বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনশনিবার, ৮ আগস্ট, ২০২৬
বিনোদন

শিশুর চোখে পরিবারের নীরব ভাঙনের গল্প ‘ব্লু হেরন’

IMG_3302

হঠাৎ করেই পরিবারের বড় শিশুটি অস্বাভাবিক আচরণ করতে শুরু করে। শুরুতে তাকে শাসন করা হলেও ধীরে ধীরে সামনে আসে অদ্ভুত সব ঘটনা। মানসিকভাবে সংকটে পড়ে শিশুটি। কোনো বিস্ফোরক ঘটনার ওপর নির্ভর না করে একটি পরিবারের ভেতরে জমে থাকা অপ্রকাশিত বেদনা, মানসিক সংকট ও শৈশবের স্মৃতিকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়েছে কানাডীয় চলচ্চিত্র ‘ব্লু হেরন’।

সিনেমাটি নির্মাণ করেছেন কানাডীয় পরিচালক সফি রোমভারি। এটি তাঁর প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। সিনেমাটি টরন্টো ও লোকার্ন চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়ে পুরস্কার ও প্রশংসা পেয়েছে। নিজের শৈশবের অভিজ্ঞতা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে সিনেমাটি নির্মাণ করেছেন পরিচালক।

‘ব্লু হেরন’-এর গল্পের প্রেক্ষাপট ১৯৯০-এর দশকের শেষভাগ। হাঙ্গেরি থেকে কানাডায় অভিবাসী হয়ে আসা ছয় সদস্যের একটি পরিবার ভ্যাঙ্কুভার আইল্যান্ডের একটি বাড়িতে বসবাস শুরু করে। নতুন দেশ, নতুন বাড়ি ও নতুন পরিবেশ—সবকিছু মিলিয়ে তাদের জীবনে তৈরি হয় নতুন শুরুর সম্ভাবনা। শুরুতে সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলেও ধীরে ধীরে পরিবারের ভেতরের অস্থিরতা সামনে আসতে থাকে।

গল্পটি বলা হয়েছে পরিবারের সবচেয়ে ছোট সদস্য আট বছর বয়সী সাশার চোখ দিয়ে। শিশুটির সরল পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে দর্শক ধীরে ধীরে বুঝতে পারেন, পরিবারের বাইরের শান্ত জীবনের আড়ালে জমে আছে ভয়, অস্থিরতা ও না-বলা অসংখ্য কথা।

Advertisements

নিজের জন্মস্থান ছেড়ে নতুন দেশে এসে শিশুরা নিজেদের মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিল। এর মধ্যেই সংকট তৈরি হয় সাশার বড় ভাই জেরেমিকে ঘিরে। সময়ের সঙ্গে তার আচরণ অস্বাভাবিক হয়ে ওঠে। কখনো তীব্র রাগ, কখনো হঠাৎ করে হারিয়ে যাওয়া, আবার কখনো ধ্বংসাত্মক আচরণ পুরো পরিবারকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দেয়।

মা-বাবা বুঝে উঠতে পারেন না, কীভাবে ছেলেকে সামলাবেন। শাসন করবেন, নাকি ভালোবাসা দিয়ে আগলে রাখবেন—এই দ্বিধা থেকেই তৈরি হয় আরও বড় সংকট। অন্যদিকে ছোট্ট সাশা ধীরে ধীরে উপলব্ধি করতে শুরু করে, বড়দের পৃথিবী সব সময় যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। পরিবারের অনেক সমস্যারও কোনো সহজ সমাধান নেই। এসব ঘটনা তার শিশুমনে তৈরি করে অস্থিরতা ও গভীর প্রভাব।

সিনেমাটিকে শুধু পারিবারিক নাটক হিসেবে দেখলে এর বড় একটি দিক বাদ পড়ে যায়। শৈশবের স্মৃতি, অভিবাসী জীবনের বাস্তবতা ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়েও প্রশ্ন তোলে ‘ব্লু হেরন’। যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন, নিরাপত্তাহীনতাসহ নানা কারণে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ দেশ ছাড়ছেন। নতুন দেশে পাড়ি দেওয়ার এই অভিজ্ঞতা শিশুদের মনেও গভীর ছাপ ফেলতে পারে, যা অনেক সময় পরিবারের ভেতরের আচরণ ও সম্পর্কের মাধ্যমে প্রকাশ পায়।

