বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনশুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬
নারী

কেঁচো সারে বদলে গেছে জীবন, স্বাবলম্বী কুষ্টিয়ার শত নারী

491d31c807f26331e8a3e1e049a6eeef

কুষ্টিয়া শহর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দক্ষিণে গেলে বিত্তিপাড়া বাজার। সেখান থেকে পূর্ব দিকে গ্রামের রাস্তা ধরে আরও কিছুটা এগোলেই বিত্তিপাড়া গ্রাম। দূর থেকেই কৃষি বিভাগের একটি বড় সাইনবোর্ড চোখে পড়ে। সেখানে লেখা রয়েছে ভার্মি কম্পোস্ট বা কেঁচো সার তৈরির পদ্ধতি, ব্যবহার ও এর নানা উপকারিতার কথা।

গ্রামের ভেতরে ঢুকলেই দেখা যায় বাড়ির আঙিনায় সারি সারি সিমেন্টের তৈরি চাক। এগুলোর ভেতরেই তৈরি হচ্ছে জৈব সার। আর এই কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন গ্রামের শতাধিক গৃহবধূ। কেউ নিজেদের জমি ও বাড়ির বাগানে উৎপাদিত সবজিতে ব্যবহার করছেন এই সার, আবার প্রয়োজনের অতিরিক্ত অংশ বিক্রি করে করছেন বাড়তি আয়।

এভাবেই ঘরের কাজের পাশাপাশি ছোট পরিসরে শুরু করা একটি উদ্যোগ অনেক নারীর জন্য হয়ে উঠেছে স্বাবলম্বী হওয়ার পথ।

একজনের হাত ধরে শুরু

বিত্তিপাড়া গ্রামে কেঁচো সার তৈরির উদ্যোগ প্রথম শুরু করেন জাহানারা খাতুন। ২০২১ সালে বাড়ির আঙিনায় মাত্র দুটি সিমেন্টের চাক বসিয়ে তার যাত্রা শুরু হয়। সেখানে গোবর ও কেঁচো ব্যবহার করে জৈব সার তৈরির কাজ শুরু করেন তিনি।

এর আগে কুষ্টিয়া সদর উপজেলা কৃষি অফিস থেকে এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন জাহানারা। কৃষি বিভাগের কাছ থেকে পেয়েছিলেন প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তাও।

ছোট পরিসরে শুরু করা সেই উদ্যোগ এখন অনেক বড় হয়েছে। বাড়ির পেছনে টিনশেডের নিচে রয়েছে ৪০টি চাক। বাড়ির সামনেও রয়েছে আরও ১০টি। নিজের গরুর গোবরের পাশাপাশি আশপাশের বিভিন্ন বাড়ি থেকেও গোবর সংগ্রহ করেন তিনি। এর সঙ্গে যোগ করেন সবজির উচ্ছিষ্ট ও কলাগাছের বাকল।

Advertisements

প্রতিটি চাক থেকে প্রায় ৩০ কেজি পর্যন্ত জৈব সার উৎপাদন করা যায়।

২০ থেকে ২৫ দিনের অপেক্ষা

ভার্মি কম্পোস্ট তৈরির প্রক্রিয়াটি খুব জটিল নয়। সিমেন্টের তৈরি প্রতিটি চাক সাধারণত ১০০ থেকে ১৫০ টাকার মধ্যে কিনে নেন উদ্যোক্তারা। এরপর সেখানে গোবর, সবজির উচ্ছিষ্ট ও কলাগাছের বাকল দেওয়া হয়। এর সঙ্গে যোগ করা হয় কেঁচো।

শুরুর দিকে জাহানারা কৃষি অফিস থেকে কেঁচো সংগ্রহ করতেন। এখন আর বাইরে থেকে কেঁচো কিনতে হয় না। নিজের উৎপাদিত কেঁচো দিয়েই পরবর্তী সার তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

চাক ভর্তি করার পর সেটি ঢেকে রাখা হয় প্রায় ২০ থেকে ২৫ দিন। এ সময় প্রয়োজন অনুযায়ী মাঝে মাঝে পানি ছিটিয়ে দিতে হয়। নির্দিষ্ট সময় পর জৈব উপাদানগুলো কেঁচোর মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত হয়ে তৈরি হয় ভার্মি কম্পোস্ট।

