‘কেন আমার সঙ্গেই এমন হয়’- সন্তানকে এই মানসিকতা থেকে বের করবেন যেভাবে

সন্তান কোনো সমস্যায় পড়লে অনেক সময় তার মুখে শোনা যায়, ‘কেন সবসময় আমার সঙ্গেই এমন হয়?’ কিংবা ‘আমার জীবনেই কেন এত সমস্যা?’ এমন কথাকে শুধু অভিযোগ হিসেবে দেখলে ভুল হতে পারে। কারণ, শিশুর সমস্যাকে অস্বীকার না করে তাকে ধীরে ধীরে সমাধানের পথ খুঁজতে শেখানোই হতে পারে আরও কার্যকর parenting-এর একটি পদ্ধতি।
সন্তানের প্রতিটি সমস্যার সমাধান করে দেওয়া যেমন তাকে পরনির্ভরশীল করে তুলতে পারে, তেমনি তার অনুভূতিকে গুরুত্ব না দেওয়াও আত্মবিশ্বাসে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই প্রয়োজন এমন একটি ভারসাম্য, যেখানে সন্তান প্রথমে অনুভব করবে—তার কথা শোনা হচ্ছে; এরপর তাকে ভাবতে শেখানো হবে—এই পরিস্থিতিতে সে কী করতে পারে।

অভিযোগ মানেই ছোট সমস্যা নয়
সন্তান বললেই যে তার কথা ‘ঘ্যানঘ্যান’ বা নিছক অভিযোগ, এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়। ‘বন্ধুরা আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করে’, ‘স্কুলে আমাকে মেরেছে’ কিংবা ‘পড়ার চাপ সামলাতে পারছি না’—এসবের পেছনে বাস্তব সমস্যা থাকতে পারে। তাই প্রথমেই শিশুর কথা মন দিয়ে শোনা জরুরি। তাকে বলা যেতে পারে, ‘বুঝতে পারছি, বিষয়টা তোমার জন্য কঠিন।’ অর্থাৎ তার অনুভূতিকে অস্বীকার না করে সেটিকে স্বীকৃতি দিতে হবে।
২০২৪ সালের একটি গবেষণাতেও হতাশাজনক পরিস্থিতিতে মা-বাবার কাছ থেকে আবেগের স্বীকৃতি পাওয়া শিশুদের কোনো কাজ চালিয়ে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। ফলে ‘এত মন খারাপ করার কী আছে?’ বলার বদলে ‘তোমার খারাপ লাগাটা স্বাভাবিক’—এ ধরনের প্রতিক্রিয়া বেশি সহায়ক হতে পারে।
প্রশ্নটা হতে পারে, ‘এখন কী করা যায়?’

সন্তানকে সমস্যার মধ্যে আটকে না রেখে সমাধানের দিকে তাকাতে শেখানোর জন্য খুব সাধারণ একটি প্রশ্ন করা যায়—‘এখন তুমি কী করতে পারো?’ ধরা যাক, সন্তান বলল, ‘অঙ্কটা কিছুতেই বুঝতে পারছি না।’ তখন ‘অঙ্ক তো খুব সহজ, মন দিয়ে করলেই পারবে’ বলার বদলে জিজ্ঞেস করা যায়, ‘কোন জায়গাটা বুঝতে পারছ না? চলো, দেখি সমস্যাটা কোথায়।’
পরীক্ষায় খারাপ ফল করলে ‘আগেই তো বলেছিলাম!’ না বলে প্রশ্ন করা যায়, ‘কোথায় ভুল হয়েছিল? পরেরবার কীভাবে প্রস্তুতি নিলে ভালো হতে পারে?’
আবার সন্তান যদি বলে, ‘আমার বন্ধুর ফোনটা আমারটার চেয়ে ভালো’, তখন সরাসরি বকা না দিয়ে জানতে চাওয়া যায়, ‘তোমার কেন মনে হচ্ছে ওই ফোনটা তোমার প্রয়োজন? সেটা পাওয়ার জন্য কী করা যায়?’
এ ধরনের প্রশ্ন শিশুকে ধীরে ধীরে বুঝতে সাহায্য করে—সমস্যা হলেই শুধু হতাশ হতে হবে না; পরিস্থিতির মধ্যে নিজের করণীয়ও খুঁজে দেখা যায়।
সমস্যা সমাধান মানে সন্তানকে একা ছেড়ে দেওয়া নয়
তবে সন্তানকে সমস্যা সমাধান করতে শেখানোর অর্থ কখনোই এই নয় যে, ‘এটা তোমার সমস্যা, তুমিই সামলাও।’ শিশুর বয়স, মানসিক পরিপক্বতা এবং সমস্যার ধরন অনুযায়ী মা-বাবার সহায়তা প্রয়োজন। কোনো বিষয় সে নিজেই সামলাতে পারবে, কোনো ক্ষেত্রে পরামর্শ দরকার হবে, আবার কোনো পরিস্থিতিতে মা-বাবাকেই সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে হবে।
বিশেষ করে bullying, নির্যাতন, নিরাপত্তার ঝুঁকি বা গুরুতর মানসিক চাপের মতো পরিস্থিতিতে শিশুকে নিজে সামলে নেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া উচিত নয়। সেখানে বড়দের দায়িত্ব হলো দ্রুত পাশে দাঁড়ানো এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া।
সব কাজ করে দেওয়ার অভ্যাস বদলান

