একা থাকছেন, তবু একাকী নন! সামাজিক মাধ্যমে কেন ভাইরাল ‘সলো লাইফ’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এতদিন যেখানে সাজানো সংসার, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, ঘুরতে যাওয়া কিংবা ব্যস্ত সামাজিক জীবনের ছবি বেশি দেখা যেত, সেখানে এখন জনপ্রিয় হচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জীবনধারা। নতুন এই ট্রেন্ডের নাম—‘সলো লিভিং’ বা একা থাকা। আর এর মূল বার্তা, একা থাকা মানেই নিঃসঙ্গ হওয়া নয়।
বিশেষ করে নারী কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের একটি অংশ নিজেদের একা থাকার গল্প সামাজিক মাধ্যমে তুলে ধরে বলছেন, সঙ্গী বা একদল বন্ধু ছাড়া জীবন মানেই বিষণ্নতা নয়। বরং নিজের সঙ্গে সময় কাটানো, নিজের পছন্দকে গুরুত্ব দেওয়া এবং নিজের মতো করে জীবন উপভোগ করাও হতে পারে স্বাধীনতার এক রূপ।
‘আমার কোনো বন্ধু নেই’—তবু জীবন থেমে নেই

টিকটকে লাখো মানুষের নজর কেড়েছেন টরন্টোর সফটওয়্যার সেলস ম্যানেজার লানা ইসা। নিজের রাতের ‘সেলফ কেয়ার’ রুটিন থেকে শুরু করে একা গাড়ি নিয়ে ফাস্টফুড কিনতে বের হওয়া, লেকের পাশে বসে বই পড়া কিংবা একা একা দৈনন্দিন জীবন কাটানোর নানা মুহূর্ত তিনি সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করেন। তার একটি ভিডিও টিকটকে ৭০ লাখেরও বেশি বার দেখা হয়েছে। বর্তমানে টিকটক ও ইনস্টাগ্রামে তার অনুসারী প্রায় চার লাখ। তবে লানার এই একা থাকা কোনো সাজানো সোশ্যাল মিডিয়া চরিত্র নয়। বরং জীবনের নানা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তৈরি হয়েছে তার বর্তমান বাস্তবতা।
হাই স্কুল একাধিকবার পরিবর্তন, কোভিড মহামারির সময় কলেজজীবনের বিচ্ছিন্নতা এবং প্রথম হৃদয়ভাঙার পর নতুন শহরে চলে যাওয়া—সব মিলিয়ে একসময় লানা নিজেকে এমন অবস্থায় আবিষ্কার করেন, যেখানে ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছাড়াই জীবন চালিয়ে নেওয়া শিখতে হয়েছে তাকে। তার ভাষায়, বন্ধুহীনতার বিষয়টি নিয়ে মানুষ খুব কমই কথা বলেন। কারণ সমাজে এখনও বন্ধু না থাকা কিংবা একা থাকার বিষয়টিকে অনেকেই লজ্জার চোখে দেখেন। কিন্তু নিজের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করতে শুরু করার পরই বদলে যায় পরিস্থিতি। মাত্র দুই হাজার অনুসারী নিয়ে যাত্রা শুরু করা লানার ফলোয়ার সংখ্যা মাত্র আট মাসে প্রায় পৌনে দুই লাখে পৌঁছে যায়। কারণ তার গল্পে নিজেদের জীবনের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পান অসংখ্য মানুষ।
একাকীত্বের গল্পেই তৈরি হচ্ছে নতুন কমিউনিটি
লানার ভিডিওর মন্তব্য ঘরেই যেন তৈরি হয়েছে এক নতুন ভার্চুয়াল কমিউনিটি। সেখানে অনেকেই নিজেদের বন্ধুহীনতা, একা থাকা কিংবা সামাজিক অস্বস্তির অভিজ্ঞতা শেয়ার করছেন। যারা এতদিন ভাবতেন, ‘শুধু আমিই কি এমন?’—লানার মতো মানুষদের দেখে তারা বুঝতে পারছেন, একই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আরও অনেকেই যাচ্ছেন। তবে এই ট্রেন্ড সমালোচনার বাইরেও থাকেনি। সমালোচকদের কেউ কেউ তাদের ‘লোনলিনেস ইনফ্লুয়েন্সার’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। অভিযোগ উঠেছে, তারা সামাজিক বিচ্ছিন্নতাকে স্বাভাবিক বা আকর্ষণীয় করে তুলছেন এবং মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির বদলে একাকী জীবনকে উৎসাহিত করছেন।

কেউ কেউ আবার মনে করেন, এসব কনটেন্ট হতাশ, একাকী ও সন্তানহীন নারীদের একটি নির্দিষ্ট সামাজিক গোষ্ঠী হিসেবে উপস্থাপন করছে। তবে কনটেন্ট নির্মাতাদের বক্তব্য, তারা একাকীত্বকে মহিমান্বিত করছেন না; বরং সমাজের তৈরি একটি ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করছেন—‘একা মানেই অসুখী।’ একাই রেস্টুরেন্টে খেতে যাওয়া, একা সিনেমা দেখা, একা ভ্রমণে বের হওয়া কিংবা একা কোনো অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার মতো বিষয়গুলো তাদের ভিডিওতে স্বাভাবিক জীবনযাপনের অংশ হিসেবেই উঠে আসছে।
‘একা থাকলেই কেন নিঃসঙ্গ হতে হবে?’