এরপর তৈরি সার চালুনিতে ছেঁকে প্যাকেট বা বস্তায় ভরে বিক্রি করেন উদ্যোক্তারা।

জাহানারা খাতুনের বর্তমান উৎপাদনও বেশ উল্লেখযোগ্য। প্রতি মাসে তিনি প্রায় ৪০ মণ জৈব সার তৈরি করেন। প্রতি কেজি সার বিক্রি করেন ১৫ টাকা দরে। সে হিসাবে মাসে প্রায় ২৪ হাজার টাকার সার উৎপাদন করেন তিনি।

এর মধ্যে নিজের জমি ও বাগানের জন্য দুই থেকে তিন মণ রেখে দেন। বাকি সার বিক্রি করে আয় করেন।

শুধু স্থানীয় বাজারেই নয়, বিভিন্ন এলাকার কৃষকেরাও মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে তার বাড়িতে এসে সার কিনে নিয়ে যান।

বাড়ির আঙিনায় সবজি, হাতে বাড়তি আয়

বিত্তিপাড়ার নারীরা শুধু সার তৈরি করেই থেমে থাকেননি। নিজেদের উৎপাদিত জৈব সার ব্যবহার করে বাড়ির আঙিনা ও কৃষিজমিতে নানা ধরনের ফসল ফলাচ্ছেন।

রিনা পারভীন ও নিলুফা ইয়াসমীনের মতো উদ্যোক্তারা জানান, তাদের গ্রামে সবজি ও অন্যান্য কৃষিপণ্যের চাষ হয়। নারীরা এখন রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে জৈব সার ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছেন।

নিজেদের জমিতে উৎপাদিত ফসলের জন্য আগে সার ব্যবহার করা হয়। অতিরিক্ত সার থাকলে সেটি বিক্রি করে পাওয়া অর্থ সংসারের বিভিন্ন কাজে ব্যয় করেন তারা।

মনিরার অভিজ্ঞতাও একই। তার মতে, আগের তুলনায় গ্রামের মানুষ এখন রাসায়নিক সার কিছুটা কম ব্যবহার করছেন। বাড়ির আঙিনায় মরিচ, বেগুনসহ বিভিন্ন সবজি উৎপাদনে ব্যবহার করা হচ্ছে কেঁচো সার। ধান, ভুট্টা ও শসার ক্ষেতেও এই সার প্রয়োগ করছেন অনেকে।

ফলে একদিকে নিরাপদ ও জৈব পদ্ধতিতে সবজি উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে নারীদের জন্য তৈরি হচ্ছে বাড়তি আয়ের পথ।

সন্তানদের পড়াশোনায় কাজে লাগছে আয়

এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় সুবিধাগুলোর একটি হলো, নারীরা নিজেদের আয় নিজের পরিবারেই কাজে লাগাতে পারছেন।

উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জৈব সার বিক্রি করে পাওয়া অর্থ দিয়ে কেউ সন্তানের স্কুলের খরচ দিচ্ছেন, কেউ কিনছেন স্কুল ড্রেস। আবার পরিবারের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি নিজেদের পছন্দের কিছু জিনিসও কিনছেন অনেকে।

ভার্মি কম্পোস্ট তৈরিতে বড় ধরনের বিনিয়োগের প্রয়োজন হয় না। বাড়িতে থাকা গোবর, রান্নাঘরের সবজির উচ্ছিষ্ট কিংবা কলাগাছের বাকলের মতো সহজলভ্য উপকরণই এর কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা যায়।

এ কারণে গৃহস্থালির কাজের পাশাপাশি নারীদের জন্য এই উদ্যোগটি তুলনামূলক সহজে পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে।

কৃষি বিভাগের প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ

বিত্তিপাড়ার নারীদের এই উদ্যোগে কৃষি বিভাগের সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

ব্লকের দায়িত্বে থাকা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আশরাফ সিদ্দিকী জানান, গ্রামের অনেক পুরুষ কাজের প্রয়োজনে দিনের বড় একটি সময় বাড়ির বাইরে থাকেন। অন্যদিকে নারীরা বাড়িতে থাকায় তাঁদের ঘিরেই জৈব সার উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