সন্তানের জুতার ফিতা বাঁধা থেকে শুরু করে স্কুলের প্রজেক্ট, পড়াশোনা কিংবা বন্ধুর সঙ্গে ছোটখাটো সমস্যার সমাধান—সবকিছু মা-বাবা করে দিলে সন্তান সাময়িকভাবে স্বস্তি পেলেও নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ কমে যায়।
তাই বয়স উপযোগী সমস্যায় তাকে কিছুটা সময় দেওয়া যেতে পারে।
সে যদি বলে, ‘প্রজেক্টটা কীভাবে করব বুঝতে পারছি না’, তাহলে পুরো কাজটি করে না দিয়ে জিজ্ঞেস করা যায়, ‘প্রথমে কোন কাজটা করতে পারো?’
বন্ধুর সঙ্গে ঝামেলা হলে বলা যায়, ‘তুমি কি তার সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছ?’ এরপর প্রয়োজন হলে কীভাবে কথা বলা যায়, সে বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া যেতে পারে। এভাবে শিশু নিজের সমস্যার সমাধান নিয়ে ভাবার অভ্যাস তৈরি করে।
আগে অনুভূতি, তারপর সমাধান

সন্তানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতিটি হতে পারে- শোনা, অনুভূতিকে স্বীকৃতি দেওয়া, তারপর সমাধানের দিকে নেওয়া। সে বললে, ‘কেন সবসময় আমার সঙ্গেই এমন হয়?’ সঙ্গে সঙ্গে ‘তোমার সঙ্গেই তো কিছু হয় না’ বলে তার অনুভূতিকে উড়িয়ে না দিয়ে বলা যায়, ‘তোমার মনে হচ্ছে বিষয়গুলো একসঙ্গে অনেক কঠিন হয়ে গেছে। বলো তো, কী হয়েছে?’
সবটা শোনার পর পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রশ্ন হতে পারে, ‘এখন কী করা যায়?’ কিংবা ‘তুমি কী চেষ্টা করতে পারো?’
শিশুকে আত্মনির্ভরশীল করে তোলার অর্থ এই নয় যে তাকে সব সমস্যা একাই সামলাতে হবে। বরং তাকে এমন একটি মানসিকতা তৈরি করে দিতে হবে, যেখানে সমস্যা দেখলে সে প্রথমে নিজেকে অসহায় মনে না করে ভাবতে শেখে- ‘ঠিক আছে, এখন আমার পরের পদক্ষেপ কী?’
জীবনের প্রতিটি সমস্যার সমাধান হয়তো সে তখনই করতে পারবে না। কিন্তু সমস্যা থেকে পালিয়ে না গিয়ে সমাধানের পথ খোঁজার অভ্যাস যদি ছোটবেলা থেকেই তৈরি হয়, সেটিই বড় হয়ে তার আত্মবিশ্বাস ও মানসিক দৃঢ়তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।



