১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | রবিবারবাংলা: ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
বিবিধ

জিন্নাহকে ‘গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায়’ স্মরণ, সমালোচনার মুখে ইনকিলাব মঞ্চ

38ab0b0e0447dc81f77b2ff18b67fae9-6aa6572bd7374

মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে স্মরণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেওয়ার পর তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে ‘ইনকিলাব মঞ্চ’। পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রথম গভর্নর জেনারেল জিন্নাহর ৭৮তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে সংগঠনটির পক্ষ থেকে প্রকাশিত একটি পোস্ট ঘিরেই শুরু হয়েছে এই বিতর্ক।

গত শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) রাতে ইনকিলাব মঞ্চের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে জিন্নাহর একটি সাদাকালো ছবি প্রকাশ করা হয়। পোস্টে তার জন্ম ও মৃত্যুর তারিখ উল্লেখ করে তাকে ‘গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায়’ স্মরণ করা হয়। বার্তায় জিন্নাহকে উপমহাদেশের অন্যতম রাজনীতিবিদ, দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রবক্তা, পাকিস্তান রাষ্ট্রের অন্যতম স্বপ্নদ্রষ্টা ও দেশটির প্রথম গভর্নর জেনারেল হিসেবে উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে তাকে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের একজন প্রভাবশালী নেতা হিসেবেও তুলে ধরা হয়।

ইনকিলাব মঞ্চের এই স্মরণবার্তা প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা। বিশেষ করে বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে জিন্নাহর রাজনৈতিক ভূমিকার সম্পর্ক তুলে ধরে প্রশ্ন তুলছেন সমালোচকেরা।

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ১৯৪৮ সালের মার্চে পূর্ব বাংলায় সফরে এসে জিন্নাহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল এবং রেসকোর্স ময়দানের সমাবেশে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে অবস্থান নেন। তার বক্তব্যের প্রতিবাদে তৎকালীন ছাত্রসমাজ ‘নো, নো’ স্লোগান দেয়। পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নটি বাঙালির রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার আদায়ের অন্যতম প্রধান ইস্যুতে পরিণত হয়।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সেই দাবি রক্তাক্ত অধ্যায়ে প্রবেশ করে। ভাষার অধিকারের আন্দোলন ধীরে ধীরে বাঙালির স্বাধিকার ও রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের বৃহত্তর সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত হয়, যার চূড়ান্ত পরিণতি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ।

এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট সামনে রেখেই ইনকিলাব মঞ্চের পোস্টের সমালোচনা করছেন অনেকে। তাদের বক্তব্য, বাঙালির ভাষা ও রাজনৈতিক অধিকার প্রশ্নে বিতর্কিত ভূমিকা থাকা একজন নেতাকে ‘গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায়’ স্মরণ করা বাংলাদেশের ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

সমালোচকদের কেউ কেউ আরও বলছেন, পাকিস্তান রাষ্ট্রের কাঠামোর মধ্য দিয়ে তৎকালীন পূর্ব বাংলার মানুষের ওপর যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বৈষম্য তৈরি হয়েছিল, তার ধারাবাহিক পরিণতিই শেষ পর্যন্ত বাঙালির স্বাধীনতার সংগ্রাম। সেই ইতিহাসের আলোকে জিন্নাহকে শ্রদ্ধা জানানোর রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

অন্যদিকে, জিন্নাহর রাজনৈতিক ভূমিকার মূল্যায়ন করতে গিয়ে তার ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন ও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্বের বিষয়টিও সামনে আসে। ফলে একটি ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে স্মরণ করা নিয়ে তৈরি হওয়া এই বিতর্ক কেবল একটি ফেসবুক পোস্টকে ঘিরে নয়; বরং বাংলাদেশের ইতিহাস, ভাষা আন্দোলন, পাকিস্তান রাষ্ট্রের উত্তরাধিকার এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা—এসব প্রশ্নকেও নতুন করে আলোচনায় এনেছে।

ইনকিলাব মঞ্চের ওই পোস্টকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে পোস্টটির বিষয়ে অতিরিক্ত কোনো ব্যাখ্যা বা অবস্থান পরিবর্তনের ঘোষণা এসেছে কি না, তা নিয়েও আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

Advertisements