বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬
নারী

নারীবান্ধব পিংক বাসে উপেক্ষিত প্রতিবন্ধী নারীরা

6a2a9b925ec0d

নারীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে রাজধানীতে বিশেষ পরিবহন হিসেবে পিংক বাস চালু করা হলেও এতে প্রতিবন্ধী নারীদের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। রাজধানীর বিভিন্ন রুটে চলাচল করা ১০টি পিংক বাসের একটিও প্রতিবন্ধী নারীদের জন্য উপযোগী নয় বলে জানিয়েছে উইমেন উইথ ডিজঅ্যাবিলিটিস ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (ডব্লিউডিডিএফ)।

সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নারীবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে প্রতিবন্ধী নারীদেরও সমানভাবে বিবেচনায় নিতে হবে। তাদের বাদ দিয়ে কোনো উদ্যোগকে প্রকৃত অর্থে অন্তর্ভুক্তিমূলক বলা যায় না। প্রতিবন্ধী নারীদের জন্য প্রবেশগম্য ও নিরাপদ পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা না হলে নারীবান্ধব গণপরিবহনের উদ্দেশ্যও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হবে না।

বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) রাজধানীর ডেইলি স্টার সেন্টারের আজিমুর রহমান কনফারেন্স হলে ‘প্রতিবন্ধী নারী ও কিশোরীর অন্তর্ভুক্তিমূলক সেবা নিশ্চিতকরণ’ বিষয়ক এক সেমিনারে এসব কথা বলা হয়। প্রতিবন্ধী নারীদের অধিকার ও ক্ষমতায়নের জন্য কাজ করা সংগঠন উইমেন উইথ ডিজঅ্যাবিলিটিস ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (ডব্লিউডিডিএফ) এ সেমিনারের আয়োজন করে।

সেমিনারে মূল নিবন্ধ উপস্থাপন করেন ডব্লিউডিডিএফের কর্মসূচি সহসমন্বয়কারী শারমিন আক্তার দোলন। তিনি বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে কাজ করার ম্যান্ডেট থাকলেও অনেক উদ্যোগে তাঁদের যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে না। এর পেছনে বাজেট বা সময়ের সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে। তবে কোনো উদ্যোগকে কার্যকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে হলে পরিকল্পনার শুরু থেকেই প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রয়োজন বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।

পিংক বাসের উদাহরণ তুলে ধরে শারমিন আক্তার দোলন বলেন, রাজধানীতে বর্তমানে ১০টি পিংক বাস চলাচল করছে। কিন্তু এসব বাসের একটিও প্রতিবন্ধীবান্ধব নয়, বিশেষ করে প্রতিবন্ধী নারীদের জন্য কোনো বাসই যথাযথভাবে উপযোগী করা হয়নি। অথচ প্রতিবন্ধী নারীদের অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের সংখ্যা কম নয় এবং সমাজের অন্যান্য নারীর মতো তাঁদেরও নিরাপদ ও সহজ যাতায়াতের অধিকার রয়েছে।

সেমিনারে প্রতিবন্ধী নারীদের সংখ্যা ও তাঁদের শনাক্তকরণ নিয়ে বিভিন্ন জরিপ ও জনশুমারির তথ্যও তুলে ধরা হয়। জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিবন্ধী পুরুষের সংখ্যা ১৩ লাখ ৩৪ হাজার ১০৫ এবং প্রতিবন্ধী নারীর সংখ্যা ১০ লাখ ২৭ হাজার ৪৯৯। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জরিপ ২০২১ অনুযায়ী, প্রতিবন্ধী পুরুষের সংখ্যা ২৬ লাখ ৮০ হাজার এবং নারী ১৯ লাখ ৩০ হাজার।

Advertisements

অন্যদিকে প্রতিবন্ধিতা শনাক্তকরণ জরিপে প্রতিবন্ধী পুরুষের সংখ্যা ২১ লাখ ৯৭ হাজার এবং নারীর সংখ্যা ১৪ লাখ ৩৮ হাজার ৫৮১। এসব পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশের সাধারণ জনসংখ্যায় নারীর সংখ্যা পুরুষের তুলনায় বেশি হলেও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তে নারীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম।

সেমিনারে বলা হয়, প্রতিবন্ধী নারীর সংখ্যা বাস্তবের তুলনায় কম দেখানোর পেছনে বিভিন্ন সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কারণ থাকতে পারে। প্রতিবন্ধিতা শনাক্ত করার ক্ষেত্রে ঘাটতি, পরিবারে প্রতিবন্ধিতার বিষয়টি প্রকাশ না করার প্রবণতা এবং সামাজিক কুসংস্কার এর অন্যতম কারণ হতে পারে। অনেক পরিবার সামাজিক লজ্জা বা নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে পরিবারের কোনো সদস্যের প্রতিবন্ধিতার বিষয়টি প্রকাশ করতে চায় না। ফলে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন জরিপে প্রকৃত সংখ্যা উঠে না আসার সম্ভাবনা থাকে।

