সেরেনা থেকে ব্যবসায়ী, বিতর্ক পেরিয়ে শতকোটি টাকার মালিক ব্লেক

আজ ২৫ আগস্ট হলিউড অভিনেত্রী ব্লেক লাইভলির জন্মদিন। ১৯৮৭ সালের এই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেসে জন্ম তাঁর। ৩৯ বছরে পা দিলেন এই অভিনেত্রী। অভিনয়ের পাশাপাশি প্রযোজনা, ব্যবসা ও ফ্যাশনেও নিজের আলাদা পরিচয় তৈরি করেছেন তিনি। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ‘ইট এন্ডস উইথ আস’ ছবিকে ঘিরে জাস্টিন বালডোনির সঙ্গে আইনি লড়াই তাকে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
ব্লেক লাইভলির নাম বললেই অনেকের মনে পড়ে ‘গসিপ গার্ল’-এর সেরেনা ভ্যান ডার উডসেনকে। নিউইয়র্কের অভিজাত পরিবারের আত্মবিশ্বাসী, বেপরোয়া ও ফ্যাশনসচেতন সেই তরুণীর চরিত্র তাকে রাতারাতি আন্তর্জাতিক তারকায় পরিণত করে। তবে সেরেনার জনপ্রিয়তার বাইরে গিয়ে পরবর্তী সময়ে নিজের আলাদা ক্যারিয়ারও গড়ে তুলেছেন ব্লেক।
অভিনয়ের পরিবারে বেড়ে ওঠা
ব্লেক লাইভলির জন্মনাম ব্লেক এলেন্ডার ব্রাউন। তার বাবা আর্নি লাইভলি ছিলেন অভিনেতা ও পরিচালক এবং মা এলেইন লাইভলি কাজ করতেন ট্যালেন্ট স্কাউট হিসেবে। পরিবারের অন্য সদস্যদেরও বিনোদনজগতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল।
শৈশব থেকেই মা–বাবার অভিনয়ের ক্লাসে যাতায়াত করতেন ব্লেক। তাকে একা বাড়িতে না রেখে মা–বাবা নিজেদের সঙ্গে ক্লাসে নিয়ে যেতেন। ফলে ছোট বয়সেই অভিনয়ের বিভিন্ন কৌশল ও পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত হয়ে ওঠেন তিনি।

তবে ছোটবেলায় অভিনয়কে পেশা হিসেবে নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল না ব্লেকের। পড়াশোনা করে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার ইচ্ছা ছিল তার। মাত্র ১০ বছর বয়সে বাবার পরিচালনায় ‘স্যান্ডম্যান’ ছবিতে অভিনয়ের মাধ্যমে পর্দায় অভিষেক হলেও তখন সেটিকে ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারের শুরু হিসেবে দেখেননি তিনি।
‘সিস্টারহুড’ থেকে সেরেনা
২০০৫ সালে ‘দ্য সিস্টারহুড অব দ্য ট্রাভেলিং প্যান্টস’ ছবিতে ব্রিজেট ভ্রিল্যান্ড চরিত্রে অভিনয় করে নজর কাড়েন ব্লেক। ছবিটি তাকে তরুণ দর্শকদের কাছে পরিচিত করে তোলে। এরপর ‘অ্যাকসেপ্টেড’ ও ‘এলভিস অ্যান্ড অ্যানাবেল’-এর মতো ছবিতে কাজ করেন তিনি।
তবে তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় বাঁক আসে ২০০৭ সালে ‘গসিপ গার্ল’ দিয়ে। সিরিজটিতে সেরেনা ভ্যান ডার উডসেন চরিত্রে অভিনয় করেন ব্লেক। ২০১২ সালে সিরিজটির ছয় মৌসুমের যাত্রা শেষ হলেও এর আগেই সেরেনা হয়ে ওঠেন পপ সংস্কৃতির অন্যতম আলোচিত চরিত্র।
সেরেনার পোশাক, সম্পর্ক ও জীবনযাপন নিয়ে দর্শকদের আগ্রহের পাশাপাশি ব্লেকের ব্যক্তিগত ফ্যাশন সেন্সও তাকে হলিউডের অন্যতম স্টাইল আইকনে পরিণত করে।
বড় পর্দায় আলাদা পরিচয়
‘গসিপ গার্ল’-এর পাশাপাশি সিনেমাতেও নিয়মিত কাজ করেছেন ব্লেক। ‘দ্য সিস্টারহুড অব দ্য ট্রাভেলিং প্যান্টস ২’, ‘দ্য টাউন’, ‘নিউইয়র্ক, আই লাভ ইউ’ ও ‘দ্য প্রাইভেট লাইভস অব পিপ্পা লি’-এর মতো ছবিতে অভিনয় করেন তিনি।