প্রশিক্ষণ ও আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার সুযোগ পাওয়ার পর নারীদের মধ্যে আগ্রহও বাড়তে থাকে। এখন তারা নিজেরাই জৈব সার উৎপাদনের পদ্ধতি সম্পর্কে সচেতন এবং অন্যদেরও উৎসাহিত করছেন।

কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা শুধু প্রশিক্ষণ দিয়েই দায়িত্ব শেষ করছেন না। নিয়মিত উদ্যোক্তাদের খোঁজখবর নেওয়া, তাদের সমস্যার কথা শোনা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরামর্শ দেওয়ার কাজও করছেন।

সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রুপালী খাতুন জানান, তিনি নারী হওয়ায় গ্রামের নারীদের সঙ্গে কাজ করতে এবং তাদের সমস্যাগুলো বুঝতে তুলনামূলকভাবে সহজ হয়। প্রায় প্রতি সপ্তাহেই তিনি ও তার দলের সদস্যরা বিভিন্ন বাড়িতে গিয়ে নারীদের প্রয়োজন সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেন।

তাদের দক্ষতা বাড়াতে নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।

একজন থেকে শতাধিক

রুপালী খাতুনের মতে, বিত্তিপাড়ায় একজন নারীর হাত ধরে শুরু হওয়া জৈব সার উৎপাদনের কাজ এখন শতাধিক নারীর মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। কৃষি বিভাগের দৃষ্টিতে এটিই এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় সাফল্য।

শুধু ভার্মি কম্পোস্ট নয়, নারীদের বাড়ির আঙিনায় নিরাপদ সবজি উৎপাদনেও উৎসাহিত করা হচ্ছে। বস্তায় সবজি চাষের জন্য তাঁদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বস্তা ও বীজ সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলের গাছও বিতরণ করা হচ্ছে।

লক্ষ্য হলো, নারীরা যেন নিজেদের উৎপাদিত জৈব সার ব্যবহার করে বাড়িতেই নিরাপদ সবজি ফলাতে পারেন এবং অতিরিক্ত সার বিক্রি করে বাড়তি আয় করতে পারেন।

কৃষি বিভাগের এই সহযোগিতা ভবিষ্যতেও অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

স্বাবলম্বিতার নতুন পথ

বিত্তিপাড়ার গল্প মূলত একটি ছোট উদ্যোগ কীভাবে একটি গ্রামের নারীদের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনতে পারে, তার উদাহরণ।

একসময় বাড়ির আঙিনায় পড়ে থাকা গোবর, সবজির উচ্ছিষ্ট কিংবা কলাগাছের বাকল ছিল সাধারণ বর্জ্য। এখন সেসব উপকরণই নারীদের হাতে পরিণত হচ্ছে মূল্যবান জৈব সারে। সেই সার দিয়ে উৎপাদিত হচ্ছে সবজি, কমছে রাসায়নিক সারের ব্যবহার এবং বাড়ছে পরিবারের আয়।

সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি ঘটছে নারীদের জীবনে। তারা এখন শুধু পরিবারের ওপর নির্ভরশীল নন; নিজেদের শ্রম ও দক্ষতা কাজে লাগিয়ে আয় করছেন। সন্তানদের পড়াশোনা, পরিবারের প্রয়োজন কিংবা নিজেদের ছোটখাটো শখ—সবকিছুতেই সেই আয়ের অংশ থাকছে।

জাহানারা খাতুনের শুরু করা দুটি চাকের উদ্যোগ এখন শতাধিক নারীর অংশগ্রহণে একটি বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে পরিণত হয়েছে।

বিত্তিপাড়ার নারীদের এই যাত্রা দেখিয়ে দেয়, স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য সবসময় বড় পুঁজি বা বড় ব্যবসা প্রয়োজন হয় না। কখনো বাড়ির আঙিনায় পড়ে থাকা কিছু উপকরণ, সামান্য প্রশিক্ষণ, একটু উদ্যোগ এবং নিয়মিত পরিশ্রমই হয়ে উঠতে পারে পরিবর্তনের শুরু।

কেঁচো সার তাই বিত্তিপাড়ার নারীদের কাছে শুধু কৃষির উপকরণ নয়—এটি তাদের আত্মনির্ভরতারও একটি গল্প।

Advertisements
কুষ্টিয়াকেঁচোজীবননারীসার