বক্তারা বলেন, প্রতিবন্ধী নারীদের প্রকৃত সংখ্যা ও প্রয়োজন সম্পর্কে সঠিক তথ্য না থাকলে তাঁদের জন্য প্রয়োজনীয় সেবা ও সহায়তা নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়ে। তাই প্রতিবন্ধী নারীদের সঠিকভাবে শনাক্ত করার পাশাপাশি তাঁদের জীবনযাত্রা, চলাচল, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তার বিষয়গুলোকে পরিকল্পনার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।

সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ আবু ইউছুফ বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে আয়োজিত বিভিন্ন আলোচনা বা অনুষ্ঠানে শুধু পরিচিত ও প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিদের বক্তব্যের সুযোগ দিলেই হবে না। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অনুষ্ঠানে নিয়ে এসে তাঁদের বাস্তব অভিজ্ঞতা, সমস্যা ও প্রত্যাশার কথা সরাসরি শুনতে হবে।

তিনি বলেন, প্রকৃত পরিবর্তন আনতে হলে যারা সেবা ও অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, তাঁদের কণ্ঠস্বরকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। নীতিনির্ধারণ ও সেবা পরিকল্পনার ক্ষেত্রে তাঁদের অভিজ্ঞতা সরাসরি বিবেচনায় নেওয়া হলে বাস্তবভিত্তিক ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা সম্ভব হবে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য প্রবেশগম্যতা বা অ্যাক্সেসিবিলিটিকে শুধু একটি ভবনকেন্দ্রিক বিষয় হিসেবে দেখলে হবে না। একটি শহরের নগর-পরিকল্পনা, সড়ক, ফুটপাত, গণপরিবহন এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সেবা—সব ক্ষেত্রেই প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন, কোনো সেবা গ্রহণের শুরু থেকে শেষ ধাপ পর্যন্ত ‘এন্ড-টু-এন্ড অ্যাক্সেসিবিলিটি’ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। নগর-পরিকল্পনার মৌলিক মানদণ্ডের মধ্যেই প্রতিবন্ধী নারীসহ বিভিন্ন ধরনের ব্যবহারকারীর নির্বিঘ্ন চলাচলের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। শুধু একটি ভবনে র‌্যাম্প তৈরি করলেই প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত হয় না; বাসা থেকে বের হওয়া, ফুটপাত ব্যবহার, সড়ক পার হওয়া, গণপরিবহনে ওঠা এবং গন্তব্যে পৌঁছানো—পুরো যাত্রাপথই প্রতিবন্ধীবান্ধব হতে হবে।

সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন সাইট সেভার্সের কান্ট্রি ডিরেক্টর অমৃতা রেজিনা রোজারিও, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনামসহ অন্যরা।

শাহীন আনাম বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা দয়া বা করুণাভিত্তিক কোনো ব্যবস্থা চান না। তাঁরা অধিকারভিত্তিক ও প্রতিবন্ধীবান্ধব একটি ব্যবস্থা চান। এমন একটি ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ প্রয়োজন, যেখানে প্রত্যেককে তার সক্ষমতা অনুযায়ী সুযোগ দেওয়া হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সহযোগিতার ব্যবস্থা থাকবে।

তিনি বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠান যদি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের দক্ষতা নেই বলে তাদের সুযোগ দিতে না চায়, তাহলে সেই দক্ষতা তৈরির দায়িত্ব কার—এ প্রশ্নও বিবেচনায় নিতে হবে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের দক্ষতা উন্নয়নের দায়িত্ব রাষ্ট্রের এবং এতে কোনো সন্দেহ নেই। একই সঙ্গে তাঁদের পাশে দাঁড়ানো এবং বৈষম্যহীন পরিবেশ তৈরি করাও সমাজের দায়িত্ব।

সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য দেন ডব্লিউডিডিএফের নির্বাহী পরিচালক আশরাফুন নাহার মিষ্টি। সভাপতিত্ব করেন সংগঠনটির চেয়ারপারসন শিরিন আখতার।

এ ছাড়া অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সেন্টার ফর ডিজঅ্যাবিলিটি ইন ডেভেলপমেন্টের অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর আনিকা রহমান লিপি, ডিজিটাল প্রবেশগম্যতা বিশেষজ্ঞ ভাস্কর ভট্টাচার্য, অ্যাক্সেস বাংলাদেশের চেয়ারপারসন মহুয়া পালসহ বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

সেমিনারে বক্তারা বলেন, নারীদের জন্য নিরাপদ পরিবহন নিশ্চিত করার উদ্যোগ তখনই প্রকৃত অর্থে সফল হবে, যখন প্রতিবন্ধী নারীরাও সেই সেবার সমান সুবিধা পাবেন। তাই ভবিষ্যতে পিংক বাসসহ সব ধরনের গণপরিবহন ও নগরসেবার পরিকল্পনা করার সময় প্রতিবন্ধী নারী ও কিশোরীদের প্রয়োজনকে শুরু থেকেই গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তারা।

Advertisements