২০১১ সালে ‘গ্রিন ল্যান্টার্ন’ ছবিতে রায়ান রেনল্ডসের বিপরীতে অভিনয় করেন ব্লেক। ছবিটি প্রত্যাশিত সাফল্য না পেলেও ব্যক্তিজীবনে এটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই ছবির সেটেই রায়ানের সঙ্গে তার সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়। ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে বিয়ে করেন তারা। বর্তমানে তাদের চার সন্তান।
‘গসিপ গার্ল’ শেষ হওয়ার পর নিজেকে চলচ্চিত্র অভিনেত্রী হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করেন ব্লেক। ‘দ্য এজ অব অ্যাডালিন’, ‘দ্য শ্যালোস’, ‘ক্যাফে সোসাইটি’ ও ‘অল আই সি ইজ ইউ’-এর মতো ছবিতে ভিন্ন ধরনের চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি।
২০১৬ সালের ‘দ্য শ্যালোস’-এ হাঙরের আক্রমণে সমুদ্রে আটকে পড়া এক সার্ফারের চরিত্রে প্রায় একাই ছবির বড় অংশ সামলান ব্লেক। ২০১৮ সালের ‘আ সিম্পল ফেভার’-এ রহস্যময় এমিলি নেলসন চরিত্রেও প্রশংসা পান তিনি। ২০২৫ সালে ছবিটির সিক্যুয়েল ‘অ্যানাদার সিম্পল ফেভার’-এও ফিরে আসেন অভিনেত্রী।

অভিনয়ের পাশাপাশি ব্যবসা
ব্লেক লাইভলির পরিচয় শুধু অভিনেত্রী হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়। ২০১৪ সালে ‘প্রিজার্ভ’ নামে একটি ডিজিটাল ম্যাগাজিন ও ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম চালু করেন তিনি। লাইফস্টাইল, ফ্যাশন ও হাতে তৈরি পণ্যকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা উদ্যোগটি অবশ্য বেশিদিন টেকেনি। ২০১৫ সালে সেটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।
‘প্রিজার্ভ’ নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। এর একটি ফ্যাশন সম্পাদকীয়তে যুক্তরাষ্ট্রের গৃহযুদ্ধ-পূর্ব দক্ষিণাঞ্চলের নান্দনিকতা ব্যবহারের সমালোচনা করেন অনেকে। তাদের অভিযোগ ছিল, এতে দাসপ্রথার সঙ্গে যুক্ত একটি সময়কে অতিরিক্ত রোমান্টিকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
২০২১ সালে ‘বেটি বাজ’ নামে নন-অ্যালকোহলিক ড্রিংক মিক্সার ব্র্যান্ডের মাধ্যমে আবার ব্যবসায় নামেন ব্লেক। ফলে ক্যামেরার সামনে অভিনয়ের পাশাপাশি ক্যামেরার বাইরেও নিজের ব্র্যান্ড তৈরির চেষ্টা করেছেন তিনি।
বিয়ের জায়গা নিয়েও বিতর্ক
রায়ান রেনল্ডসের সঙ্গে ব্লেকের বিয়ে হয়েছিল দক্ষিণ ক্যারোলাইনার বোউন হল প্লান্টেশনে। জায়গাটির সঙ্গে দাসপ্রথার ইতিহাস জড়িয়ে থাকায় পরে এই ভেন্যু বেছে নেওয়া নিয়ে সমালোচনা হয়।
২০২০ সালে বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের সময় বিষয়টি আবার সামনে এলে ব্লেক ও রায়ান প্রকাশ্যে দুঃখ প্রকাশ করেন। তারা জানান, বিয়ের স্থান বেছে নেওয়ার সময় এর ঐতিহাসিক বাস্তবতা যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয়নি। পরে এনএএসিপি লিগ্যাল ডিফেন্স অ্যান্ড এডুকেশনাল ফান্ডে দুই লাখ ডলার অনুদান দেন তারা।
‘ইট এন্ডস উইথ আস’ ঘিরে আইনি লড়াই
২০২৪ সালে মুক্তি পায় ‘ইট এন্ডস উইথ আস’। কলিন হুভারের জনপ্রিয় উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ছবিতে লিলি ব্লুম চরিত্রে অভিনয় করেন ব্লেক। ছবির পরিচালক ও সহশিল্পী ছিলেন জাস্টিন বালডোনি।
ছবিটি বাণিজ্যিকভাবে সফল হলেও মুক্তির আগে ও পরে দুই তারকার সম্পর্ক নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়। প্রচারণায় তাদের একসঙ্গে কম দেখা যাওয়া, সাক্ষাৎকারে ভিন্ন অবস্থান এবং সৃজনশীল মতপার্থক্যের খবর পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
