নিজেকে সুড়সুড়ি দিলে হাসি পায় না কেন? রহস্যটা কী!

কেউ হঠাৎ আপনার শরীরের সংবেদনশীল কোনো জায়গায় সুড়সুড়ি দিলে অপ্রস্তুত হয়ে হেসে ওঠা, শরীর সরিয়ে নেওয়া কিংবা চমকে ওঠা—এ অভিজ্ঞতা কমবেশি সবারই আছে। মজার বিষয় হলো, একই কাজ যদি নিজের হাত দিয়েই নিজেকে করতে চান, তখন কিন্তু সেই প্রতিক্রিয়া প্রায় দেখা যায় না। নিজের শরীরে সুড়সুড়ি দিলে কেন নিজেই হেসে উঠি না? এর উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের মস্তিষ্কের কাজের ধরনে।
সুড়সুড়িতে এত প্রতিক্রিয়া কেন?
সুড়সুড়ির অনুভূতি আসলে শুধু ত্বকের স্পর্শের ওপর নির্ভর করে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে চমক, অনিশ্চয়তা এবং মস্তিষ্কের প্রত্যাশা।
অন্য কেউ যখন আপনাকে সুড়সুড়ি দেন, তখন তিনি শরীরের ঠিক কোন জায়গায় স্পর্শ করবেন, কত দ্রুত আঙুল চালাবেন কিংবা কতটা চাপ প্রয়োগ করবেন—এসব আপনি পুরোপুরি জানেন না। এমনকি তাঁকে আগে থেকেই দেখলেও পরের মুহূর্তে ঠিক কী ধরনের স্পর্শ আসছে, তা নির্ভুলভাবে অনুমান করা কঠিন।
এই অনিশ্চয়তাই মস্তিষ্ককে বাড়তি সতর্ক করে তোলে। ফলে শরীর থেকে আসা স্পর্শের সংকেতও তুলনামূলকভাবে বেশি গুরুত্ব পায়। এর ফল হিসেবে কেউ হেসে ওঠেন, কেউ চমকে যান, আবার কারও শরীরে শিহরণ বা অস্বস্তি তৈরি হয়। সুড়সুড়ি দেওয়ার ধরনেও প্রতিক্রিয়ার পার্থক্য হতে পারে। সরাসরি আঙুলের স্পর্শ আর পালকের মতো হালকা কোনো বস্তু দিয়ে স্পর্শ করলে অনুভূতিও একরকম নাও হতে পারে।
নিজের হাতে কেন কাজ করে না?
এবার আসা যাক আসল রহস্যে।
আপনি যখন নিজেকেই সুড়সুড়ি দিতে যান, তখন পুরো ঘটনাটিই আপনার নিয়ন্ত্রণে। আপনি জানেন কোথায় স্পর্শ করবেন, কখন করবেন, কতটা চাপ দেবেন এবং কী গতিতে হাত চালাবেন। অর্থাৎ, আপনার মস্তিষ্কের কাছে পুরো ঘটনাটিই আগে থেকে অনুমানযোগ্য।
মস্তিষ্ক আসলে শরীরের কোনো নড়াচড়া বা স্পর্শ ঘটার আগেই তার সম্ভাব্য ফলাফল সম্পর্কে একটি পূর্বানুমান তৈরি করে। নিজের হাতে যখন নিজেকে স্পর্শ করেন, তখন সেই পূর্বানুমান ও বাস্তবে পাওয়া অনুভূতির মধ্যে বড় কোনো অমিল থাকে না। ফলে মস্তিষ্ক সেই স্পর্শকে ‘অপ্রত্যাশিত’ কোনো ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করে না। শরীর থেকেও সংকেত আসে, কিন্তু মস্তিষ্ক তার গুরুত্ব অনেকটাই কমিয়ে দেয়। তাই অন্য কেউ যখন আপনাকে সুড়সুড়ি দেন, তখন যে চমক, হাসি বা শিহরণ তৈরি হতে পারে, নিজের ক্ষেত্রে সাধারণত তার কিছুই হয় না।
মস্তিষ্কের ‘আগাম হিসাব’
বিষয়টিকে সহজভাবে ভাবলে বলা যায়, নিজের শরীরে সুড়সুড়ি দেওয়ার ক্ষেত্রে মস্তিষ্ক অনেকটা আগেই বলে দেয়—‘আমি জানি এবার কী হতে যাচ্ছে।’
অন্যদিকে, অন্য কেউ যখন একই কাজ করেন, তখন মস্তিষ্কের কাছে পরিস্থিতিটি পুরোপুরি অনুমানযোগ্য থাকে না। ফলে স্পর্শের সংকেত তুলনামূলকভাবে বেশি তীব্রভাবে অনুভূত হতে পারে। এই কারণেই নিজের হাতে নিজের শরীরের এমন জায়গায় সুড়সুড়ি দেওয়ার চেষ্টা করলেও, যা অন্য কেউ করলে সহজেই হাসি পেতে পারে, নিজের ক্ষেত্রে সেটি প্রায়ই নিষ্প্রভ মনে হয়।
তবে সব ক্ষেত্রে কি একই?
এ ক্ষেত্রেও কিছু ব্যতিক্রমের কথা জানা যায়। বিশেষ কিছু মানসিক অবস্থায় মস্তিষ্ক নিজের তৈরি করা স্পর্শের সংকেত এবং বাইরের উৎস থেকে আসা সংকেতের পার্থক্য স্বাভাবিকভাবে বুঝতে নাও পারে।
যেমন, সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত কিছু মানুষের ক্ষেত্রে নিজের শরীরে সুড়সুড়ি দেওয়ার অনুভূতিও অন্য কারও দেওয়া সুড়সুড়ির মতো মনে হতে পারে। ফলে নিজের হাতের স্পর্শেও হাসি বা অন্য ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যেতে পারে। অর্থাৎ, আমরা যখন নিজেকে সুড়সুড়ি দিয়ে হাসতে পারি না, তখন সেটি কোনো অদ্ভুত বিষয় নয়। বরং এর পেছনে কাজ করছে মস্তিষ্কের অত্যন্ত দক্ষ একটি ব্যবস্থা—নিজের কাজের ফলাফল আগে থেকেই অনুমান করে নেওয়া এবং পরিচিত অনুভূতির প্রতিক্রিয়া কমিয়ে দেওয়া।
তাই পরেরবার নিজেকে সুড়সুড়ি দিয়ে যখন দেখবেন, হাসি আসছে না—তখন অবাক হওয়ার কিছু নেই। আপনার মস্তিষ্ক আসলে আপনার হাতের চালাকি আগেই ধরে ফেলেছে!



