শিশুর যত্নে ব্যস্ত মা, কিন্তু মায়ের যত্ন নেবে কে? মাতৃত্বের পর যে কষ্টের কথা কেউ বলে না

সন্তান জন্মের পর একজন মায়ের জীবনে আনন্দের পাশাপাশি আসে ঘুমহীন রাত, শারীরিক দুর্বলতা, নতুন দায়িত্ব এবং নানা ধরনের মানসিক চাপ। পরিবারের কাছে সময়টি আনন্দের হলেও অনেক মায়ের জন্য এই সময় হয়ে উঠতে পারে গভীর এক মানসিক সংকটের শুরু। বাংলাদেশে প্রসব-পরবর্তী বিষণ্নতা বা পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন (PPD) নিয়ে সচেতনতার ঘাটতির কারণে অনেক নারী নীরবে এই সমস্যার সঙ্গে লড়াই করছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সন্তান জন্মের পর মায়ের মন খারাপ, কান্না বা অস্থিরতাকে সবসময় সাধারণ ‘বেবি ব্লুজ’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কখনো এসব লক্ষণ গুরুতর মানসিক সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে। বাংলাদেশে পরিচালিত সাম্প্রতিক গবেষণাগুলোও বিষয়টির ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে।
প্রায় অর্ধেক মায়ের মধ্যে বিষণ্নতার লক্ষণ
২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক জার্নাল PLOS Mental Health-এ প্রকাশিত একটি জাতীয় পর্যায়ের গবেষণায় বাংলাদেশের প্রসব-পরবর্তী মায়েদের মানসিক স্বাস্থ্যের পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়। ইনস্টিটিউট অব এপিডেমিওলজি, ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চের (IEDCR) গবেষকেরা দেশের বিভিন্ন স্তরের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান থেকে সন্তান জন্মের চার থেকে ১২ সপ্তাহের মধ্যে ৫৪০ জন নারীকে নিয়ে গবেষণাটি পরিচালনা করেন।
গবেষণায় অংশ নেওয়া নারীদের মধ্যে ৪৭ দশমিক ৭৮ শতাংশের প্রসব-পরবর্তী বিষণ্নতার লক্ষণ পাওয়া যায়। অর্থাৎ গবেষণায় অংশ নেওয়া প্রায় প্রতি দুইজনের একজন কোনো না কোনো মাত্রায় এই সমস্যায় ভুগছিলেন। তাদের মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশের ক্ষেত্রে বড় ধরনের বিষণ্নতার ক্লিনিক্যাল মানদণ্ড পূরণ হয়েছে।
তবে দেশের সব এলাকায় পরিস্থিতি একই রকম নয়। গ্রামীণ এলাকায় বিভিন্ন গবেষণায় প্রসব-পরবর্তী বিষণ্নতার হার তুলনামূলক কম পাওয়া গেলেও শহরের বস্তি ও হাসপাতালভিত্তিক পর্যবেক্ষণে এ হার ৪০ শতাংশ থেকে ৬০ শতাংশেরও বেশি দেখা গেছে।

‘মন খারাপ’ ভেবে এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা
প্রসব-পরবর্তী বিষণ্নতার লক্ষণ শুধু কান্না বা মন খারাপের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘসময় ধরে বিষণ্ন থাকা, আগে আনন্দ পাওয়া কাজের প্রতি আগ্রহ হারানো, অতিরিক্ত অপরাধবোধ, বিরক্তি, রাগ, হতাশা, ঘুম ও খাবারের স্বাভাবিকতায় পরিবর্তন এবং কখনো আত্মহানির চিন্তাও দেখা দিতে পারে।
কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপিস্ট ডা. মুর্তজা জাকিউল আবরারের মতে, এসব লক্ষণের পেছনে মস্তিষ্কের নিউরোট্রান্সমিটারের কার্যক্রমে পরিবর্তনও ভূমিকা রাখতে পারে।
কিন্তু সামাজিকভাবে এখনো অনেক নারীকে বলা হয়, সন্তান জন্মের পর এমনটা হওয়া স্বাভাবিক। কেউ এটিকে ‘মুড সুইং’ হিসেবে দেখেন, কেউ আবার মায়ের দুর্বলতা বা দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। ফলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা বা মানসিক সহায়তা নেওয়ার সুযোগও অনেক সময় তৈরি হয় না।
শহরে চাপ অন্যরকম, গ্রামে অন্যরকম