‘ভ্যারাইটি’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পরিচালক বলেন, একটি শিশু পরিবারের সংকটকে যেভাবে দেখে, তা বড়দের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। শিশুর কাছে অনেক ঘটনা রহস্যময়, বিভ্রান্তিকর এবং কখনো কখনো ভয়ংকর হয়ে ওঠে।

সিনেমাটির অন্যতম শক্তি এর নির্মাণভঙ্গি। সফি রোমভারি অতিরঞ্জিত নাটকীয়তা এড়িয়ে নীরবতা, দীর্ঘ শট, ঘরের স্বাভাবিক শব্দ, প্রকৃতির দৃশ্য ও চরিত্রগুলোর সূক্ষ্ম অভিব্যক্তির মাধ্যমে গল্প এগিয়েছেন। অতিরিক্ত সংলাপের পরিবর্তে পরিবেশ, আলো-আঁধারির খেলা ও শিশুদের মনস্তাত্ত্বিক অনুভূতিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ফলে সিনেমাটি দর্শককে সহজ কোনো উত্তর দেয় না। বরং প্রশ্ন তোলে, একটি পরিবার মানসিক সংকটের মুখোমুখি হলে কীভাবে টিকে থাকে? শিশুরা বড়দের আচরণ কীভাবে বুঝতে শেখে? শৈশবের ট্রমা নিয়েই কি মানুষ বড় হতে থাকে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে সিনেমাটি পরিবার, স্মৃতি ও মানসিক ক্ষত নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।

‘ব্লু হেরন’ আলোচনায় আসার অন্যতম কারণ পরিচালকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণের পর এটি সফি রোমভারির প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা। নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে গল্প নির্মাণ করায় সিনেমাটিতে বাস্তবতার ছাপও স্পষ্ট।

লোকার্ন চলচ্চিত্র উৎসবে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পরিচালক জানান, স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ তাঁকে একজন নির্মাতা হিসেবে আত্মবিশ্বাস ও নিজস্ব ভাষা খুঁজে পেতে সাহায্য করেছে। দীর্ঘ সময় ধরে সেই ভাষা তৈরি করার পর ‘ব্লু হেরন’-এ এসে তিনি নিজেকে আরও পুরোপুরি প্রকাশ করতে পেরেছেন, কারণ গল্পটি তাঁর নিজের।

বড় কোনো নাটকীয় ঘটনার বদলে পরিবারের নীরব ভাঙন ও একটি শিশুর বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিয়েছেন পরিচালক। ধীরগতির, সংবেদনশীল ও মানবিক এই চলচ্চিত্র দর্শককে সহজ কোনো সমাধান না দিয়ে পরিবার, স্মৃতি, অভিবাসন ও মানসিক ক্ষত নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে।

কম বাজেটের এই ইন্ডি সিনেমায় সাশা চরিত্রে অভিনয় করেছেন আইয়ুল গুভেন। প্রাপ্তবয়স্ক সাশার চরিত্রে রয়েছেন অ্যামি জিমার। জেরেমি চরিত্রে অভিনয় করেছেন এডিক বেডোজ। মায়ের চরিত্রে ইরিঙ্গো রেতি এবং বাবার চরিত্রে অভিনয় করেছেন আদাম তোম্পা।

আইএমডিবিতে সিনেমাটির রেটিং ৭.১। বিশ্বের বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে সিনেমাটির প্রদর্শনী অব্যাহত রয়েছে। লোকার্ন চলচ্চিত্র উৎসব থেকে ‘ব্লু হেরন’ স্পেশাল মেনশনসহ দুটি পুরস্কার পেয়েছে। এ ছাড়া টরন্টো চলচ্চিত্র উৎসব থেকে সিনেমাটি বেস্ট কানাডিয়ান ডিসকভারি অ্যাওয়ার্ড জয় করেছে।

Advertisements
অভিনেত্রীশিশু