বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনমঙ্গলবার, ১১ আগস্ট, ২০২৬
নারী

যেদিন বাবা চলে গেলেন, সেদিনই পরীক্ষা; ঋতুর জিপিএ-৫

যেদিন বাবা চলে গেলেন, সেদিনই পরীক্ষা; ঋতুর জিপিএ-৫

বাবা তখন হাসপাতালে মৃত। বাড়িতে চলছে মরদেহ বাড়িতে নেওয়ার প্রস্তুতি। অথচ কিছুই জানত না মেধাবী শিক্ষার্থী ঋতু খাতুন। বাবার মৃত্যুর খবর গোপন রেখেই তাকে পাঠানো হয় এসএসসি পরীক্ষার কেন্দ্রে। পরীক্ষা শেষে বাড়ি ফিরে জানতে পারে, তার বাবা আর নেই। বাবার শেষবারের মতো মুখ দেখে বিদায় জানানোর পর বুকভরা শোক নিয়েই আবার বসতে হয়েছে পরবর্তী পরীক্ষার প্রস্তুতিতে। জীবনের এমন কঠিন সময়েও হাল ছাড়েনি ঋতু। বাবার স্বপ্ন পূরণের প্রত্যয় নিয়ে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করেছে যশোরের চৌগাছার এই মেধাবী শিক্ষার্থী।

ঋতু খাতুন যশোরের চৌগাছা উপজেলার হাকিমপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে মানবিক বিভাগে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়। ফলাফলে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখলেও পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম বাবাকে হারিয়ে এখন তার উচ্চশিক্ষা নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।

ঋতু উপজেলার হাকিমপুর ইউনিয়নের হাকিমপুর গ্রামের মৃত কবির হোসেন ও রেহেনা খাতুন দম্পতির দুই মেয়ের মধ্যে ছোট। বড় মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো না হওয়ায় কবির হোসেনই ছিলেন পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। বাবার আয়ের ওপর নির্ভর করেই চলত তাদের সংসার এবং মেয়েদের পড়াশোনা।

পরিবার ও বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ক্যান্সারে আক্রান্ত বাবা কবির হোসেনকে বাড়িতে রেখেই এসএসসি পরীক্ষা শুরু করে ঋতু। পরীক্ষা চলাকালে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে যশোর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বাবার অসুস্থতার খবর জানলেও তার শারীরিক অবস্থার এতটা অবনতি হয়েছে, তা হয়তো পুরোপুরি বুঝতে পারেনি ঋতু।

Advertisements

গত ১০ মে ঋতুর ইতিহাস পরীক্ষার দিন ভোররাতে হাসপাতালে মারা যান তার বাবা কবির হোসেন। সকালে তার মরদেহ বাড়িতে আনার প্রস্তুতি শুরু হয়। কিন্তু মেয়ের পরীক্ষা যাতে নষ্ট না হয় এবং বাবার মৃত্যুর খবর জেনে সে যেন মানসিকভাবে ভেঙে না পড়ে, সে জন্য পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি ঋতুর কাছ থেকে গোপন রাখেন।

হাকিমপুর গ্রাম থেকে চৌগাছা শহরের ছারা পাইলট বালিকা বিদ্যালয় পরীক্ষা কেন্দ্র প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে। প্রতিদিনের মতো সেদিনও ঋতু পরীক্ষা দিতে কেন্দ্রে যায়। সে যখন পরীক্ষার হলে বসে ইতিহাস পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছিল, তখন বাড়িতে তার বাবার মরদেহ নিয়ে আসা হচ্ছিল। পরিবারের সদস্যরা সেদিন মেয়ের পরীক্ষার কথা চিন্তা করে বাবার মৃত্যুর খবর তাকে জানাননি।

পরীক্ষা শেষে বাড়িতে ফিরে ঋতু জানতে পারে, তার বাবা আর পৃথিবীতে নেই। যে বাবার স্নেহ ও ভালোবাসায় বড় হয়েছে, সেই বাবাকে শেষবারের মতো দেখে বিদায় জানানোর সুযোগটুকু পেলেও শোক করার মতো সময় ছিল না তার। সামনে তখনও ছিল আরও পরীক্ষা। বাবাকে হারানোর গভীর কষ্ট বুকে চেপে রেখে আবারও পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে হয়েছে তাকে।

বাবার মৃত্যুর পরও থেমে থাকেনি ঋতুর পরীক্ষা। চোখের সামনে বাবাকে হারানোর শোক, পরিবারের আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা—সবকিছুকে পাশে রেখে পরবর্তী পরীক্ষাগুলো শেষ করে সে। শেষ পর্যন্ত প্রকাশিত ফলাফলে জিপিএ-৫ অর্জন করে সে প্রমাণ করেছে, প্রতিকূল পরিস্থিতিও তার স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।

নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে ঋতু বলে, ‘বাবা বেঁচে থাকলে আমার রেজাল্ট দেখে সবচেয়ে বেশি খুশি হতেন। সবাই আমার বাবার জন্য দোয়া করবেন। বাবাকে হারানোর পর এখন আমার উচ্চশিক্ষা নিয়ে শঙ্কা হচ্ছে।’

ঋতুর এই সাফল্যে আনন্দিত তার বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সহপাঠীরা। হাকিমপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক শাহানাজ পারভীন বলেন, ঋতু অত্যন্ত মেধাবী শিক্ষার্থী। সে ভালো ফল করবে—এমন প্রত্যাশা শিক্ষকদের আগে থেকেই ছিল। অসুস্থ বাবার চিকিৎসা, পরিবারের আর্থিক সংকট এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও ঋতু নিজের পড়াশোনা চালিয়ে গেছে। বাবার মৃত্যুর মতো কঠিন পরিস্থিতিও তার মনোবল ভাঙতে পারেনি।

তিনি বলেন, ‘ঋতু ভবিষ্যতেও ভালো করবে বলে আমরা আশাবাদী। বাবাহারা এই মেধাবী শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষা যেন অর্থের অভাবে থেমে না যায়, সেজন্য সমাজের বিত্তবান ও সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের তার পাশে দাঁড়ানো প্রয়োজন। শিক্ষা বৃত্তি বা আর্থিক সহযোগিতা পেলে ঋতুর উচ্চশিক্ষার পথ সহজ হবে।’

ঋতুর ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবন নিয়ে আশাবাদী উপজেলা প্রশাসনও। চৌগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারজানা ইসলাম বলেন, ঋতুর জিপিএ-৫ অর্জনের খবর অত্যন্ত আনন্দের। এমন প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও তার এই সাফল্য প্রশংসনীয়। উপজেলা প্রশাসন এই অদম্য মেধাবী শিক্ষার্থীর পাশে থাকবে। তার উচ্চশিক্ষার বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করার চেষ্টা করা হবে।

বাবাকে হারানোর শোককে শক্তিতে পরিণত করে ঋতুর এই সাফল্য শুধু একটি জিপিএ-৫ পাওয়ার গল্প নয়; এটি প্রতিকূলতার কাছে হার না মানা এক মেধাবী শিক্ষার্থীর গল্প। এখন ঋতুর স্বপ্ন উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়া এবং বাবার স্বপ্ন পূরণ করা। তবে সেই স্বপ্ন পূরণের পথে পরিবারের আর্থিক সংকট যেন বাধা হয়ে না দাঁড়ায়—এ জন্য সমাজের সামর্থ্যবান মানুষ ও সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতাই এখন তার সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।

Advertisements
ঋতুএসএসসিজিপিএ-৫পরীক্ষা