বিশেষজ্ঞদের মতে, শহুরে মায়েদের ক্ষেত্রে পারিবারিক কাঠামোর পরিবর্তনও মানসিক চাপ বাড়াতে পারে। যৌথ পরিবারের পরিবর্তে ছোট পরিবারে বসবাস, সন্তানের যত্নে সীমিত সহায়তা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে পাওয়া অসংখ্য পরস্পরবিরোধী ‘পারফেক্ট প্যারেন্টিং’ পরামর্শ অনেক মায়ের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে।
অন্যদিকে গ্রামীণ এলাকায় মানসিক কষ্টকে দীর্ঘদিন ধরে জীবনের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে মেনে নেওয়ার প্রবণতা রয়েছে। ফলে অনেক নারী নিজের সমস্যাকে অসুস্থতা হিসেবে চিহ্নিতই করেন না। এতে প্রকৃত চিত্রের তুলনায় বিষণ্নতার সংখ্যা কম বলে মনে হতে পারে।
দারিদ্র্য, পারিবারিক সহিংসতা, দাম্পত্য কলহ এবং সামাজিক চাপও অনেক মায়ের মানসিক সংকটকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে। নিম্নআয়ের পরিবার ও শহরের বস্তি এলাকায় এসব ঝুঁকি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
পরিবারের সহযোগিতা বদলে দিতে পারে পরিস্থিতি
একই ধরনের সন্তান জন্মের অভিজ্ঞতা হলেও সব মায়ের মানসিক অবস্থা এক হয় না। এর পেছনে পরিবারের সহায়তার বড় ভূমিকা রয়েছে।

ঝালকাঠির দুই সন্তানের মা রাবেয়া খাতুন সন্তান জন্মের পরও নিয়মিত বিশ্রামের সুযোগ পাননি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, নিজের কষ্টের কথা বললে স্বামীর কাছ থেকেও তিনি সহযোগিতার বদলে অলসতার অভিযোগ শুনতেন।
অন্যদিকে কুড়িগ্রামের হেলেন সুলতানা জানিয়েছেন, আত্মীয়রা নিয়মিত শিশুর যত্নে সাহায্য করায় তিনি ধীরে ধীরে শিশুর কান্না, রাত জাগা ও নতুন দায়িত্বের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পেরেছেন। অর্থাৎ একজন মায়ের পাশে বাস্তব সহায়তা থাকা তার মানসিক চাপ অনেকটাই কমিয়ে দিতে পারে।
তবে আর্থিকভাবে স্বচ্ছল নারীদের সমস্যাও আলাদা হতে পারে। সন্তান জন্মের পর ক্যারিয়ারে বিরতি, নিজের পরিচয় হারানোর ভয় এবং পেশাগত বা সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কাও উদ্বেগ ও বিষণ্নতার কারণ হয়ে উঠতে পারে।
মায়ের বিষণ্নতার প্রভাব পড়ে শিশুর ওপরও
প্রসব-পরবর্তী বিষণ্নতা শুধু মায়ের ব্যক্তিগত সমস্যা নয়। এর প্রভাব শিশুর ওপরও পড়তে পারে।
গবেষণা ও বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, তীব্র বিষণ্নতায় থাকা একজন মা অনিচ্ছাকৃতভাবে শিশুর সঙ্গে মানসিক দূরত্ব তৈরি করতে পারেন। ফলে শিশুর খাওয়ানো, গোসল, ঘুমের রুটিনসহ মৌলিক যত্নে অবহেলা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। দীর্ঘমেয়াদে মা ও শিশুর সম্পর্কের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে এবং শিশুর জ্ঞানীয় ও আচরণগত বিকাশেও ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

