দেশে বাড়ছে ক্যাটফুডের চাহিদা, ৮০ শতাংশই আমদানি নির্ভর

একসময় বাংলাদেশের ঘরে বিড়াল পোষা মানেই ছিল ভাত-মাছ কিংবা দুধে তাদের খাবারের ব্যবস্থা করা। সময় বদলেছে। শহুরে জীবনে পোষা প্রাণী এখন অনেকের পরিবারেরই অংশ। আর সেই সঙ্গে বাড়ছে বিড়ালের জন্য আলাদা ও পুষ্টিকর খাবার—ক্যাটফুডের চাহিদা।
খাতসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ক্যাটফুডের বাজার বর্তমানে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার। এর মধ্যে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার ক্যাটফুড আমদানি করা হয়। অর্থাৎ দেশের মোট ক্যাটফুড বাজারের প্রায় ৮০ শতাংশই আমদানিনির্ভর। ফলে বিড়ালের খাবারের বাজার যেমন বড় হচ্ছে, তেমনি বাড়ছে আমদানির ওপর নির্ভরশীলতাও।

বছরে আসছে হাজার হাজার টন
ক্যাটফুডের বাজার যে দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে, আমদানির পরিমাণেও তার প্রতিফলন দেখা যায়। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশে প্রায় ৩২ হাজার ১৫৬ টন ক্যাটফুড আমদানি হয়েছে। এসব খাবারের বড় অংশ এসেছে চীন, থাইল্যান্ড ও তুরস্ক থেকে। এর মধ্যে চীন থেকেই এসেছে প্রায় ১৭ হাজার ৭৩৮ টন, থাইল্যান্ড থেকে ৭ হাজার ৪১৮ টন এবং তুরস্ক থেকে ৬ হাজার ৭৪০ টন। ওই অর্থবছরে ক্যাটফুড আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩ কোটি ২৩ লাখ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩৯৪ কোটি টাকার সমপরিমাণ। এই পরিসংখ্যানই বোঝায়, দেশে পোষা বিড়ালের খাবারের বাজার এখন আর ছোটখাটো কোনো খাত নয়।
কেন বাড়ছে চাহিদা?
বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বিড়াল পালনের প্রবণতা বাড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোষা বিড়ালের ছবি ও ভিডিও শেয়ার করার সংস্কৃতিও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি কর্মব্যস্ত নগরজীবনে অনেকেই সহজে সংরক্ষণ ও পরিবেশন করা যায়—এমন খাবার হিসেবে ক্যাটফুড বেছে নিচ্ছেন।
ক্যাটফুডের আরেকটি বড় আকর্ষণ হলো এতে বিড়ালের বয়স ও প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের পুষ্টি উপাদান যুক্ত থাকে। কিটেন, অ্যাডাল্ট কিংবা নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যগত প্রয়োজন অনুযায়ী বাজারে বিভিন্ন ধরনের খাবার পাওয়া যায়। ফলে অনেক পোষা প্রাণীর মালিক এখন ঘরের সাধারণ খাবারের পাশাপাশি বা তার পরিবর্তে ক্যাটফুডের ওপর নির্ভর করছেন।
আমদানির পাশাপাশি দেশীয় উদ্যোগ
তবে পুরো বাজারই যে আমদানিনির্ভর থাকবে, এমনটা নয়। দেশে ইতিমধ্যে স্থানীয়ভাবে ক্যাটফুড উৎপাদনের উদ্যোগ শুরু হয়েছে। ২০২৪ সালে দেশীয় ব্র্যান্ড ‘চঙ্ক’ ক্যাটফুড উৎপাদন শুরু করে। স্থানীয় উৎপাদন বাড়লে আমদানির ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি তুলনামূলক সাশ্রয়ী দামে পোষা প্রাণীর খাবার সরবরাহের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে এ খাতের বড় চ্যালেঞ্জ হলো মান নিশ্চিত করা। বিড়ালের খাবারে প্রয়োজনীয় প্রাণিজ প্রোটিন, ভিটামিন, মিনারেল ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদানের সঠিক ভারসাম্য থাকা জরুরি। তাই দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি মান নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্ব দিতে হবে।
সামনে আরও বড় বাজার?
বাংলাদেশে পোষা প্রাণী পালনের সংস্কৃতি যত বিস্তৃত হচ্ছে, ক্যাটফুডের বাজারও তত বড় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একসময় যেখানে বিড়ালের খাবার বলতে ঘরের উচ্ছিষ্ট খাবারই বোঝানো হতো, সেখানে এখন আলাদা খাবার, নির্দিষ্ট ডায়েট ও পুষ্টির বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।

ফলে ক্যাটফুডের বাজার শুধু পোষা প্রাণীর খাবারের বাজার নয়; এটি ধীরে ধীরে একটি সম্ভাবনাময় ব্যবসায়িক খাতেও পরিণত হচ্ছে। তবে এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উৎপাদন, মান নিয়ন্ত্রণ এবং সঠিক পুষ্টিমান নিশ্চিত করার দিকে নজর দিতে হবে। তাহলেই বাড়তে থাকা বিড়ালপ্রেমীদের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি তৈরি হতে পারে নতুন একটি দেশীয় শিল্পখাত।