যুক্তরাষ্ট্রের ফিনিক্সে বসবাসকারী ফুল-টাইম কনটেন্ট ক্রিয়েটর দেবন নোয়ারিংও এমন জীবনধারার অন্যতম পরিচিত মুখ। অন্তর্মুখী স্বভাবের দেবনের কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু থাকলেও ছোটবেলা থেকেই সামাজিক উদ্বেগের কারণে মানুষের সঙ্গে মিশতে গিয়ে অস্বস্তি অনুভব করতেন। এ কারণে নিজের স্বভাব নিয়েই একসময় অপরাধবোধ তৈরি হয়েছিল তার মধ্যে।
কিন্তু নিজের দ্বিধা ও অভিজ্ঞতার কথা সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করার পর দেবন দেখতে পান, তার মতো আরও হাজারো মানুষ রয়েছেন। তাদের অনেকেই অন্তর্মুখী এবং সামাজিক পরিস্থিতিতে অস্বস্তি বোধ করেন। দেবনের কাছে একা থাকার মুহূর্তগুলো বরং নিজের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সংযোগ তৈরি করার সময়।
তার মতে, একা থাকলে তিনি নিজেকে সবচেয়ে স্বাধীন ও স্বাভাবিক মনে করেন। নিজের মতো করে সময় কাটানো এবং একা একা বিভিন্ন কাজ করতে পারাকে তিনি নিজের শক্তি হিসেবে দেখেন।
তবে ‘সলো লিভিং’ আর দীর্ঘমেয়াদি একাকীত্ব এক নয়
সামাজিক মাধ্যমে একা থাকার এই প্রবণতা জনপ্রিয় হলেও গবেষকরা বলছেন, বিষয়টি বুঝতে হবে একটু সতর্কভাবে।
কারণ নিজের ইচ্ছায় একা সময় কাটানো এবং অনিচ্ছা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন থাকা—দুটি এক বিষয় নয়।
অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব সিডনির সামাজিক যোগাযোগ ও একাকীত্ববিষয়ক গবেষক ও এপিডেমিওলজিস্ট অধ্যাপক মেলোডি ডিংয়ের মতে, জীবনের কোনো না কোনো সময়ে প্রত্যেক মানুষই একা বা নিঃসঙ্গ অনুভব করতে পারেন। কিন্তু অনেকেই তা স্বীকার করতে চান না। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যদের সাজানো সুখী জীবন দেখে মানুষের মধ্যে একটি ভুল প্রত্যাশা তৈরি হতে পারে—সবসময় সুখী থাকতে হবে, সবসময় মানুষের সঙ্গে যুক্ত থাকতে হবে। তবে একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেছেন, একা থাকার জীবনধারাকে সামাজিক মাধ্যমে যতই আকর্ষণীয় করে উপস্থাপন করা হোক না কেন, মানুষ মূলত সামাজিক প্রাণী। দীর্ঘদিনের অতিরিক্ত বিচ্ছিন্নতা মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে মানুষের সামাজিক চাহিদাও বদলায়। তাই একা থাকতে স্বস্তি পাওয়া স্বাভাবিক হলেও, দীর্ঘদিন সম্পর্কহীন বা বন্ধুহীন হয়ে পড়লে ধীরে ধীরে নতুন ইতিবাচক সামাজিক যোগাযোগ তৈরি করার চেষ্টা করা জরুরি।
সব মিলিয়ে, ‘একা’ আর ‘নিঃসঙ্গ’—দুটি শব্দ দেখতে কাছাকাছি হলেও তাদের অর্থ এক নয়। কেউ হয়তো একা থাকতেই ভালোবাসেন, নিজের সঙ্গেই খুঁজে পান প্রশান্তি। আবার কেউ মানুষের সঙ্গ চান, কিন্তু পরিস্থিতির কারণে তা পাচ্ছেন না।
তাই নতুন এই ‘সলো লিভিং’ ট্রেন্ডের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়তো এটিই—আপনি একা আছেন, নাকি সত্যিই নিঃসঙ্গ?



