ঠোঁটের বিতর্ক থেকে কসমেটিকস সাম্রাজ্য, ২৯-এ কাইলির সম্পদ ৮ হাজার কোটি টাকা

কিশোরী বয়সে ঠোঁটের আকৃতি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা, এরপর নিজের নামে প্রসাধনী ব্যবসা, বিপুল অর্থের মালিকানা, প্রেম ও বিচ্ছেদ—কাইলি জেনারের জীবন যেন একের পর এক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কার্ডাশিয়ান-জেনার পরিবারের সদস্য হিসেবে ছোটবেলা থেকেই ক্যামেরার সামনে থাকলেও সময়ের সঙ্গে নিজের আলাদা পরিচয় তৈরি করেছেন তিনি।

আজ ১০ আগস্ট ২৯ বছরে পা দিয়েছেন কাইলি জেনার। জন্মদিন উপলক্ষে এরই মধ্যে শুরু হয়েছে নানা আয়োজন। বেভারলি হিলসের বাড়িতে ‘প্রিন্সেস কিটি’ থিমে আয়োজিত একটি পার্টিতে গোলাপি সাজে দেখা যায় তাকে। সেখানে পরিবারের সদস্য কিম কার্ডাশিয়ান, খোলো কার্ডাশিয়ান, কেন্ডাল জেনারসহ ঘনিষ্ঠ অনেকেই উপস্থিত ছিলেন। ছিলেন হেইলি বিবারও। তবে কাইলির বর্তমান প্রেমিক টিমোথি শ্যালামে ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কি না, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
২৯ বছর বয়সে এসে কাইলির পরিচয় আর শুধু জনপ্রিয় টেলিভিশন পরিবারের সদস্য হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই। প্রসাধনী, ত্বক পরিচর্যা, পোশাক ও পানীয়—বিভিন্ন খাতে নিজের ব্যবসায়িক উপস্থিতি তৈরি করেছেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিশাল অনুসারীকে কাজে লাগিয়ে নিজের নামকেই পরিণত করেছেন শক্তিশালী বাণিজ্যিক ব্র্যান্ডে।
রিয়েলিটি শো থেকে ব্যবসার দুনিয়ায়
কাইলি জেনারের পরিচিতির শুরু ‘কিপিং আপ উইথ দ্য কার্ডাশিয়ানস’ রিয়েলিটি শো থেকে। পরিবারের অন্য সদস্যদের মতো তিনিও ছোট বয়স থেকেই টেলিভিশনের ক্যামেরার সামনে বড় হয়েছেন। ফলে মানুষের সামনে তার বেড়ে ওঠা, ব্যক্তিগত জীবন ও পরিবর্তন—সবকিছুই ছিল দৃশ্যমান।
তবে কাইলি খুব দ্রুত বুঝতে পারেন, শুধু টেলিভিশন তারকা হিসেবে পরিচিত থাকলে তার সম্ভাবনার পুরোটা কাজে লাগানো সম্ভব হবে না। সেই ভাবনা থেকেই ২০১৫ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে শুরু করেন ‘কাইলি কসমেটিকস’।

ব্যবসা শুরুর জন্য নিজের উপার্জন থেকে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার ডলার বিনিয়োগ করেছিলেন তিনি। তার প্রথম বড় পণ্য ছিল ‘লিপ কিট’, যেখানে লিপ লাইনার ও লিপস্টিক একসঙ্গে দেওয়া হতো। বাজারে আসার পর প্রথম দফায় প্রায় ১৫ হাজার কিট দ্রুত বিক্রি হয়ে যায়।
এর পেছনে ছিল কাইলির বিশাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক জনপ্রিয়তা। প্রচলিত বিজ্ঞাপনের ওপর নির্ভর না করে নিজের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টকেই তিনি পণ্যের প্রচারের প্রধান মাধ্যম বানান। নিজের ছবি, মেকআপের ভিডিও এবং নতুন পণ্যের প্রচারণার মাধ্যমে সরাসরি সম্ভাব্য ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে যান।
এই কৌশল পরবর্তী সময়ে ইনফ্লুয়েন্সার মার্কেটিংয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে ওঠে। অর্থাৎ কাইলি শুধু একটি প্রসাধনী বিক্রি করেননি, নিজের জনপ্রিয়তা ও ব্যক্তিগত পরিচিতিকেও ব্যবসার অংশে পরিণত করেছিলেন।
