বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনশুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬
নারী

বিধিনিষেধের বেড়াজালে আফগান নারীরা, মাসে দুবারও ঘরের বাইরে যেতে পারছেন না অনেকে

bd7781a4a203a36cfd2936d4765f6b5e

তালেবান সরকারের একের পর এক কঠোর বিধিনিষেধের কারণে আফগান নারীদের স্বাভাবিক জনজীবনে অংশগ্রহণ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। ঘরের বাইরে বের হওয়া থেকে শুরু করে শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ—জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ছেন দেশটির নারীরা।

জাতিসংঘের নারী বিষয়ক সংস্থা ইউএন উইমেনের সাম্প্রতিক এক জরিপে আফগান নারীদের বর্তমান পরিস্থিতির উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, দেশটির অর্ধেকেরও বেশি নারী মাসে সর্বোচ্চ এক বা দুবার বাড়ির বাইরে বের হন। অর্থাৎ অনেক নারীর দৈনন্দিন জীবন এখন কার্যত ঘরের চার দেয়ালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।

বুধবার প্রকাশিত জরিপে আরও বলা হয়েছে, পুরুষ অভিভাবক বা পরিবারের কোনো পুরুষ সদস্য সঙ্গে না থাকলে বাইরে বের হওয়ার সময় প্রায় ৭৫ শতাংশ নারী নিজেদের নিরাপদ মনে করেন না। নিরাপত্তাহীনতার এই অনুভূতি নারীদের চলাফেরা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শুধু চলাফেরার স্বাধীনতাই নয়, মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। জরিপে অংশ নেওয়া প্রতি ১০ জন নারীর মধ্যে প্রায় সাতজন নিজেদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নেতিবাচক অবস্থার কথা জানিয়েছেন। দীর্ঘদিনের সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা এবং শিক্ষা ও কাজের সুযোগ কমে যাওয়ার প্রভাব তাঁদের মানসিক সুস্থতার ওপর পড়ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

কর্মক্ষেত্রেও নারী-পুরুষের অংশগ্রহণের ব্যবধান অত্যন্ত বড়। ইউএন উইমেনের তথ্য অনুযায়ী, আফগান নারীদের কর্মসংস্থানে অংশগ্রহণের হার মাত্র ৭ শতাংশ। বিপরীতে পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার ৮৪ শতাংশ। অর্থাৎ কর্মজীবনে নারীদের অংশগ্রহণ পুরুষদের তুলনায় অত্যন্ত কম।

ক্ষমতায় ফেরার পর একের পর এক নিষেধাজ্ঞা

২০২১ সালে তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতা পুনর্দখলের পর থেকেই নারীদের অধিকার ও স্বাধীনতার ওপর একের পর এক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। ইউএন উইমেনের দাবি, ক্ষমতা দখলের পর থেকে নারীদের লক্ষ্য করে শতাধিক ডিক্রি, নির্দেশনা ও বিধিনিষেধ জারি করেছে তালেবান সরকার।

Advertisements

এসব বিধিনিষেধের ফলে আফগান নারীদের শিক্ষা, চাকরি, চলাফেরা, সামাজিক কর্মকাণ্ড এবং জনজীবনে অংশগ্রহণের সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

বর্তমানে আফগানিস্তানই বিশ্বের একমাত্র দেশ, যেখানে মেয়েদের মাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষা থেকে কার্যত নিষিদ্ধ রাখা হয়েছে। এর ফলে একটি পুরো প্রজন্মের মেয়ের শিক্ষাজীবন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেছে।

ইউনেসকোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের পর থেকে প্রায় ২৪ লাখ আফগান মেয়ে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। বয়স অনুযায়ী বিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা যে মেয়েদের, তাদের একটি বড় অংশ এখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে ঘরেই সময় কাটাতে বাধ্য হচ্ছে।

শিক্ষার সুযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে নারীদের উপস্থিতিও সীমিত হওয়ায় ভবিষ্যতে আফগান সমাজ ও অর্থনীতিতে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে। শিক্ষা ও কর্মসংস্থান থেকে নারীদের দূরে রাখার অর্থ হলো দেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশের দক্ষতা ও সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে না পারা।

ঘরের বাইরে যাওয়াও যখন অনিশ্চিত

আফগান নারীদের বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে কঠিন দিকগুলোর একটি হলো তাদের চলাফেরার স্বাধীনতা। মাসে এক বা দুবারের বেশি ঘরের বাইরে বের না হওয়ার তথ্যটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এর মাধ্যমে বোঝা যায়, দেশটির নারীদের সামাজিক জীবন কতটা সংকুচিত হয়ে পড়েছে।

বাজার, কর্মক্ষেত্র, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠানে যাওয়া—স্বাভাবিক জীবনের এসব কর্মকাণ্ডও অনেক নারীর জন্য এখন কঠিন হয়ে উঠেছে। পুরুষ অভিভাবক ছাড়া বাইরে বের হলে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

ফলে আফগান নারীদের জীবন ধীরে ধীরে এমন এক বাস্তবতায় আটকে যাচ্ছে, যেখানে বাইরে যাওয়ার স্বাধীনতা, শিক্ষার অধিকার, কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং সামাজিকভাবে সক্রিয় থাকার সম্ভাবনা—সবকিছুই একসঙ্গে সংকুচিত হচ্ছে।

ইউএন উইমেনের জরিপে উঠে আসা মানসিক স্বাস্থ্যের তথ্যও সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন। দীর্ঘদিন ধরে স্বাধীনতা ও সুযোগ সীমিত থাকার কারণে নারীদের মধ্যে হতাশা, উদ্বেগ ও বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি বাড়ছে।

আন্তর্জাতিক মহলে আফগান নারীদের অধিকার নিয়ে উদ্বেগ বহুদিনের। কিন্তু নতুন পরিসংখ্যানগুলো দেখাচ্ছে, বিধিনিষেধের প্রভাব শুধু শিক্ষা বা চাকরির ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নেই; তা নারীদের দৈনন্দিন জীবন, সামাজিক যোগাযোগ এবং মানসিক সুস্থতার ওপরও গভীর প্রভাব ফেলছে।

ফলে আফগান নারীদের জন্য শিক্ষা, কাজ ও জনজীবনে ফিরে আসার সুযোগ তৈরি করা এখন শুধু নারী অধিকার রক্ষার বিষয় নয়; এটি দেশটির ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ, অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও সরাসরি জড়িত।

Advertisements
আফগানঘরতালেবাননারীবিধিনিষেধ