে। গবেষণাটিতে বিশেষভাবে দেখানো হয়েছে, নারীদের পণ্য ও বিজ্ঞাপনের সঙ্গে সৌন্দর্য, গৃহস্থালি দায়িত্ব এবং পরিবারের যত্নের ধারণা কীভাবে যুক্ত করা হয়।

ঘড়ির ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। যদি পুরুষের ঘড়ির বিজ্ঞাপনে অফিস, ব্যবসা, ভ্রমণ, খেলাধুলা, অভিযান বা সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার দৃশ্য বেশি দেখা যায়, আর নারীর ঘড়িকে পোশাক, সৌন্দর্য, পার্টি বা অলংকারের সঙ্গে বেশি দেখানো হয়, তাহলে ধীরে ধীরে একটি বার্তা তৈরি হয়—সময় যেন পুরুষের জন্য কাজ ও সাফল্যের বিষয়, আর নারীর জন্য সাজসজ্জার বিষয়।

Advertisements

এখানে সমস্যাটি ঘড়ির ছোট-বড় হওয়ার মধ্যে নয়। ছোট ঘড়ি অনেক নারীর কবজিতে আরামদায়ক হতে পারে, আবার কোনো নারী বড় ঘড়িও পছন্দ করতে পারেন। একইভাবে কোনো পুরুষ ছোট ঘড়ি পরতে পারেন। তাই শুধু ঘড়ির আকার দেখে বৈষম্য বলা যায় না। বরং প্রশ্ন হলো, কেন একটি নির্দিষ্ট নকশা বা ব্যবহারকে লিঙ্গের সঙ্গে বাধ্যতামূলকভাবে যুক্ত করা হবে?

সময়ের গুরুত্ব নারী-পুরুষের জন্য আলাদা নয়। একজন নারীও অফিসে যান, ব্যবসা করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন, ভ্রমণ করেন, খেলাধুলা করেন, নেতৃত্ব দেন এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করেন। তাই তার ঘড়ি যদি শুধু সৌন্দর্যের অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়, তাহলে সেটি তার বাস্তব জীবনের বহুমাত্রিক ভূমিকার একটি অংশকে আড়াল করে।

আবার এটাও সত্য যে সৌন্দর্য বা অলংকার হিসেবে ঘড়ি পরার মধ্যে কোনো সমস্যা নেই। একজন নারী যদি নান্দনিকতার জন্য ছোট, অলংকারঘন ঘড়ি বেছে নেন, সেটি তাঁর স্বাধীন পছন্দ। সমস্যাটি তখনই তৈরি হয়, যখন সমাজ ধরে নেয়—নারীর ঘড়ি এমনই হতে হবে।

আজ সেই ধারণাও বদলাচ্ছে। বড় ঘড়ি নারীদের মধ্যেও জনপ্রিয় হচ্ছে এবং ঘড়ির আকারকে শুধু নারী বা পুরুষের পরিচয়ের সঙ্গে বেঁধে দেখার প্রবণতা কিছুটা কমছে। ফলে ঘড়ি ধীরে ধীরে আবার তার মূল পরিচয়ে ফিরছে—এটি যার প্রয়োজন, যার পছন্দ এবং যার কবজিতে স্বাচ্ছন্দ্য, তারই।

শেষ পর্যন্ত ঘড়ির কাঁটা নারী-পুরুষ আলাদা করে চলে না। সময়ও কাউকে আলাদা সুযোগ দেয় না। তাহলে সময় দেখার যন্ত্রটির নকশা ও অর্থ কেন এতটা লিঙ্গনির্ভর হবে?

সম্ভবত এখন সময় এসেছে ঘড়িকে ‘পুরুষের কাজের জিনিস’ কিংবা ‘নারীর সাজের জিনিস’ হিসেবে না দেখে ব্যক্তির প্রয়োজন, পছন্দ ও পরিচয়ের অংশ হিসেবে দেখার।

Advertisements