৬০০ মিলিয়ন ডলারের চুক্তিতে বড় পরিবর্তন
কাইলির ব্যবসায়িক ক্যারিয়ারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে ২০২০ সালে। সে সময় সৌন্দর্যপণ্য প্রতিষ্ঠান কোটির কাছে কাইলি কসমেটিকসের ৫১ শতাংশ অংশীদারত্ব বিক্রি করা হয় ৬০০ মিলিয়ন ডলারে।
এই চুক্তির ফলে কাইলির হাতে আসে বিপুল অর্থ। ফোর্বসের হিসাব অনুযায়ী, কর দেওয়ার আগে ওই চুক্তি থেকে তার আয় ছিল প্রায় ৫৪০ মিলিয়ন ডলার। একই সময়ে কোম্পানির উল্লেখযোগ্য অংশের মালিকানা তার কাছেই থেকে যায়।
এই চুক্তি কাইলির ব্যবসার পরিসর কতটা বড় হয়েছিল, তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তবে এর পরই তার সম্পদ নিয়ে শুরু হয় বড় ধরনের বিতর্ক।

বিলিয়নিয়ার পরিচয় নিয়ে বিতর্ক
২০১৯ সালে ফোর্বস কাইলি জেনারকে বিশ্বের সবচেয়ে কম বয়সী ‘সেলফ-মেড বিলিয়নিয়ার’ হিসেবে উল্লেখ করেছিল। সেই পরিচিতি তখন ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করে। তবে মাত্র এক বছর পরেই সেই হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তোলে একই প্রতিষ্ঠান।
২০২০ সালে ফোর্বসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, কাইলি কসমেটিকসের প্রকৃত বিক্রি ও ব্যবসার আকার সম্পর্কে পূর্বে যে তথ্য দেওয়া হয়েছিল, তা নিয়ে অসঙ্গতি রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক নথি ও অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করে কাইলির সম্পদের হিসাব পুনর্মূল্যায়ন করে ফোর্বস।
এরপর কাইলিকে আর বিলিয়নিয়ার হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়নি। সে সময় তার সম্পদের পরিমাণ ৯০০ মিলিয়ন ডলারের কিছুটা কম বলে হিসাব করা হয়েছিল।
কাইলি অবশ্য ফোর্বসের ওই মূল্যায়ন মেনে নেননি। তার পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, বিলিয়নিয়ার হিসেবে পরিচিত হওয়ার জন্য তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো মিথ্যা তথ্য দেননি।
পরবর্তী বছরগুলোতেও তার সম্পদ বিপুল থাকলেও বিলিয়নিয়ারের সেই তকমা আর ফিরে আসেনি। ফোর্বসের ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, কাইলি জেনারের মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৬৭০ মিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৮ হাজার কোটি টাকারও বেশি।
প্রসাধনীর বাইরেও কাইলির ব্যবসা

কাইলির ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য এখন শুধু কাইলি কসমেটিকসকে ঘিরে নেই। নিজের নামে তিনি চালু করেছেন ‘কাইলি স্কিন’, যেখানে ত্বক পরিচর্যার বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করা হয়।
এর পাশাপাশি পানীয় ও ফ্যাশন খাতেও তার ব্যবসা রয়েছে। ২০২৩ সালে চালু হওয়া তার পোশাকের ব্র্যান্ডকে ২০২৬ সালে নতুনভাবে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ব্র্যান্ডটির নকশা ও ব্যবসায়িক কৌশলেও পরিবর্তন আনা হয়েছে।
‘ভোগ’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দ্রুত বদলে যাওয়া ফ্যাশন ট্রেন্ডের পেছনে না ছুটে ব্র্যান্ডটির নিজস্ব ও দীর্ঘস্থায়ী পরিচয় তৈরির দিকে এবার বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন কাইলি।
