দারুওয়ালা থেকে পুনাওয়ালা, পার্সিদের পদবি কেন এত বিচিত্র?

ভারতীয় পার্সি সম্প্রদায়ের পদবিগুলো অন্য অনেক সম্প্রদায়ের তুলনায় বেশ আলাদা। দারুওয়ালা, পুনাওয়ালা, ইরানি কিংবা ফরহাদির মতো পদবির পেছনে রয়েছে পেশা, বসবাসের স্থান, পূর্বপুরুষের পরিচয় এমনকি নানা অদ্ভুত ডাকনামের ইতিহাস। তবে পার্সিদের মধ্যে শুরু থেকেই পদবি ব্যবহারের প্রচলন ছিল না।
ইতিহাসবিদদের মতে, সপ্তম শতকে পারস্যে আরব-ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠার পর ধর্মীয় নিপীড়ন থেকে বাঁচতে পার্সিরা ভারতে আশ্রয় নেন। বিশেষ করে গুজরাটে তাদের বড় একটি অংশ বসতি গড়ে। ষোড়শ শতকের পার্সিয়ান কাব্য ‘কিসসা-ই-সঞ্জান’-এ বলা হয়েছে, স্থানীয় রাজা জাদি রানার কাছে আশ্রয় নেওয়ার সময় পার্সিরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, দুধে চিনি মিশে যাওয়ার মতো তারা স্থানীয় সমাজ ও সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে যাবে।
এরপর এক হাজার বছরেরও বেশি সময় পার্সিরা মূলত নিজেদের নামেই পরিচিত ছিলেন। ব্রিটিশ শাসনামলে আদমশুমারির সময় সবার জন্য পদবি ব্যবহারের প্রয়োজন দেখা দিলে পার্সি পরিবারগুলো নিজেদের পরিচয় অনুযায়ী পদবি তৈরি করতে শুরু করে।
অনেক পদবি তৈরি হয় পেশার ভিত্তিতে। যেমন মদ বিক্রেতাদের মধ্যে ‘দারুওয়ালা’ এবং পুনে শহরের বাসিন্দাদের মধ্যে ‘পুনাওয়ালা’ পদবির প্রচলন হয়। প্রত্নতাত্ত্বিক ও ইতিহাসবিদ ড. কুরুশ এফ দালালের মতে, বড় শহরগুলোতে মানুষের পেশা ও কাজের ধরন থেকেই অনেক পদবির জন্ম হয়েছিল।
তবে পার্সিদের বিচিত্র পদবি নিয়ে প্রচলিত কিছু গল্পের সবই সত্য নয়। যেমন ‘সোডাবোটলওপেনারওয়ালা’ নামে একটি পদবি নিয়ে অনেক কথা শোনা গেলেও বাস্তবে এমন কোনো পদবি ছিল না; এটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। অন্যদিকে ব্রিটিশ সেনাদের কাজে যুক্ত এক ব্যক্তির নাম থেকে ‘বামসাকারওয়ালা’ পদবির উৎপত্তি হয়েছিল বলে জানা যায়। সিনেমার প্রজেক্টর পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ‘ওয়ার্কিংবক্সওয়ালা’ বলা হতো, যা ‘ওয়ার্কিং বক্স’ নামের একটি প্রজেক্টর কোম্পানির নাম থেকে এসেছে।
ইরান থেকে ভারতে আসা অনেক পরিবার ‘ইরানি’ পদবি গ্রহণ করে। আবার পরিবারের ভারতে আসা প্রথম পূর্বপুরুষের নাম থেকেও পদবি তৈরি হয়েছে। এর উদাহরণ ‘ফরহাদি’। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও সামাজিক পরিচয় থেকেও কিছু পদবির জন্ম হয়েছে। কাওয়াসজি জাহাঙ্গীর সহজে অর্থ ধার দেওয়ার কারণে ‘রেডিমানি’ উপাধি পেয়েছিলেন, যা পরে পারিবারিক পদবিতে পরিণত হয়। রাজস্ব ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত সম্মানসূচক উপাধি থেকে ‘পার্সি দেশমুখ’ পদবিরও উৎপত্তি।
তবে সময়ের সঙ্গে অনেক পুরোনো পদবি হারিয়েও গেছে। ‘গোরখোড়ু’, যার অর্থ কবর খননকারী, কিংবা গুজরাটের একটি বাঁধের পানিতে হারিয়ে যাওয়া গ্রামের নাম থেকে তৈরি ‘কামোদ’—এ ধরনের কিছু পদবি এখন আর তেমন ব্যবহৃত হয় না।
আবার কয়েকটি পদবির উৎস এখনো রহস্যে ঘেরা। ‘জামুজি’ পদবির উৎপত্তি নিয়েও রয়েছে নানা আলোচনা। সাবেক ক্যাপ্টেন রোহিন্টন জামুজি একবার লন্ডনে এক জাপানি নারীর কাছ থেকে জানতে পারেন, ‘জামুজি’ একটি জাপানি শব্দ, যার অর্থ ‘বণিক’। ধারণা করা হয়, ব্রিটিশ শাসনেরও আগে জাপানের সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগাযোগের সূত্রে এই পদবির উৎপত্তি হয়ে থাকতে পারে।
সাধারণত পার্সি পদবির শেষে ‘ওয়ালা’ বা ‘জি’ যুক্ত থাকে। জাতপ্রথার প্রচলন না থাকা এই সম্প্রদায়ে পদবিগুলো মূলত পারিবারিক ইতিহাস ও পূর্বপুরুষদের পরিচয়ের স্মারক হিসেবে কাজ করে। কখনো পেশা, কখনো বাসস্থান, আবার কখনো অদ্ভুত কোনো ডাকনাম—বিভিন্ন উৎস থেকে তৈরি এসব পদবি আজও পার্সি সম্প্রদায়ের ইতিহাস ও সংস্কৃতির এক মজার জানালা হয়ে আছে।



