সবাইকে খুশি রাখতে গিয়ে নিজেকেই হারাচ্ছেন? নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধেও ‘হ্যাঁ’ বলে ফেলছেন?

কাউকে কষ্ট দিতে চান না। তাই নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়েও ‘হ্যাঁ’ বলে ফেলেন। নিজের কাজ জমে থাকলেও বন্ধুর অনুরোধ রাখেন, ক্লান্ত শরীর নিয়েও কারও মন খারাপ হবে ভেবে দায়িত্ব নিয়ে নেন। কেউ আপনার আচরণে অসন্তুষ্ট হলে ভেতরে ভেতরে অস্বস্তি শুরু হয়- ‘আমি কি কিছু ভুল করলাম?’
অন্যকে ভালো রাখা বা সহযোগিতা করা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক গুণ। কিন্তু যখন অন্যের অনুমোদন, প্রশংসা কিংবা মন রক্ষা করতে গিয়ে নিজের প্রয়োজন, সীমা ও অনুভূতিকে নিয়মিত উপেক্ষা করতে হয়, তখন সেটি হয়ে উঠতে পারে ‘people-pleasing’ বা অতিরিক্ত মানুষকে খুশি রাখার প্রবণতা।

পিপল-প্লিজিং আসলে কী?
সহজভাবে বললে, পিপল-প্লিজিং হলো অন্যের মন জোগাতে গিয়ে নিজের প্রয়োজনকে বারবার পেছনে সরিয়ে রাখা। এমন মানুষ অনেক সময় ‘না’ বলতে অস্বস্তি বোধ করেন। অন্য কেউ রেগে গেলে বা হতাশ হলে তার দায় নিজের কাঁধে তুলে নেন। নিজের মতের সঙ্গে না মিললেও শুধু সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার ভয়েই সম্মতি দেন। তবে মনে রাখতে হবে, ভদ্র, সহানুভূতিশীল বা সহযোগী হওয়া আর people-pleasing এক বিষয় নয়। পার্থক্যটা মূলত ইচ্ছা ও সীমার জায়গায়। আপনি নিজের ইচ্ছায় কাউকে সাহায্য করছেন- এটি healthy kindness। কিন্তু সাহায্য করতে না চাইলেও অপরাধবোধ, প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয় বা সম্পর্ক হারানোর আশঙ্কায় রাজি হয়ে গেলে সেটি people-pleasing-এর দিকে যেতে পারে।

কেন এমন প্রবণতা তৈরি হয়?
এর পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। ছোটবেলা থেকেই যদি কেউ শিখে থাকেন যে ‘ভালো মানুষ’ মানেই সবার কথা শুনতে হবে, কাউকে কষ্ট দেওয়া যাবে না, নিজের চাহিদার চেয়ে অন্যের প্রয়োজন বেশি গুরুত্বপূর্ণ- তাহলে বড় হয়ে সেই ধারণা আচরণে প্রভাব ফেলতে পারে। আবার অতীতের কোনো সম্পর্কের অভিজ্ঞতা, প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয়, আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি কিংবা অতিরিক্ত সমালোচনার অভিজ্ঞতাও মানুষকে অন্যের অনুমোদনের ওপর বেশি নির্ভরশীল করে তুলতে পারে।
সবসময় ‘হ্যাঁ’ বলার মূল্যটা কে দেয়?
সবাইকে খুশি রাখতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন আপনি নিজেই।

মানসিক ক্লান্তি:প্রতিটি মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করতে গেলে নিজের জন্য সময় ও মানসিক শক্তি কমে যায়। ক্রমাগত অন্যের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিতে দিতে একসময় ভেতরে ভেতরে ক্লান্তি জমতে থাকে।

নিজের চাহিদা ভুলে যাওয়া:‘সে কী চাইছে?’- এই প্রশ্ন করতে করতে একসময় ‘আমি কী চাই?’ প্রশ্নটির উত্তরই অস্পষ্ট হয়ে যেতে পারে।
ক্ষোভ জমা হওয়া: মুখে ‘সমস্যা নেই’ বললেও ভেতরে বিরক্তি তৈরি হতে পারে। কারণ আপনি হয়তো এমন অনেক কাজ করছেন, যা আসলে করতে চান না।
আত্মসম্মান ও আত্মবিশ্বাসে প্রভাব: সব সিদ্ধান্তে অন্যের অনুমোদনের ওপর নির্ভর করলে নিজের বিচারবোধের ওপর আস্থা কমতে পারে।
সীমারেখা দুর্বল হয়ে যাওয়া: আপনি কোথায় রাজি, কোথায় রাজি নন-সেটি স্পষ্ট না থাকলে অন্যরা অনিচ্ছাকৃতভাবেও আপনার সীমা অতিক্রম করতে পারে।
সম্পর্কেও সমস্যা তৈরি হতে পারে: অদ্ভুতভাবে, সবাইকে খুশি করার চেষ্টা সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলতে পারে। কারণ নিজের প্রকৃত অনুভূতি না জানিয়ে সবসময় সম্মতি দিলে সম্পর্কের অন্য পক্ষও আপনার আসল প্রয়োজন বুঝতে পারে না।
তাহলে কি ‘না’ বলা শিখতে হবে?
অবশ্যই। তবে ‘না’ বলা মানে রূঢ় হওয়া নয়। বরং এটি healthy boundary তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কেউ কোনো কাজের অনুরোধ করলে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দেওয়ার বদলে বলতে পারেন, ‘আমি একটু ভেবে জানাচ্ছি।’ এতে নিজের সময় ও সামর্থ্য বিবেচনা করার সুযোগ পাবেন। কাজটি সম্ভব না হলে বলতে পারেন, ‘এই মুহূর্তে আমি এটা নিতে পারছি না।’ অতিরিক্ত ব্যাখ্যা দেওয়ারও প্রয়োজন নেই। ‘না’ বলার পর দীর্ঘ যুক্তি দিয়ে নিজের সিদ্ধান্তকে বৈধ প্রমাণ করার প্রয়োজন নেই।
Networking আর People-pleasing কি একই?

এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। ক্যারিয়ার বা সামাজিক জীবনে networking প্রয়োজনীয়। ভালো সম্পর্ক তৈরি করা, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা, অন্যের কাজকে সম্মান করা- এসবই networking-এর অংশ। কিন্তু networking-এর অর্থ সবাইকে খুশি রাখা নয়। Healthy networking হলো পারস্পরিক সম্পর্ক তৈরি করা- যেখানে আপনি অন্যকে সম্মান করবেন, সাহায্য করবেন, প্রয়োজন হলে সহযোগিতা করবেন এবং একই সঙ্গে নিজের মূল্য ও সীমারেখাও বজায় রাখবেন। অন্যদিকে people-pleasing-এ সম্পর্কটি অনেক সময় একতরফা হয়ে যায়। আপনি সাহায্য করছেন কারণ সত্যিই করতে চান- নাকি ‘না বললে সে আমাকে অপছন্দ করবে’- এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ।
কীভাবে healthy networking বাড়াবেন?
প্রথমত, মানুষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখুন। পরিচিত কেউ নতুন চাকরি, প্রজেক্ট বা সাফল্যের কথা জানালে আন্তরিকভাবে শুভেচ্ছা জানান। সব যোগাযোগের পেছনে কোনো ব্যক্তিগত লাভ থাকতে হবে- এমন নয়।
দ্বিতীয়ত, শুধু প্রয়োজনের সময় যোগাযোগ করবেন না। কাউকে কোনো কাজের জন্য দরকার হলেই message করার বদলে মাঝেমধ্যে খোঁজ নিন, তার কাজ সম্পর্কে আগ্রহ দেখান।
তৃতীয়ত, আগে শুনুন। Networking মানে নিজের পরিচয় বা অর্জনের তালিকা শোনানো নয়। অন্য মানুষের কাজ, আগ্রহ ও অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানতে চাওয়াও networking-এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
চতুর্থত, নিজের দক্ষতা ও আগ্রহ পরিষ্কার রাখুন। আপনি কী করেন, কী বিষয়ে দক্ষ এবং কোন ধরনের কাজ করতে আগ্রহী—এসব পরিষ্কারভাবে জানলে সঠিক মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করা সহজ হয়। ছোট সহযোগিতাকে গুরুত্ব দিন। কাউকে একটি দরকারি তথ্য দেওয়া, কোনো ভালো resource শেয়ার করা কিংবা উপযুক্ত কারও সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া—এসব ছোট কাজও দীর্ঘমেয়াদি পেশাগত সম্পর্ক তৈরি করতে পারে। ‘না’ বলার ক্ষমতাও networking-এর অংশ। প্রত্যেক অনুরোধ রাখা সম্ভব নয়। নিজের সময়, সামর্থ্য ও সীমারেখা সম্মান করতে পারলে বরং মানুষ আপনার অবস্থানকে আরও পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারে।

নিজেকে একটি প্রশ্ন করুন
কাউকে সাহায্য করার আগে নিজেকে জিজ্ঞেস করুন- ‘আমি কি সত্যিই এটা করতে চাই, নাকি না বললে সে আমাকে খারাপ ভাববে বলে রাজি হচ্ছি?’ উত্তরটি যদি বারবার দ্বিতীয়টি হয়, তাহলে একটু থামা দরকার। ভালো মানুষ হওয়ার জন্য সবাইকে খুশি করা জরুরি নয়। বরং নিজের প্রয়োজনকে সম্মান করে, অন্যের সীমারেখাকে সম্মান করে এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে সম্পর্ক তৈরি করাই বেশি স্বাস্থ্যকর।
কারণ জীবনে মানুষের সংখ্যা যত বেশি থাকুক, নিজের সঙ্গে সম্পর্কটাই সবচেয়ে দীর্ঘ। আর সেই সম্পর্কটিতে যদি সবসময় অন্যদের খুশি করতে গিয়ে নিজের কথাটাই না শোনা হয়, তাহলে একসময় ভিড়ের মধ্যেও নিজেকে ভীষণ একা মনে হতে পারে।