ব্যবসার সিদ্ধান্ত গ্রহণেও তিনি সরাসরি যুক্ত থাকেন। ২০২৬ সালের এক সাক্ষাৎকারে কাইলি জানান, পণ্যের নমুনা পরীক্ষা করা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ডিজাইন ও আইডিয়া নিয়ে কাজ করা—ব্র্যান্ডের নানা পর্যায়েই তার অংশগ্রহণ রয়েছে।
তার একটি সহযোগী কালেকশন বাজারে আসার পর প্রথম এক ঘণ্টার মধ্যেই ১০ লাখ ডলারের বেশি বিক্রি হয়েছিল বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
যে ঠোঁট নিয়ে শুরু হয়েছিল আলোচনা
কাইলির জনপ্রিয়তার সঙ্গে তার ঠোঁটের গল্পও ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। কিশোরী বয়সেই তার ঠোঁটের আকৃতি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। অনেকেই জানতে চাইতেন, অল্প সময়ের মধ্যে তার ঠোঁটের চেহারায় এত পরিবর্তন কীভাবে এলো।
প্রথমদিকে বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে বিস্তারিত কথা বলেননি কাইলি। পরে ২০১৫ সালে তিনি স্বীকার করেন, ঠোঁটে অস্থায়ী ফিলার ব্যবহার করেছিলেন।
কাইলির ভাষ্য অনুযায়ী, ঠোঁট নিয়ে নিজের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা কাজ করত। সেই কারণেই তিনি পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
পরে সেই পরিবর্তিত চেহারাই তার ব্যবসার অন্যতম পরিচিত বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়ায়। কাইলি কসমেটিকসের প্রথম পণ্যের সঙ্গে তার ঠোঁটের সেই পরিচিতি সরাসরি যুক্ত হয়।
এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়ে যায় ‘কাইলি জেনার চ্যালেঞ্জ’। অনেকেই বিভিন্ন অস্বাভাবিক ও ঝুঁকিপূর্ণ পদ্ধতি ব্যবহার করে কাইলির মতো ঠোঁট তৈরি করার চেষ্টা করতে থাকেন। বিষয়টি নিয়ে একসময় কাইলিকেই অনুসারীদের সতর্ক করতে হয়, যাতে তাকে অনুকরণ করতে গিয়ে কেউ বিপজ্জনক কোনো পদ্ধতি ব্যবহার না করেন।

সৌন্দর্যের ধারণা নিয়েও সমালোচনা
কাইলির জনপ্রিয়তা যেমন তাকে ব্যবসায়িকভাবে সফল করেছে, তেমনি তার সৌন্দর্যের ধরন নিয়ে তৈরি হয়েছে বিতর্কও। মোটা ঠোঁট, মুখের নির্দিষ্ট গড়ন এবং শরীরের বিশেষ আকৃতিকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে সৌন্দর্যের ধারণা জনপ্রিয় হয়েছে, তার সঙ্গে কাইলির নাম বহুবার এসেছে।
সমালোচকদের একটি অংশের অভিযোগ, কাইলির জনপ্রিয়তা তরুণীদের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট ধরনের সৌন্দর্য অর্জনের চাপ তৈরি করেছে।
২০১৯ সালে যুক্তরাজ্যের বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রক সংস্থা এএসএ কাইলির ছবি ব্যবহার করে তৈরি কয়েকটি প্রসাধনী চিকিৎসার বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ করেছিল। ওই বিজ্ঞাপনগুলোতে এমনভাবে প্রচারণা চালানো হয়েছিল, যাতে কাইলির মতো চেহারা পাওয়ার ধারণা তৈরি হয়।
তবে সময়ের সঙ্গে নিজের অবস্থানেও পরিবর্তন এনেছেন কাইলি। ২০২৩ সালে ‘দ্য কার্ডাশিয়ানস’-এর একটি পর্বে সৌন্দর্যের প্রচলিত মানদণ্ড নিয়ে কথা বলেন তিনি। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, বিশেষ করে তার মেয়ের ওপর একই ধরনের সৌন্দর্যচাপ না পড়ার বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
প্রেমের জীবনে টাইগা ও ট্রাভিস স্কট