হারিয়ে গেছে ‘আতুরঘর’, আসেনি বিকল্প ব্যবস্থা
বাংলাদেশের পুরোনো সামাজিক কাঠামোয় সন্তান জন্মের পর মাকে প্রায় ৪০ দিন আলাদা করে বিশ্রামে রাখার ‘আতুরঘর’ প্রথা ছিল। স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতার দিক থেকে সেই ব্যবস্থার নানা সীমাবদ্ধতা থাকলেও এর একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা ছিল—নতুন মাকে বিশ্রামের সুযোগ দেওয়া।
এই সময়ে পরিবারের অন্য সদস্যরা রান্না, ঘরের কাজ ও শিশুর যত্নের বড় অংশ সামলাতেন। ফলে সন্তান জন্মের পর শারীরিক ও মানসিকভাবে পুনরুদ্ধারের জন্য মায়ের হাতে কিছুটা সময় থাকত। বর্তমানে সেই সামাজিক ব্যবস্থা অনেকটাই হারিয়ে গেছে, কিন্তু তার জায়গায় মায়ের বিশ্রাম ও সহায়তার কার্যকর কোনো বিকল্প সব পরিবারে তৈরি হয়নি।
ফলে অনেক মা যখন নিজের শারীরিক বা মানসিক সমস্যার কথা বলেন, তখন পরিবারের কাছ থেকে শুনতে হয়—‘আমরাও সন্তান জন্ম দিয়েছি, আমাদের তো কিছু হয়নি।’ এমন মন্তব্য মায়ের সমস্যাকে আরও আড়ালে ঠেলে দিতে পারে।
‘বেবি ব্লুজ’ আর পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন এক নয়
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ প্রসব-পরবর্তী মানসিক সমস্যাকে তিনটি পর্যায়ে ভাগ করেছেন—‘বেবি ব্লুজ’, পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন এবং পোস্টপার্টাম সাইকোসিস।
‘বেবি ব্লুজ’ সন্তান জন্মের পর স্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের অংশ হতে পারে এবং সাধারণত চিকিৎসা ছাড়াই তা কমে যায়। অন্যদিকে পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন একটি গুরুতর বিষণ্নতাজনিত সমস্যা, যা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। আর পোস্টপার্টাম সাইকোসিস অত্যন্ত বিরল হলেও এটি একটি জরুরি ও গুরুতর মানসিক অবস্থা।
সাইকোসিসে আক্রান্ত মায়ের বাস্তবতা সম্পর্কে গুরুতর বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। কারও হ্যালুসিনেশন বা ভ্রান্ত ধারণা দেখা দিতে পারে; এমনকি কেউ শিশুকে বিপজ্জনক বা অশুভ মনে করতে পারেন। চরম পরিস্থিতিতে এর পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে।

চিকিৎসার সুযোগ বাড়ানোর দাবি
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে প্রসব-পরবর্তী মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো রোগ শনাক্তকরণ ও চিকিৎসার সুযোগের ঘাটতি। গুরুতর বিষণ্নতায় থাকা একজন মাকে অনেক সময় শুধু দূরের কোনো বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু অর্থনৈতিক বা ভৌগোলিক কারণে অনেকের পক্ষেই সেই চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব হয় না।
দেশে প্রতি এক লাখ মানুষের বিপরীতে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সংখ্যাও একের কম বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ কারণে বিশেষজ্ঞরা নিয়মিত প্রসব-পরবর্তী স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে বিষণ্নতার স্ক্রিনিং যুক্ত করার পরামর্শ দিয়েছেন। শিশুর টিকাদান কর্মসূচির সময়ও মায়ের মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রাথমিক মানসিক সহায়তা দেওয়ার সক্ষমতা তৈরি করার কথাও বলা হয়েছে।

শুধু মাকে নয়, স্বামী ও পরিবারের সদস্যদেরও এই প্রক্রিয়ার অংশ করার ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। গর্ভাবস্থা ও সন্তান জন্মের পর মায়ের মানসিক পরিবর্তন সম্পর্কে পরিবারের সদস্যদের আগে থেকেই জানানো হলে প্রয়োজনের সময় তারা আরও কার্যকর সহযোগিতা করতে পারবেন।
সন্তান জন্মের পর একজন মায়ের সুস্থ হয়ে ওঠার দায়িত্ব শুধু তার নিজের নয়। পর্যাপ্ত বিশ্রাম, পারিবারিক সহযোগিতা, সামাজিক সচেতনতা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা—সবকিছুর সমন্বয়েই প্রসব-পরবর্তী বিষণ্নতা মোকাবিলা করা সম্ভব। এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো, মায়ের কান্না বা নীরবতাকে ‘স্বাভাবিক’ বলে এড়িয়ে না গিয়ে সেটিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা।



