বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনরবিবার, ১৬ আগস্ট, ২০২৬
নারী

নারী অ্যাথলেট পুরুষ প্রমাণিত, বাতিল সব পদক ও নিষেধাজ্ঞা আজীবনের

1786807858-8bbcb82b856b52475ba38d2735854377

জাতীয় পর্যায়ের অ্যাথলেটিকসে নারী বিভাগে অংশ নেওয়া দুই অ্যাথলেট জান্নাত বেগম ও কবিতা রায়কে নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্ক এবার গড়াল আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তে। বাংলাদেশ অ্যাথলেটিকস ফেডারেশনের নতুন অ্যাডহক কমিটি তাঁদের নারী বিভাগে অংশগ্রহণের উপযোগী নয় বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই সঙ্গে জাতীয় প্রতিযোগিতায় তাঁদের অর্জিত সব পদক বাতিল এবং আজীবনের জন্য নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।


জান্নাত বেগমের বয়স ২৮ বছর। তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অ্যাথলেট এবং থ্রো ইভেন্টে অংশ নেন। অন্যদিকে ১৯ বছর বয়সী কবিতা রায় বাংলাদেশ নৌবাহিনীর অ্যাথলেট এবং স্প্রিন্টার। এত দিন তাঁরা নারী হিসেবেই জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে আসছিলেন।

তাঁদের লিঙ্গ নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর বিষয়টি যাচাইয়ের উদ্যোগ নেয় অ্যাথলেটিকস ফেডারেশনের আগের কমিটি। এ জন্য বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে তাঁদের প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার অনুরোধ করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ২০২৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর পাঁচ সদস্যের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়ে একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করে।

দীর্ঘ কয়েক মাস পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর গত ১১ মে বোর্ডের কার্যক্রম শেষ হয়। এরপর ১৬ মে ফেডারেশনের কাছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয় মেডিকেল বোর্ড।

ফেডারেশনের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই প্রতিবেদনে দুজনের শরীরে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা নারী অ্যাথলেটদের জন্য নির্ধারিত সীমার তুলনায় অনেক বেশি পাওয়া যায়। জান্নাত বেগমের রক্তে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা পাওয়া গেছে ১৯ দশমিক ৬৬ এনমোল/লিটার। আর কবিতা রায়ের ক্ষেত্রে এই মাত্রা ১৬ দশমিক ৫০ এনমোল/লিটার।

ফেডারেশন জানিয়েছে, নারী বিভাগে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে ওয়ার্ল্ড অ্যাথলেটিকসের প্রচলিত বিধিমালায় টেস্টোস্টেরনের মাত্রা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখার শর্ত রয়েছে। ফেডারেশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত সীমা ২ দশমিক ৫ এনমোল/লিটার। এই পরীক্ষার ফল এবং মেডিকেল বোর্ডের প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই নতুন অ্যাডহক কমিটি দুই অ্যাথলেটের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়। শনিবার ফেডারেশনের নতুন কমিটির সভায় তাঁদের জাতীয় প্রতিযোগিতায় অর্জিত সব পদক বাতিলের সিদ্ধান্ত হয়।

Advertisements

বাংলাদেশ অ্যাথলেটিকস ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক আলী ইমাম তপনের ভাষ্য, জান্নাতের জাতীয় পর্যায়ে কয়েকটি স্বর্ণসহ মোট নয়টি পদক রয়েছে। কবিতার পদক রয়েছে প্রায় চারটি। এসব পদক এখন সংশ্লিষ্ট প্রতিযোগিতার ফলাফলে পুনর্বিন্যাস করা হবে। আলী ইমাম তপন বলেন, মেডিকেল বোর্ডের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই তাঁদের নারী বিভাগে অংশগ্রহণের বিষয়ে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দুজনকেই আজীবনের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে নারী হিসেবে তাঁরা আর কোনো প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারবেন না।

তবে এই সিদ্ধান্তকে শুধু দুটি অ্যাথলেটের পদক বাতিল বা নিষেধাজ্ঞার বিষয় হিসেবে দেখলে এর পেছনের জটিলতাটি পুরোপুরি বোঝা যাবে না। আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে অ্যাথলেটের লিঙ্গ, যৌন বিকাশের বৈশিষ্ট্য এবং হরমোনের মাত্রা নির্ধারণ করে নারী বিভাগে অংশগ্রহণের যোগ্যতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। বিশেষ করে টেস্টোস্টেরনের মাত্রাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংস্থার নীতিমালা, বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা এবং মানবাধিকার—সবকিছুই আলোচনায় এসেছে।

এ ক্ষেত্রেও তাই মেডিকেল পরীক্ষার ফলাফল ও ফেডারেশনের সিদ্ধান্তের পাশাপাশি বিষয়টির চিকিৎসাবিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক ক্রীড়া নীতিমালার প্রেক্ষাপট গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শরীরে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা বেশি হওয়া এবং কারও জৈবিক লিঙ্গ নির্ধারণ—দুটি বিষয়কে এক করে দেখার সুযোগ নেই। লিঙ্গ নির্ধারণ একটি জটিল চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক বিষয়, যেখানে ক্রোমোজোম, প্রজনন অঙ্গ, হরমোন ও যৌন বিকাশের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় আসতে পারে।

বাংলাদেশের অ্যাথলেটিকসে জান্নাত ও কবিতাকে ঘিরে নেওয়া সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত তাই ভবিষ্যতে শুধু জাতীয় প্রতিযোগিতার ফলাফলেই নয়, নারী বিভাগে অংশগ্রহণের নীতিমালা ও অ্যাথলেটদের অধিকার নিয়েও নতুন আলোচনা তৈরি করতে পারে।

Advertisements
অ্যাথলেটনারীনিষেধাজ্ঞাপদকপুরুষবিশ্বকাপ