ব্যবসার মতো কাইলির ব্যক্তিগত জীবনও বরাবরই সংবাদমাধ্যমের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু।
তরুণ বয়সে র্যাপার টাইগার সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। কাইলির ১৭তম জন্মদিনের সময় তাদের ঘনিষ্ঠতার খবর ছড়ায়। পরে কাইলি ১৮ বছর বয়সে তাদের সম্পর্ক প্রকাশ্যে আসে। তখন টাইগার বয়স ছিল ২৬।
২০১৬ সালে সেই সম্পর্কের ইতি ঘটে।
এরপর কাইলির জীবনে আসেন র্যাপার ট্রাভিস স্কট। ২০১৭ সালে কোচেল্লা উৎসবকে কেন্দ্র করে তাদের ঘনিষ্ঠতার খবর সামনে আসে। সম্পর্কটি দ্রুতই গভীর হয় এবং ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাদের প্রথম সন্তান স্টর্মির জন্ম হয়।
২০২২ সালে তাদের দ্বিতীয় সন্তান, ছেলে আইয়ার জন্ম নেয়।
তবে কাইলি ও ট্রাভিসের সম্পর্ক স্থায়ীভাবে এগোয়নি। মাঝেমধ্যে সম্পর্কের উন্নতি হলেও তাদের মধ্যে একাধিকবার বিচ্ছেদ হয়েছে। ২০২৩ সালের শুরুতে তারা আবার আলাদা হয়ে যান।
তখন বিভিন্ন সূত্রের বরাতে সংবাদমাধ্যমে বলা হয়েছিল, দুজনের জীবনযাপনের ধরন অনেকটাই ভিন্ন। কাইলির সময়ের বড় অংশ সন্তান ও পরিবারকে ঘিরে কাটলেও ট্রাভিসের জীবন ছিল সংগীত, স্টুডিও, অনুষ্ঠান ও বন্ধুদের নিয়ে বেশি ব্যস্ত।
ট্রাভিসের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে প্রতারণার অভিযোগও উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের সবগুলো প্রমাণিত নয়। ২০২২ সালে এক নারী ট্রাভিসের সঙ্গে সম্পর্কের দাবি করলে তিনি তা অস্বীকার করেছিলেন। তাই কাইলি ও ট্রাভিসের সম্পর্ক ভাঙার নির্দিষ্ট কারণ হিসেবে এসব অভিযোগকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
নতুন অধ্যায় টিমোথি শ্যালামের সঙ্গে
ট্রাভিসের পর কাইলির জীবনে সবচেয়ে বেশি আলোচিত ব্যক্তি অভিনেতা টিমোথি শ্যালামে। ২০২৩ সালে তাদের সম্পর্কের খবর প্রকাশ্যে আসে।
শুরুতে এই জুটি অনেকের কাছে বেশ অপ্রত্যাশিত ছিল। কাইলি একদিকে রিয়েলিটি টেলিভিশন ও ব্যবসার জগতের পরিচিত মুখ, অন্যদিকে টিমোথি হলিউডের অন্যতম আলোচিত তরুণ অভিনেতা।
তবে সময়ের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক বেশ স্থায়ী রূপ পেয়েছে। ‘পিপল’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে একসঙ্গে থাকা কাইলি ও টিমোথি বর্তমানে সম্পর্কে সুখী। তবে বিয়ের বিষয়ে দুজনই তাড়াহুড়ো করতে চাইছেন না।
২০২৬ সালেও বিভিন্ন বড় আয়োজনে তাদের একসঙ্গে দেখা গেছে। অস্কার, ক্রিটিকস চয়েস অ্যাওয়ার্ডস এবং বিশ্বকাপ ফাইনালের মতো অনুষ্ঠানে তাদের উপস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
বিতর্ক পিছু ছাড়েনি
কাইলি জেনারের জনপ্রিয়তার পাশাপাশি বিতর্কও যেন তার ক্যারিয়ারের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে।
সবচেয়ে বড় বিতর্ক ছিল তার বিলিয়নিয়ার পরিচয় নিয়ে। একসময় বিশ্বের সবচেয়ে কম বয়সী ‘সেলফ-মেড বিলিয়নিয়ার’ হিসেবে পরিচিতি পেলেও পরে ফোর্বসের পুনর্মূল্যায়নে সেই দাবি প্রশ্নের মুখে পড়ে।
এর বাইরে তার চেহারার পরিবর্তন, কসমেটিক ফিলার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সৌন্দর্যের নির্দিষ্ট ধারণা প্রচার এবং বিভিন্ন প্রসাধনী চিকিৎসার বিজ্ঞাপনে তার ছবি ব্যবহারের বিষয় নিয়েও সমালোচনা হয়েছে।