ব্লেক অভিযোগ করেন, ছবির সেটে বালডোনির আচরণ তাকে অস্বস্তিকর ও বৈরী কর্মপরিবেশের মুখোমুখি করেছিল। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে তিনি ক্যালিফোর্নিয়ার সিভিল রাইটস বিভাগে অভিযোগ করেন। পরে বালডোনি ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে ফেডারেল আদালতেও মামলা করেন।
অভিযোগগুলো অস্বীকার করেন বালডোনি। তার পক্ষ থেকে বলা হয়, বিরোধের মূল কারণ ছিল ছবির সৃজনশীল নিয়ন্ত্রণ ও প্রযোজনাসংক্রান্ত মতপার্থক্য। এরপর দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি মামলা শুরু হয়। বালডোনি ব্লেক, রায়ান রেনল্ডস ও তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধেও বড় অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দাবি করে মামলা করেন।
আইনি লড়াইয়ের পরিণতি
২০২৬ সালের এপ্রিলে আদালত ব্লেকের করা ১৩টি দাবির মধ্যে ১০টি খারিজ করে দেন। এর মধ্যে বালডোনির বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগও ছিল। পরে মে মাসে বাকি দাবিগুলো আদালতের বাইরে সমঝোতার মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়। ফলে নির্ধারিত বিচার আর অনুষ্ঠিত হয়নি।
অন্যদিকে বালডোনির পাল্টা মামলাতেও বড় ধাক্কা আসে। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর দুই পক্ষের বিরোধের বড় অংশ নিষ্পত্তি হলেও ঘটনাটি ঘিরে হলিউডে বিতর্ক পুরোপুরি থামেনি।
এই ঘটনা কর্মক্ষেত্রে ক্ষমতার ভারসাম্য, অভিযোগের বিচার, জনসংযোগযুদ্ধ এবং তারকাদের প্রভাব নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
সম্পদের পরিমাণ কত
বিভিন্ন বেসরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ব্লেক লাইভলির ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৩ কোটি মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ৩৬৬ থেকে ৩৬৯ কোটি টাকা। তবে ব্লেকের ব্যক্তিগত সম্পদ এবং রায়ান রেনল্ডসের সঙ্গে তাদের যৌথ সম্পদ এক বিষয় নয়।
রায়ানের সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৩৫ কোটি ডলার বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে দম্পতির সম্মিলিত সম্পদ প্রায় ৩৮ কোটি ডলারের কাছাকাছি হতে পারে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকার বেশি। তবে এসবই বিভিন্ন বেসরকারি হিসাবের অনুমান; তাদের সম্পদের পূর্ণাঙ্গ নিরীক্ষিত হিসাব প্রকাশ্যে নেই।
তারকা থেকে নিজস্ব ব্র্যান্ড
ব্লেক লাইভলির ক্যারিয়ার তাই শুধু ‘গসিপ গার্ল’-এর সেরেনা চরিত্রে আটকে নেই। সেই চরিত্র তাকে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি এনে দিলেও পরে সিনেমা, প্রযোজনা, ব্যবসা ও ফ্যাশনে নিজের পরিচয় বিস্তৃত করেছেন তিনি।
টেইলর সুইফটের ‘আই বেট ইউ থিঙ্ক অ্যাবাউট মি’ মিউজিক ভিডিও পরিচালনার মতো কাজও তার সৃজনশীল পরিসরকে আরও বড় করেছে। তবে খ্যাতির পাশাপাশি বিতর্কও এসেছে বারবার।
ব্যবসায়িক উদ্যোগ নিয়ে সমালোচনা, বিয়ের ভেন্যু নিয়ে বিতর্ক এবং ‘ইট এন্ডস উইথ আস’ ঘিরে দীর্ঘ আইনি লড়াই—সব মিলিয়ে ৩৯ বছরে ব্লেক লাইভলির ক্যারিয়ার যেমন সাফল্যে ভরা, তেমনি নানা আলোচিত অধ্যায়েও পরিপূর্ণ।
সোর্স: প্রথম আলো



