বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবুধবার, ১২ আগস্ট, ২০২৬
নারী

যে গ্রুপ ট্যুর পছন্দই ছিল না, সেখানেই গাইডের প্রেমে পড়লেন ব্রিটিশ লেখক

IMG_3363

দুই দশকের বেশি সময় ধরে একাই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত ঘুরে বেড়িয়েছেন ব্রিটিশ ভ্রমণবিষয়ক লেখক লিডিয়া সোয়িনস্কো। জর্জিয়া, ভারত ও কলম্বিয়াসহ বহু দেশ ভ্রমণ করলেও শ্রীলঙ্কা এতদিন ছিল তার ভ্রমণতালিকার বাইরে। ২০২৪ সালের মার্চে গ্রুপ ট্যুরের জনপ্রিয়তা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে প্রথমবার দেশটিতে যান তিনি। আর সেই সফরই শেষ পর্যন্ত তাঁর জীবনে নিয়ে আসে অপ্রত্যাশিত এক প্রেমের গল্প।

গ্রুপ ট্যুর বিশেষ করে নিজের প্রজন্মের মানুষের মধ্যে কেন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে, তা জানতে ১২ দিনের একটি সংগঠিত ভ্রমণে যোগ দিয়েছিলেন লিডিয়া। যদিও ব্যক্তিগতভাবে এ ধরনের ভ্রমণ তার খুব একটা পছন্দের নয়। নির্দিষ্ট সময়সূচির বদলে ধীরগতিতে নিজের মতো করে ঘুরে বেড়ানোতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন তিনি। তাই গ্রুপ ট্যুরের আগে ও পরে একা শ্রীলঙ্কা ঘুরে দেখার পরিকল্পনাও করেছিলেন।

শ্রীলঙ্কায় পৌঁছানোর পর অবশ্য দেশটির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হন লিডিয়া। উপকূলজুড়ে নারকেলগাছ, জঙ্গলের মধ্যে সাদা বৌদ্ধস্তূপ, প্রাচীন রাজ্যগুলোর ইতিহাস ও কিংবদন্তি এবং অসংখ্য সৈকত তার নজর কাড়ে।

১২ দিনের সফরে লিডিয়ার সঙ্গে ছিলেন আরও নয়জন পর্যটক—পাঁচ নারী ও চার পুরুষ। তাদের বেশিরভাগই ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। দলের মধ্যে কয়েকজন ব্রিটিশ ও একজন অস্ট্রেলীয়ও ছিলেন। বয়স ছিল ৩০-এর শুরু থেকে ৪০-এর শেষ পর্যন্ত। দলের গাইড ছিলেন সুরঙ্গা। দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও প্রকৃতি সম্পর্কে তার গভীর জ্ঞান, ধৈর্য এবং রসবোধ দ্রুতই লিডিয়ার নজর কাড়ে।

Advertisements

নেগোম্বোর মাছের বাজার থেকে প্রাচীন পোলোনারুয়া, হাপুতালে ও এল্লার নাইন আর্চ ব্রিজ, ইয়ালা ন্যাশনাল পার্কের সাফারি, ঐতিহাসিক গল ফোর্ট হয়ে কসগোডার সৈকত—স্বল্প সময়ে শ্রীলঙ্কার নানা প্রান্ত ঘুরে দেখেন তারা।

তবে সফরের অষ্টম দিনে ঘটে এমন একটি ঘটনা, যা শেষ পর্যন্ত লিডিয়া ও সুরঙ্গার সম্পর্ককে অন্যদিকে নিয়ে যায়। ইয়ালা ন্যাশনাল পার্ক থেকে ফেরার পর দলীয় নৈশভোজ শেষে নিজের কক্ষে ফেরার সময় লিডিয়ার ফোন পড়ে গিয়ে ভেঙে যায়। ব্যস্ত সফরসূচির কারণে তখন ফোনটি মেরামত করার সুযোগ ছিল না।

সফর শেষ হওয়ার কয়েক দিন পর সুরঙ্গা নিজেই লিডিয়াকে ফোন ঠিক করাতে কলম্বোর ব্যস্ত পেট্টাহ এলাকায় নিয়ে যান। ফোন মেরামতের অপেক্ষার সময় দুজন একসঙ্গে কফি ও মধ্যাহ্নভোজ করেন। পান করেন শ্রীলঙ্কার জনপ্রিয় কিং নারকেলের পানীয় ‘থ্যাম্বিলি’। গ্রুপ ট্যুরের আনুষ্ঠানিক পরিবেশের বাইরে এসে সেদিন দীর্ঘ সময় কথা হয় তাদের।

বিদায়ের সময় লিডিয়া বুঝতে পারেন, সুরঙ্গাকে ছেড়ে যেতে তার মন খারাপ করছে। এরপর আরও কয়েকবার দেখা করেন তারা। লিডিয়াও শ্রীলঙ্কায় নিজের অবস্থান বাড়িয়ে দেন। জাফনা, অনুরাধাপুরা ও মালিগাওয়িলার মতো তুলনামূলক কম পরিচিত জায়গা ঘুরে দেখেন তিনি।

এরপর কয়েক মাস ধরে নিয়মিত ফোনে কথা ও বার্তা আদান-প্রদান চলতে থাকে দুজনের মধ্যে। মাঝে মাঝে দেখা হলেও সম্পর্ক নিয়ে দুজনই সতর্ক ছিলেন। প্রথম পরিচয়ের প্রায় ছয় মাস পর তারা সিদ্ধান্ত নেন, সম্পর্কটিকে সত্যিই একটি সুযোগ দেবেন।

দুই বছরেরও বেশি সময় পরও একসঙ্গে আছেন লিডিয়া ও সুরঙ্গা। এর মধ্যে তারা শ্রীলঙ্কার বিভিন্ন কম পরিচিত অঞ্চল ঘুরে দেখেছেন। মান্নারে ঘুরেছেন, দেখেছেন দেশটির বৃহত্তম বাওবাব গাছ। উইলপাত্তু ন্যাশনাল পার্কে ভোর ৪টায় উঠে পাখি ও বানরের ছবি তুলেছেন।

লিডিয়ার কাছে শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতা একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে—গ্রুপ ট্যুর এখনো তার পছন্দের ভ্রমণপদ্ধতি নয়। নির্দিষ্ট সময়সূচির ভ্রমণের বদলে তিনি ধীরগতিতে এবং প্রচলিত পর্যটনপথের বাইরে ঘুরতেই বেশি পছন্দ করেন। কিন্তু নিজের স্বাচ্ছন্দ্যের বাইরে গিয়ে নেওয়া সেই সিদ্ধান্তই তাকে এমন একজন মানুষের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে, যার সঙ্গে অন্য কোনোভাবে হয়তো তার কখনো দেখা হতো না।

লিডিয়ার উপলব্ধি, কখনো কখনো যে পথকে ভুল মনে হয়, শেষ পর্যন্ত সেই পথই মানুষকে ঠিক সেই জায়গায় পৌঁছে দেয়, যেখানে তার আসলে পৌঁছানো প্রয়োজন।

Advertisements
নারীপ্রেমশ্রীলঙ্কা