২০২২ সালে ব্যক্তিগত জেট ব্যবহারের বিষয়টিও তাকে সমালোচনার মুখে ফেলে। খুব অল্প দূরত্বের যাত্রায় ব্যক্তিগত বিমান ব্যবহারের তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর পরিবেশ সচেতন অনেকেই তার জীবনযাপন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
তবে এসব বিতর্কের কোনোটিই কাইলির জনপ্রিয়তা বা ব্যবসায়িক প্রভাবকে বড় ধরনের ধাক্কা দিতে পারেনি। বরং অনেক সময় বিতর্ক তার নামকে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছে।

৩৯ কোটি অনুসারীই বড় ব্যবসায়িক শক্তি
কাইলির ব্যবসার সবচেয়ে বড় সম্পদগুলোর একটি হলো তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিশাল অনুসারী। ২০২৬ সালের হিসাবে ইনস্টাগ্রামে তার অনুসারীর সংখ্যা প্রায় ৩৯ কোটি।
এই বিশাল দর্শক-ভিত্তিই কাইলির ব্যবসাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। নতুন কোনো লিপস্টিক, পোশাক, সুগন্ধি বা পানীয় বাজারে আনার আগে প্রচলিত বিজ্ঞাপনের পাশাপাশি নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করেন তিনি।
নিজের অ্যাকাউন্টে একটি পণ্য প্রকাশ করার অর্থ হলো একই সময়ে কোটি কোটি সম্ভাব্য ক্রেতার কাছে পৌঁছে যাওয়া।
এ কারণে কাইলির ব্যবসায়িক মডেলকে শুধু পণ্য বিক্রির ব্যবসা হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। তিনি একই সঙ্গে নিজের জীবনযাপন, ফ্যাশন, সৌন্দর্যচর্চা এবং ব্যক্তিগত পরিচিতিকে বাণিজ্যিক সম্পদে পরিণত করেছেন।
২৯ বছরে কাইলির পরিচয় কতটা বদলেছে
মাত্র ২৯ বছর বয়সেই কাইলি জেনার একাধিক পরিচয় তৈরি করতে পেরেছেন। তিনি এখন শুধু কার্ডাশিয়ান-জেনার পরিবারের সদস্য নন; তিনি উদ্যোক্তা, প্রসাধনী ব্যবসার মালিক, ফ্যাশন ব্র্যান্ডের উদ্যোক্তা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবশালী তারকা এবং দুই সন্তানের মা।
মেয়ে স্টর্মি ও ছেলে আইয়ার তার ব্যক্তিগত জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ব্যবসার পাশাপাশি ভবিষ্যতে নিজের তৈরি প্রতিষ্ঠানগুলোকে পারিবারিক ব্যবসায় পরিণত করার ইচ্ছার কথাও জানিয়েছেন তিনি। বিশেষ করে কাইলি কসমেটিকসকে দীর্ঘমেয়াদে একটি পারিবারিক ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার স্বপ্ন রয়েছে তার।
অন্যদিকে ব্যক্তিগত জীবনেও আগের তুলনায় কিছুটা স্থিরতা দেখা যাচ্ছে। টিমোথি শ্যালামের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে নানা আলোচনা থাকলেও দুজনই আপাতত নিজেদের সম্পর্ককে সময় দিতে চান। বিয়ের মতো বড় সিদ্ধান্তে তাড়াহুড়ো করার ইচ্ছা তাদের নেই।
কিশোরী বয়সে নিজের ঠোঁট নিয়ে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা থেকে যে গল্পের শুরু, সেটিই শেষ পর্যন্ত তাকে নিয়ে গেছে বিলিয়ন ডলারের ব্যবসায়িক আলোচনায়। মাঝখানে এসেছে সাফল্য, সমালোচনা, বিতর্ক, প্রেম, বিচ্ছেদ এবং নিজের সৌন্দর্য নিয়ে নতুন করে ভাবার সময়। ২৯ বছরে দাঁড়িয়ে কাইলি জেনারের সবচেয়ে বড় অর্জন সম্ভবত এটিই—নিজের জনপ্রিয়তাকে শুধু খ্যাতি হিসেবে না রেখে সেটিকে একটি দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক পরিচয়ে রূপ দিতে পেরেছেন তিনি।



